হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে বাংলাদেশের যে ৮ প্রজাতির সাপ

সাপকে ঘিরে কল্পকাহিনী ও কুসংস্কারের যেন শেষ নেই। সাপের মাথায় মণি থাকে, আঘাত করলে প্রতিশোধ নেয়, ফুলের গন্ধে আসে, গাভীর দুধ চুষে খায় কিংবা কালনাগিনীর ছোবলে নিশ্চিত মৃত্যু - এমন নানা গল্প যুগ যুগ ধরে প্রচলিত। এসব নিয়ে তৈরি হয়েছে অসংখ্য নাটক-সিনেমাও।

তবে সাপের প্রতি মানুষের ভয় শুধু কুসংস্কার থেকে নয়। তাদের বিশেষ দৈহিক গঠন, চলার ভঙ্গি ও দংশনে মৃত্যুর আশঙ্কাও আতঙ্ক বাড়ায়। ফলে সাপ দেখলেই মেরে ফেলার প্রবণতা দেখা যায়। অথচ সেই সাপটি হতে পারে বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকা কোনো প্রজাতি।

প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন বাংলাদেশ-এর ২০১৫ সালের রেড লিস্টে দেশের ৮১ প্রজাতি সাপের মূল্যায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে কোনো কোনো সাপ সবচেয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় আছে। রেটিকুলেটেড পাইথন বা জাল অজগর হলো বাংলাদেশের একমাত্র মহাবিপন্ন সাপ। এছাড়া, দু'টি প্রজাতি রয়েছে বিপন্ন অবস্থায়। আর পাঁচটি প্রজাতি রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়। অর্থাৎ, সব মিলিয়ে আট প্রজাতির সাপ হুমকির মুখে রয়েছে।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। 

চলুন জেনে নেওয়া যাক, বাংলাদেশে হুমকির মুখে থাকা এই আট প্রজাতির সাপ কোনগুলো।

রেটিকুলেটেড পাইথন বা জাল অজগর

বাংলাদেশের একমাত্র মহাবিপন্ন সাপ রেটিকুলেটেড পাইথন বা জাল অজগর। গোলবাহার অজগর নামেও পরিচিত এই সাপের বৈজ্ঞানিক নাম Malayopython reticulatus। আইইউসিএনের ২০১৫ সালের রেড লিস্টে এটিকে ‘ক্রিটিক্যালি এনডেঞ্জারড’ বা মহাবিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম, সুন্দরবন এবং দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মিশ্র চিরসবুজ বনাঞ্চলে এর উপস্থিতি রয়েছে। আবাসস্থল ধ্বংস, বন উজাড় এবং চামড়া ও মাংসের জন্য শিকারের কারণে এ সাপের সংখ্যা কমেছে।

আইইউসিএন বাংলাদেশ পুরোনো রেড লিস্ট হালনাগাদের কাজ শুরু করেছে। এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. ফরিদ আহসান এখনই জাল অজগরের অবস্থার উন্নতি হবে কি না, তা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। তবে বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ মো. আবু  সাইদের মতে, গত দুয়েক বছরে পঞ্চগড়, পটুয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এ সাপ উদ্ধারের তথ্য পাওয়ায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়ে থাকতে পারে।

জাল অজগর বিশ্বের দীর্ঘতম সাপগুলোর একটি। পূর্ণবয়স্ক একটি সাপ ৩ থেকে ৬ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এটি বিষধর নয়; শিকারকে পেঁচিয়ে চাপ দিয়ে মেরে ফেলে। স্থলচর হলেও গাছে উঠতে এবং পানিতে চলতে পারে। নিশাচর এই সাপ সাধারণত একাকী থাকে। ইঁদুর, পাখি, সরীসৃপ ও বিভিন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণী এর খাবার। বড় জাল অজগর বুনো শূকর, হরিণজাতীয় প্রাণী এমনকি গবাদিপশুও শিকার করতে পারে।

আইড ক্যাট স্নেক বা বড়চোখ ফণিমনসা

Boiga siamensis বা আইড ক্যাট স্নেক বাংলাদেশে বিপন্ন একটি সাপ। স্থানীয়ভাবে এটি বড়চোখ ফণিমনসা বা চোখ-ফুটাযুক্ত ফণিমনসা নামে পরিচিত। ২০১৫ সালের রেড লিস্টে এটিকে ‘এনডেঞ্জারড’ বা বিপন্ন হিসেবে রাখা হয়েছে।

দেশে এর বিস্তৃতি খুব সীমিত। মূলত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মিশ্র চিরসবুজ বনে এদের দেখা যায়। গাছে বিচরণকারী এই সাপ নিশাচর এবং ডিম পাড়ে। পাখি, পাখির ডিম ও ছোট ইঁদুরজাতীয় প্রাণী এর খাবার। দেশে এদের মোট সংখ্যা কত, সে সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য নেই। তবে আবাসস্থল ও বিচরণক্ষেত্র কমে যাওয়ায় প্রজাতিটি বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে।

বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনামে এ সাপের উপস্থিতি রয়েছে। অধ্যাপক ফরিদ আহসানের ধারণা, অধ্যাপক ফরিদ আহসান জানিয়েছেন, এটির অবস্থা আগের চেয়ে উন্নত হতে পারে।

ব্ল্যাক-বারড কুকরি বা কালো-দাগি উদয় কাল

Oligodon cinereus বা ব্ল্যাক-বারড কুকরি স্নেক বাংলাদেশে অত্যন্ত বিরল। স্থানীয়ভাবে এটি কালো-বের কুকরি বা কালো-দাগি উদয় কাল নামে পরিচিত। আইইউসিএনের রেড লিস্টে এটিকে ‘এনডেঞ্জারড’ বা বিপন্ন হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

দেশে এ সাপের সংখ্যা সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য নেই। এখন পর্যন্ত মাত্র তিনটি এলাকা থেকে এর উপস্থিতি নথিভুক্ত হয়েছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান ও পার্বত্য চট্টগ্রামে এই সাপের দেখা মিলেছে।।

বনভূমির মাটিতে চলাফেরা করা এই সাপ নিশাচর। এর জীবনাচরণ সম্পর্কে তথ্যও সীমিত। ধারণা করা হয়, ব্যাঙ, ছোট টিকটিকি, স্কিঙ্ক ও সম্ভবত পোকামাকড় খায়। ভারত, মিয়ানমার, চীন, কম্বোডিয়া, লাওস, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও হংকংয়েও এ প্রজাতি রয়েছে। অধ্যাপক আহসানের মতে, এর অবস্থার পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম।

বার্মিজ অজগর

Python bivittatus বা বার্মিজ অজগর ২০১৫ সালের রেড লিস্টে ‘ভালনারেবল’ বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তালিকাভুক্ত। ২০০০ সালের মূল্যায়নে অবশ্য এটি ‘এনডেঞ্জারড’ বা বিপন্ন ছিল। স্থানীয়ভাবে একে অজগর বা বার্মিজ অজগর বলা হয়।

বাংলাদেশে মূলত উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বন এবং সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ এলাকায় এর দেখা মেলে। আর্দ্র বন, জলাভূমি, নদী-খাল ও তৃণভূমিতেও এরা থাকতে পারে। ঢাকা, ময়মনসিংহ, সিলেট, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগের বনাঞ্চল ও আশপাশের ঝোপঝাড়, চারণভূমি ও জলাশয়েও এ সাপের উপস্থিতির তথ্য রয়েছে।

বার্মিজ অজগর দক্ষ সাঁতারু এবং গাছেও উঠতে পারে। স্তন্যপায়ী প্রাণী ও পাখি এর প্রধান খাবার। ইঁদুর, বাদুড়, শিয়াল, বাগডাস, হরিণ, বানর ও শূকরও শিকার করে। বিষধর না হলেও বড় অজগর মানুষকে গিলে ফেলতে পারে। শিকারকে লেজ দিয়ে ধরে অসাড় বা মেরে ফেলে।

অধ্যাপক আহসানের মতে, দেশে বার্মিজ অজগরের অবস্থা এখনো আগের মতোই রয়েছে। মাংস ও চামড়ার জন্য শিকার এবং আবাসস্থল ধ্বংস এদের জন্য বড় হুমকি।

গ্রিন র‍্যাট স্নেক বা সবুজ দাঁড়াশ

Ptyas nigromarginata  বা গ্রিন র‍্যাট স্নেক বাংলাদেশে বিরল। ব্ল্যাক-বর্ডার্ড র‍্যাট স্নেক নামেও পরিচিত এ সাপকে স্থানীয়ভাবে সবুজ দাঁড়াশ বা দারাজ সাপ বলা হয়। ২০১৫ সালের রেড লিস্টে এটি ‘ভালনারেবল’ বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তালিকাভুক্ত ছিল।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জেলা ও দেশের উত্তরাঞ্চলে এ সাপের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সমতল ও মাঝারি উচ্চতার উন্মুক্ত বন, মিশ্র চিরসবুজ বন এবং মানুষের কর্মকাণ্ডে পরিবর্তিত প্রাকৃতিক এলাকাতেও এরা থাকে। বন কেটে বসতি, রাস্তা বা কৃষিজমি তৈরি হয়েছে - এমন এলাকাতেও এর দেখা মিলতে পারে।

সবুজ দাঁড়াশ মাটি ও গাছে চলাচল করতে পারে এবং দিনের বেলা বেশি সক্রিয় থাকে। এটি অবিষধর। ব্যাঙ প্রধান খাবার হলেও ছোট ইঁদুর, পাখি, টিকটিকি ও অন্যান্য সাপও খায়। দেশে এদের মোট সংখ্যা জানা নেই। তবে সীমিত বিচরণক্ষেত্র ও আবাসস্থল কমে যাওয়ায় প্রজাতিটি ঝুঁকিতে রয়েছে। অধ্যাপক আহসানের ধারণা, ভবিষ্যতেও এটি ‘ভালনারেবল’ অবস্থাতেই থাকতে পারে।

হিমালয়ান কিলব্যাক বা কমলা-ঘাড় ঢোড়া

Rhabdophis himalayanus বা হিমালয়ান কিলব্যাক অরেঞ্জ-কলার্ড কিলব্যাক নামেও পরিচিত। বাংলাদেশে একে কমলা-ঘাড় ঢোড়া বলা হয়। আইইউসিএনের ২০১৫ সালের রেড লিস্টে এটি ‘ভালনারেবল’ বা ঝুঁকিপূর্ণ।

আবাসস্থল কমে যাওয়ায় সংখ্যা কমছে বলে ধারণা করা হয়। তবে বন ছাড়াও কৃষিজমি, তৃণভূমি, জলাভূমি এবং নদী-নালা, পুকুর ও হ্রদের আশপাশে এদের দেখা যেতে পারে।

মাটি ও পানিতে চলাচল করতে পারা এই সাপ দিনের বেলায় বেশি সক্রিয়। ব্যাঙ, টিকটিকি ও ছোট স্তন্যপায়ীসহ বিভিন্ন প্রাণী এর খাবার। এটি ‘রিয়ার-ফ্যাংড’ ও ‘মাইল্ডলি ভেনোমাস’ অর্থাৎ মুখের পেছনে বিষদাঁত রয়েছে এবং এটি মৃদু বিষধর।

অধ্যাপক ফরিদ আহসান বলেন, “এই সাপ কিছুটা বিষধর। শিকারকে ধরে যদি এরা কিছুক্ষণ চিবাতে পারে, তখন বিষটা লাগে। বিশ্বে র‍্যাবডোফিস হিমালয়ানাসের কামড়ে মারা যাওয়ার মাত্র একটি রেকর্ড। আর, বাংলাদেশে এদের অবস্থাও অপরিবর্তিত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।”

কিং কোবরা বা রাজগোখরা

Ophiophagus hannah বা কিং কোবরার স্থানীয় নাম রাজগোখরা, শঙ্খচূড় কিংবা হালা জামুরো। ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, এটি বিশ্বের দীর্ঘতম বিষধর সাপ এবং সর্বোচ্চ ১৮ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে।

আইইউসিএন বাংলাদেশের ২০১৫ সালের রেড লিস্টে রাজগোখরাকে ‘ভালনারেবল’ বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর আগে এটি ‘এনডেঞ্জারড’ ছিল। বাংলাদেশে মূলত চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট ও সুন্দরবনে এদের পাওয়া যায়। পাহাড়ি বন, ম্যানগ্রোভ ও চা-বাগানসহ বিভিন্ন পরিবেশে থাকলেও ঘন জঙ্গল ও পাহাড়ি এলাকা এদের বেশি পছন্দ।

রাজগোখরার গায়ের রঙ আবাসস্থল অনুযায়ী বদলাতে পারে। দেশে এদের মোট সংখ্যা জানা নেই। আইইউসিএনের তথ্য অনুযায়ী, আবাসস্থল ও খাবার কমে যাওয়ায় এদের সংখ্যা কমছে।

রাজগোখরা নিজের বাসা তৈরি করে, দক্ষ সাঁতারু এবং গাছ ও ঝোপঝাড়ে চলাফেরা করতে পারে। শীতনিদ্রায় যায় না এবং সাধারণত জোড়ায় থাকে। অন্য সাপই এর প্রধান খাবার। অত্যন্ত বিষধর এই সাপ হুমকি মনে করলে আক্রমণ করতে পারে। আক্রমণের আগে শরীরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ উঁচু করে ফণা তোলে এবং হিসহিস শব্দ করে। এর বিষ নিউরোটক্সিক, যা শরীরকে ধীরে ধীরে অবশ করে দিতে পারে।

অধ্যাপক আহসানের মতে, রাজগোখরা সহজে মানুষকে কামড়ায় না, তবে এর বিষের পরিমাণ বেশি। বাংলাদেশে এ সাপের কামড়ে মৃত্যুর দুটি রেকর্ড রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। তাঁর ধারণা, রাজগোখরার অবস্থারও বড় পরিবর্তন হবে না।

পোপস পিট ভাইপার বা সবুজ বোড়া

Trimeresurus popeiorum বা পোপস পিট ভাইপার পোপস ট্রি ভাইপার ও পোপস ব্যাম্বু পিট ভাইপার নামেও পরিচিত। বাংলায় একে সবুজ বোড়া বা টিয়া বোড়া বলা হয়। আইইউসিএনের রেড লিস্টে এটি ‘ভালনারেবল’ বা ঝুঁকিপূর্ণ।

বাংলাদেশে এই সাপের বিস্তৃতি খুব সীমিত। বান্দরবানের পাহাড়ি এলাকা ও সাঙ্গু নদীর কাছে এর উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে। দেশে মোট কতটি সাপ রয়েছে বা সংখ্যা বাড়ছে না কমছে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য নেই। অধ্যাপক আহসানের ধারণা, পার্বত্য এলাকার বাইরে এদের বিস্তৃতি খুব বেশি হওয়ার সম্ভাবনা নেই; সর্বোচ্চ সিলেটেও পাওয়া যেতে পারে।

সবুজ বোড়া মূলত বৃক্ষচারী ও নিশাচর। নিচু ঝোপঝাড়ে এবং কখনো জলাশয়ের কাছেও থাকে। এটি বিষধর হলেও বাংলাদেশে এর কামড়ে মৃত্যুর রেকর্ড নেই। অধ্যাপক আহসানের তথ্য অনুযায়ী, এ সাপের কামড়ে প্রায় ২৬ জন রোগীর তথ্য পাওয়া গেছে; তাদের কেউ মারা যাননি, তবে ব্যথা ও গ্যাংরিনসহ গুরুতর ক্ষতি হয়েছে।

এ সাপ ডিম না পেড়ে সরাসরি বাচ্চা দেয়। সাধারণত ওত পেতে শিকার করে। ব্যাঙ, টিকটিকি, ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী বা পাখি কাছে এলে দ্রুত ছোবল দিয়ে বিষ প্রয়োগ করে।