যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসানীতিতে জটিলতায় পড়তে পারেন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা

উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের অন্যতম গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত নতুন শিক্ষার্থী ভিসানীতি কার্যকর হলে দেশটিতে পড়তে যাওয়া অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী, বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি কোর্সে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা নতুন জটিলতার মুখে পড়তে পারেন।

বিবিসির প্রতিবেদনে এ সংক্রান্ত বিশ্লেষণমূলক তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

নতুন নীতিতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সময়সীমা চার বছর নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় পরিবর্তন, একাডেমিক কার্যক্রম বদল এবং পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর দেশটিতে থাকার সুযোগও সীমিত করা হচ্ছে।

এই নিয়ম কার্যকর হলে দীর্ঘমেয়াদি কোর্স যেমন - পিএইচডি, গবেষণা বা চার বছরের বেশি সময় লাগে - এমন শিক্ষার্থীরা জটিলতায় পড়তে পারেন।

মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ জানিয়েছে, সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই নীতিমালা ‘ভিসার ব্যাপক অপব্যবহার প্রতিরোধের’ পাশাপাশি নিয়মিত যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে ‘জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করবে’।

যেসব পরিবর্তন আনা হয়েছে

শিক্ষার্থীদের ভিসানীতিতে কয়েকটি পরিবর্তন আনা হয়েছে -

  • এখন থেকে চার বছর মেয়েদী ভিসা দেবে যুক্তরাষ্ট্র। আগে এই ভিসার মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর। ডিউরেশন অব স্ট্যাটাস (ডিএসও ) - চার বছরের জন্য করা হয়েছে। কারও যদি বেশি সময় লাগে, তাহলে তাকে এক্সটেনশনের জন্য আবেদন করতে হবে। ডিএসও হলেন কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত কর্মকর্তা, যিনি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের বিষয়গুলো পরিচালনা করেন। এর আগে, এফ-১ শিক্ষার্থী ভিসা এবং জে-১ এক্সচেঞ্জ ভিসাধারী বিদেশি শিক্ষার্থীরা ‘ডিউরেশন অব স্ট্যাটাস’ শর্তে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি পেতেন।কিন্তু নতুন নীতি সেই অবস্থানের ওপর নির্দিষ্ট সময়সীমা আরোপ করেছে। 
  • এই ডিএসও-দের ক্ষমতা সীমিত করার কথা বলা হয়েছে। এখন থেকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি'র (ডিএইচএস) অধীন সংস্থা ইউএসসিআইএস (ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস) এ বিষয়টি দেখভাল করবে। অর্থাৎ, নতুন নীতি অনুযায়ী, এখন থেকে ফেডারেল সরকারের অনুমতি ছাড়া বিদেশি শিক্ষার্থীরা চার বছরের বেশি সময় যুক্তরাষ্ট্রে থাকতে পারবে না।
  • শিক্ষার্থীদের একাডেমিক কার্যক্রম পরিবর্তন এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের মধ্যে স্থানান্তরের সুযোগও সীমিত করা হবে। আর কোর্স শেষ করার পর ৩০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করতে হবে তাদের। অর্থাৎ, পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর একজন শিক্ষার্থীকে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে তিনি দেশে ফিরে যাবেন কি না, নাকি নতুন প্রোগ্রামে ভর্তি হবেন, বা অন্য ভিসার জন্য আবেদন করবেন।

কারা বেশি জটিলতায় পড়তে পারেন?

পিএইচডি ও গবেষণার শিক্ষার্থী: চার বছরের বেশি সময় লাগে এমন কোর্সে থাকা শিক্ষার্থীদের অবস্থানের মেয়াদ বাড়াতে আবেদন করতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের শিক্ষার্থী: গবেষণার বিলম্ব, অর্থায়নের সংকট, কোর্সে বিরতি বা ব্যক্তিগত কারণে যাদের পড়াশোনা দীর্ঘায়িত হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় বা প্রোগ্রাম পরিবর্তনকারীরা: নতুন নিয়মে স্থানান্তর ও একাডেমিক কার্যক্রম পরিবর্তনের সুযোগ সীমিত করা হচ্ছে।

স্টুডেন্ট ভিসার অপব্যবহারকারীরা: পড়াশোনা না করে অন্য কাজে যুক্ত থাকা বা শুধু ভিসার স্ট্যাটাস ধরে রাখতে বারবার প্রোগ্রাম পরিবর্তন করা শিক্ষার্থীদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

নিয়মিত শিক্ষার্থীদের জন্য ঝুঁকি তুলনামূলক কম: প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও যৌক্তিক কারণ দেখাতে পারলে প্রকৃত শিক্ষার্থীদের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন অনুমোদন পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

পড়াশোনার পর কাজের সুযোগেও কি প্রভাব পড়বে?

নতুন ভিসানীতিতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের অপশনাল প্র্যাকটিক্যাল ট্রেনিং (OPT)-এর আওতায় কাজের সুযোগে সরাসরি কোনো পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখা হয়নি। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে স্নাতক, স্নাতকোত্তর, অ্যাসোসিয়েট বা পিএইচডি শেষ করা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা OPT-এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময় কাজ করার সুযোগ পান। এর মধ্যে স্টেম (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত) বিষয়ের শিক্ষার্থীরা সর্বোচ্চ তিন বছর এবং নন-স্টেম বিষয়ের শিক্ষার্থীরা এক বছর পর্যন্ত কাজের অনুমতি পান।

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন আইনজীবী রাজু মহাজনের মতে, নতুন নিয়মে OPT-এর আবেদন প্রক্রিয়ায় কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। শিক্ষার্থীরা আগের মতোই কোর্স শেষ হওয়ার ৯০ দিন আগে আবেদন করতে পারবেন। তবে পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর ৬০ দিনের পরিবর্তে ৩০ দিনের গ্রেস পিরিয়ড থাকায় পরবর্তী পদক্ষেপ - যেমন অন্য ভিসায় আবেদন, নতুন কোর্সে ভর্তি বা দেশে ফেরা - দ্রুত ঠিক করতে হবে।

তার ভাষায়, তারা যেভাবে বলেছে, তাতে মনে হচ্ছে একাডেমিক প্রোগ্রাম শেষ হওয়ার পর যারা আর পড়াশোনা বা চাকরি করবেন না এবং দেশে ফিরে যাবেন, তাদের ক্ষেত্রেই গ্রেস পিরিয়ড ৩০ দিন করা হয়েছে। অন্য গ্রেস পিরিয়ড নিয়ে কিছু বলা হয়নি।

সব মিলিয়ে, নতুন নীতিতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে স্টুডেন্ট ভিসার অপব্যবহার ঠেকানোর ক্ষেত্রে। তবে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আগের তুলনায় আরও সতর্কভাবে সময় পরিকল্পনা ও ভিসা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।  

এর আগে, ট্রাম্প প্রশাসন শিক্ষার্থী ভিসার আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যাচাইয়ের নিয়ম কঠোর করা, কিছু দেশের অভিবাসন ভিসা প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধতা এবং ভিসা বন্ড চালুসহ একাধিক কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। নতুন শিক্ষার্থী ভিসানীতিকে সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশসহ ৭৫টি দেশের অভিবাসীদের জন্য অনির্দিষ্টকালের জন্য অভিবাসন ভিসা প্রক্রিয়াকরণ স্থগিত করে ট্রাম্প প্রশাসন, যা গত ২১শে জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়।

আবার, প্রায় একই সময়ে বাংলাদেশসহ ৩৮টি দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাওয়ার জন্য পাঁচ থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ভিসা বন্ড বা জামানত জমার পদ্ধতিও চালু করা হয়।