চলছে জুলুম আর ভিনদেশি লুটেরার অধীনে মায়ের জমিন। তখন কী করণীয়? আপসহীনদের কাছে উত্তর একটাই- প্রতিরোধ। জনগণকে সংগঠিত করে লড়াইয়ের ডাক দেওয়া। ১৭৮২ সালে আজকের দিনে (২৭ জানুয়ারি) জন্ম নেওয়া মীর নিসার আলী তিতুমীর এ কাজটিই করেছেন। জমিদারি জুলুম ও ইংরেজবিরোধী লড়াইয়ের ইতিহাসে জীবন দিয়ে সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহের দৃষ্টান্ত তিনি।
শুধু আজকে তার জন্মবার্ষিকী বলে নয়, কোনো ক্ষণেই ভুলে থাকা যায় না তার সংগ্রামের স্মারক বাঁশের কেল্লাকে।
তিতুমীর বিতর্কিত ওয়াহাবী আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। তিনি তৎকালীন হিন্দুশাসিত জমিদারী প্রথা ও ফিরিঙ্গি শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে “জিহাদের” ডাক দেন। এখন দেখতে পাই, পেছনে টানা অন্ধকারের অপশক্তি তার “বাঁশের কেল্লা” নামকে ব্যবহার করে চলেছে ভিন্ন খায়েশে। তাতে শহীদ তিতুমীরের কিছু আসে-যায় না।
ইতিহাসবিদ অমলেন্দু দে এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, “তিতুমীরের লক্ষ্য ও পথ ছিল ইসলামে পূর্ণ বিশ্বাস এবং হিন্দু কৃষকদের সঙ্গী করে ইংরেজ মদদপুষ্ট জমিদার ও নীলকরদের বিরোধিতা। তিতুমীরের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হিন্দুদের পাশাপাশি ধনী মুসলমানও ছিল। তার বক্তৃতা শোনার জন্যে দলে দলে হিন্দু-মুসলিম কৃষক জমা হতো।”
তিতুমীরকে নিয়ে ইতিহাসবিদ সুপ্রকাশ রায়ের ভাষ্য, “তিতুমীরের এই সংগ্রাম ছিল প্রকৃত কৃষক বিদ্রোহ যার অভিমুখ ছিল অত্যাচারী জমিদার ও নীলকররা।”
এবার তিতুমীরের জীবনরেখায় চোখ দেওয়া যাক। অবিভক্ত বাংলার চব্বিশ পরগনা জেলার বসিরহাট মহকুমার চাঁদপুর গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবার ছিল সুন্নি মুসলিম ধারায় বিশ্বাসী। তার বাবা সৈয়দ মীর হাসান আলী। মায়ের নাম আবিদা রুকাইয়া খাতুন। তার পরিবার নিজেদের হযরত আলীর (রা.) বংশধর হিসেবে দাবি করতেন। তিতুমীরের পূর্বপুরুষ সৈয়দ শাহাদত আলী ইসলাম প্রচারের জন্য আরব থেকে বাংলায় আসেন। পরে তার পরিবারের পদবীতে “মীর” যুক্ত হয়।
তিতুমীরকে প্রথমে ভর্তি করা হয় তার গ্রামের এক বিদ্যালয়ে। পরে তিনি স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় পাঠ নেন। ১৮ বছর বয়সে তিতুমীর কোরআনে হাফেজ হন। একই সঙ্গে তার ছিল হাদিস বিষয়ে প্রগাঢ় পাণ্ডিত্য। তিনি বাংলা, আরবি ও ফার্সি এই তিনটি ভাষায় সুশিক্ষিত ছিলেন।
১৮২২ সালে তিতুমীর মক্কায় হজ্বব্রত পালন করেন। সেখানে পরিচয় আরবের স্বাধীনতা সংগ্রামী সৈয়দ আহমেদ শহীদের সঙ্গে। তিতুমীর তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করে ওয়াহাবী মতবাদে অনুপ্রাণিত হন। ১৮২৭ সালে তিনি জন্মভূমিতে ফেরেন। সংগ্রাম শুরু তখন থেকেই। প্রথমে গ্রামের দরিদ্র কৃষকদের জমিদার ও ব্রিটিশ নীলকরদের বিরুদ্ধে সংগঠিত করেন। তৎকালীন স্থানীয় হিন্দু জমিদার কৃষ্ণদেব রায়ের জুলুম তখন চরমে। মুখে দাড়ি রাখলে খাজনা। মসজিদের ওপরও আরোপ করা হয় কর। তিতুমীর এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। তিনি ও তার অনুসারীদের সাথে জমিদার ও নীলকরদের মধ্যে সংঘর্ষ চলতে থাকে। পালোয়ান হিসেবেও তিতুমীরের খ্যাতি ছিল। তিনি তার অনুসারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে গড়ে তোলেন।
দিনে দিনে তিতুমীরের অনুসারীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। এক সময় তা পৌঁছায় পাঁচ হাজারে। সবাই সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত। ১৮৩১ সালের ২৩ অক্টোবর বারাসাতের নারিকেলবাড়িয়া গ্রামে তারা বাঁশের কেল্লা নির্মাণ করেন। এটি ছিল দুই স্তরের। তৈরিতে ব্যবহৃত হয় বাঁশ এবং কাদা।
দাবানলের মতো তিতুমীরের কৃষক বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। তিনি চব্বিশ পরগনা, নদীয়া থেকে ফরিদপুর পর্যন্ত ভৌগলিক অঞ্চলের অধিকার নিয়ে জমিদার ও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। জমিদারের বাহিনী এবং ব্রিটিশ বাহিনী তিতুমীরের নেতৃত্বাধীন সংগ্রামীদের কাছে একের পর এক যুদ্ধে পরাজিত হয়। বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায় বারাসাতের যুদ্ধ।
ইংরেজ ইতিহাসবিদ উইলিয়াম হান্টারের মতে, এ বিদ্রোহে তিতুমীরের পক্ষে প্রায় ৮৩ হাজার কৃষকসেনা অংশ নেন। তিতুমীরের অপ্রতিরোধ্য শক্তির মোকাবিলায় ব্রিটিশ রাজ কেঁপে ওঠে। তাকে দমনে ভারি অস্ত্রে সুসজ্জিত বাহিনী পাঠায়।
১৮৩১ সালের ১৩ নভেম্বর ব্রিটিশ সৈন্যরা চারদিক থেকে বাঁশের কেল্লা ঘিরে ফেলে। শুরু হয় যুদ্ধ। তিতুমীরের বাহিনীর ছিল তলোয়ার, লাঠির মতো অস্ত্র। কতক্ষণ চলে এ দিয়ে লড়াই? ১৪ নভেম্বর ব্যাপক যুদ্ধ করে তিতুমীর ও তার প্রায় ৪০ জন সহযোদ্ধা শহীদ হন। তার কৃষক বাহিনীর প্রধান মাসুম খাঁকে তৎক্ষনাৎ ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। ব্রিটিশ কামানের তোপে উড়ে যায় বাঁশের কেল্লা।
মৃত্যুর আগে তিতুমীর তার অনুসারীদের উদ্দেশে বলেন, “দেশের জন্য শহীদ হওয়ার মর্যাদা অনেক। তবে এই লড়াই আমাদের শেষ লড়াই নয়। আমাদের কাছ থেকে প্রেরণা পেয়েই এ দেশের মানুষ একদিন দেশ উদ্ধার করবে। আমরা যে লড়াই শুরু করলাম, এই পথ ধরেই একদিন দেশ স্বাধীন হবে।”
শহীদ কৃষক নেতা তিতুমীরের কথা বিফলে যায়নি। তার লড়াই আজও প্রেরণার উৎস। আর জুলুমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ছাড়া অন্য কোনো রাস্তা খোলা থাকে না।
অনেক পরের সময়ে বাংলার প্রতিরোধী শিল্পী, সাহিত্যিকরা তাদের সৃষ্টিকর্মে বীর তিতুমীরের বন্দনা করেছেন। তাকে নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন মহাশ্বেতা দেবী। নাটকে তিতুমীরকে তুলে ধরেছেন প্রবাদ পুরুষ উৎপল দত্ত। কিন্তু চলচ্চিত্রমাধ্যমে তাকে নিয়ে কতটা কাজ হয়েছে তা জানা নেই। হওয়া কি উচিৎ নয়?
বাংলা কবিতার নক্ষত্র আল মাহমুদ তার “একুশের কবিতা”য় লিখেছেন,
“ . . .
প্রভাতফেরীর মিছিল যাবে
ছড়াও ফুলের বন্যা
বিষাদগীতি গাইছে পথে
তিতুমীরের কন্যা।
চিনতে না কি সোনার ছেলে
ক্ষুদিরামকে চিনতে ?
রুদ্ধশ্বাসে প্রাণ দিলো যে
মুক্ত বাতাস কিনতে ?
. . .”
১৯৬৭ সালে বঙ্গবন্ধু পুত্র শেখ কামাল পাকিস্তান টেলিভিশনে “তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা” নামে একটি নাটকের নির্দেশনা দেন। তিতুমীরকে নিয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে গ্রাফিক নভেল প্রকাশিত হয়েছিল। এটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ২০০৪ সালে বিবিসি বাংলা একটি “শ্রোতা জরিপ”-এর আয়োজন করে। বিষয়টি ছিল- সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি কে? বিবিসি বাংলার সেই জরিপে শ্রোতাদের মনোনীত শীর্ষ ২০ জন বাঙালির তালিকায় একাদশ অবস্থানে আসেন মীর নিসার আলী তিতুমীর। দেশের ডাক বিভাগ তিতুমীরের ছবি দিয়ে ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামকরণ হয়েছে তিতুমীরের নামে।
কৃষকনেতা শহীদ তিতুমীরের ৪৯ বছরের জীবনের আমৃত্যু লড়াই মনে না রাখলে অস্তিত্বকেই তো ভুলে থাকা হয়। আজকের দিনের দুঃশাসন, নিপীড়ন, কালো আইন, বাড়াবাড়ি ট্যাক্স, ধর্মের নামে মানুষে মানুষে ভেদের তৎপরতায় মীর নিসার আলী তিতুমীরের দিকে দৃষ্টি দিলে মুক্তি।
জন্মবার্ষিকীতে তার প্রতি অনন্ত অভিবাদন!
লেখক ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।
২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।