স্বপ্নে বরিশাল থেকে নক্ষত্রজুড়ে জীবনানন্দের খোঁজ

১৮৯৯ সালের আজকের দিন ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশালে আপনার জন্ম।

শুভ জন্মদিন, জীবনানন্দ দাশ!

শুভ দিনে আপনাকে অনেক কিছু বলার ইচ্ছে। তাই সাহস করে অনন্তলোকের নক্ষত্র হয়ে থাকা আপনাকে লিখতে বসা।  

প্রিয় জীবনানন্দ দাশ, নির্জনতা কি পেলেন অবশেষে? আপনার জন্মবার্ষিকী লগ্নে এমন বহু জিজ্ঞাসায় ভরা মন।

আপনাকে খুঁজতে বরিশালে গেছি। বগুড়া রোড থেকে বিএম কলেজ অবধি হেঁটেছি। আস্ত এক দোকানের শহর তা এখন। রাস্তা চওড়া হয়েছে। ফুটপাতও ভালো। কিন্তু দোকান ছাড়া আপনার জন্মভূমির যেন উপস্থাপনের আর কিছু নেই।

সারা বিকেল একবার বিএম কলেজ চষে বেড়িয়েছি। সেখানে শুধু আপনার নামটুকুই আছে এক ভবনে। তীব্র শব্দের মোটরবাইক বহরে ছাত্রনেতা নামধারীদের প্রকট উৎপাত চোখে পড়ে। আপনার কবিতায় ছেয়ে থাকা ক্যাম্পাসের সব দেয়াল প্রত্যাশী ছিলাম। বাস্তবে তা দেখিনি।

আপনার ধানসিঁড়িকে আর নদী বলার কারণ নেই। দখলে, দূষণে এখন তা খাল। আন্দাজ করি, কিছু দিনের মধ্যে তা ড্রেন হবে। আপনি অদেখা ভুবনে পাড়ি দেয়ার প্রায় ৭০ বছর হয় হয়। এর মধ্যে ‘‘রূপসী বাংলা’’ ছারখার। অনাসৃষ্টি দিকে দিকে। আপনার ‘‘কয়েকটি লাইন’’-এর মর্মার্থ আমরা টের পাইনি।  

“...উৎসবের কথা আমি কহিনাকো,
পড়িনাকো ব্যর্থতার গান;
শুনি শুধু সৃষ্টির আহবান,-
তাই আসি
নানা কাজ তার
আমরা মিটায়ে যাই,-
জাগিবার কাল আছে-দরকার আছে ঘুমাবার;-
এই সচ্ছলতা
আমাদের;- আকাশ কহিছে কোন কথা
নক্ষত্রের কানে?-
আনন্দের? দুর্দশার?-পড়িনাকো-সৃষ্টির আহবানে
আসিয়াছি।...”

আপনাকে নিয়ে বিনয় মজুমদারের কবিতা পড়ে মনে হয়, আপনি আজও একলা। হয়তো আছেন কিছু উড়ুক্কু চিলবেষ্টিত হয়ে।

‍‍‍‍‍“ধূসর জীবনানন্দ, তোমার প্রথম বিস্ফোরণে
কতিপয় চিল শুধু বলেছিলো, ‘এই জন্মদিন’।
এবং গণনাতীত পারাবত মেঘের স্বরূপ
দর্শনে বিফল ব’লে, ভেবেছিলো, অক্ষমের গান।
সংশয়ে-সন্দেহে দুলে একই রূপ বিভিন্ন আলোকে
দেখে দেখে জিজ্ঞাসায় জীর্ণ হয়ে তুমি অবশেষে
একদিন সচেতন হরীতকী ফলের মতোন
ঝ'রে গেলে অকস্মাৎ, রক্তাপ্লুত ট্রাম থেমে গেলো।...”

আপনার ‘‘প্রার্থনা’’ আমরা পাত্তা দেইনি। মনোবীজও সুফলা হয়নি তাই।  

“আমাদের প্রভু বীক্ষণ দাও : মরি নাকি মোরা মহাপৃথিবীর তরে?
পিরামিড যারা গড়েছিলো একদিন-আর যারা ভাঙে-গড়ে;-
মশাল যাহারা জ্বালায় যেমন চেঙ্গিস যদি হালে
দাঁড়ায় মদির ছায়ার মতন-যত অগণন মগজের কাঁচা মালে;
যে-সব ভ্রমণ শুরু হ’লো শুধু মার্কোপোলোর কালে,
আকাশের দিকে তাকায়ে মোরাও বুঝেছি যে-সব জ্যোতি
দেশলাইকাঠি নয় শুধু আর-কালপুরুষের গতি;
ডিনামাইট দিয়ে পর্বত কাটা না-হ’লে কী করে চলে, -
আমাদের প্রভু বিরতি দিয়ো না; লাখো-লাখো যুগ রতিবিহারের ঘরে
মনোবীজ দাও : পিরামিড গড়ে- পিরামিড ভাঙে গড়ে।”

আপনি প্রাণান্তভাবে ‘‘শুভ রাষ্ট্র’’ চাইতেন। জানতেন তা নির্মাণের পথ। অনেকবার লেনিন এসেছে আপনার কাব্যে। কিন্তু নবারুণ ভট্টাচার্যের স্যাটায়ার পড়ে বোধহয় সে লাইনেও আপনি একলা।  

“জীবনানন্দ দাশের দুটো পেট্রল পাম্প ছিল
ছিল একটা স্পিড বোট
যাতে তিনি ধানসিঁড়ি নদীতে ডাক চেজ করতেন
জীবনানন্দ ইংরেজি জানতেন না
জীবনানন্দ বর্ধমানে সেটল করেন কারণ সেখানে ট্রাম নেই
জীবনানন্দ হেভি টিগরমবাজ ছিলেন
ফড়িং খেতেন, সালমান খানের চেয়ে
ডবল হরিণ তিনি মেরেছিলেন তুড়ি মেরে
জীবনানন্দ লাস্টে বুঝেছিলেন
বোকাচোদা বলে একটা শব্দ চালু হতে চলেছে
জীবনানন্দ সি.পি.এম-এর মেম্বার ছিলেন
যে পার্টি থেকে কবিতা লেখার অপরাধে
তিনি এক্সপেলড্ হন
অতএব আসুন
এবারের কবিতা উৎসবে
আমরা তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত
সেরিব্রাল হেমারেজ
সেলিব্রেট করি— চিয়ার্স!”

নবারুণ ভট্টাচার্য'র পাণ্ডুলিপি থেকে অগ্রন্থিত কবিতা: ভাষাবন্ধব—নবারুণ সংখ্যা, ২০১৫

জীবনানন্দ দাশ, আপনার ‘‘ঊনিশশো চৌত্রিশে’’র কবিতাই বাস্তব হয়েছে সব জানা শোনা বোঝা আপনার জীবনে ও প্রয়াণে। যেন অন্ধকারে অচল মোটরকার হয়ে পড়ে আছেন স্থবির।

“...একটা মোটরকারের পথ- মোটরকার
সবসময়ই আমার কাছে খটকার মতো মনে হয়েছে,
অন্ধকারের মতো।
আমি অতো তাড়াতাড়ি কোথাও যেতে চাই না;
আমার জীবন যা চায় সেখানে হেঁটে হেঁটে পৌঁছুবার সময় আছে,
পৌঁছে অনেকক্ষণ বসে অপেক্ষা করবার অবসর আছে।
জীবনের বিবিধ অত্যাশ্চর্য সফলতার উত্তেজনা
অন্য সবাই বহন করে করুক; আমি প্রয়োজন বোধ করি না :
আমি এক গভীরভাবে অচল মানুষ
হয়তো এই নবীন শতাব্দীতে
নক্ষত্রের নিচে।”

বত্রিশতম জন্মদিনে আপনি ডায়েরিতে লিখেছেন, “তুমি ব্যথা অনুভব করো, প্রপাগান্ডা করো, নইলে তোমার ব্যথা কে বুঝবে।”

ঊনপঞ্চাশতম জন্মদিনে লিখেছেন, “বার্থ ডে আননোটিশড”।

আর আপনার ‘‘মাল্যবান’’ উপন্যাস শুরু হয়েছে এইভাবে, “ সারাদিন মাল্যবানের মনেও ছিল না, কিন্তু রাতের বেলা বিছানায় শুয়ে অনেক কথার মধ্যে মনে হল বেয়াল্লিশ বছর আগে ঠিক এইদিনেই সে জন্মেছিল।”

আপনাকে নিয়ে গবেষণা করা গৌতম মিত্র তার ‘‘৪০ লক্ষ শব্দে গড়া মুদ্রাদোষ’’ নিবন্ধে লিখেছেন,

“ঘড়ির কাঁটার মতো স্পর্শকাতর হিসাবে চিহ্নিত করেছেন নিজেকে। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে প্রস্তুত ছিলেন, কেননা তিনি জানতেন সবসময়ই অপেক্ষা করতে হয়, অপেক্ষাই ফাইনাল।...”

কিন্তু অপেক্ষা ফাইনাল হয়নি জীবনে। আপনি ফিরেছেন মৃত্যুর পর আপনার লেখা ভর্তি ট্রাঙ্কের ডালা খোলার পর। আপনাকে মনেহয় জেনে বুঝে এক জীবন হন্তারক।

“ . . .জীবন ভালোবেসে হৃদয় বুঝেছে অনুপম
মূল্য দিয়ে আসছে চুপে মৃত্যুর সময়।”

: জীবন ভালোবেসে, অগ্রন্থিত কবিতা, জীবনানন্দ দাশ

১৯৫০ সালে ‘‘পূর্বাশা’’ সম্পাদকের কাছে চার-পাঁচশো টাকা ‘‘এক্ষুনি চাই’’ ধার চেয়ে লেখা এক চিঠিতে আপনাকে পাই এভাবে, “ প্রিয়বরেষু,

আশা করি ভালো আছেন।
বেশি ঠেকে পড়েছি, সে জন্য বিরক্ত করতে হল আপনাকে। এখুনি চার-পাঁচশো টাকার দরকার; দয়া করে ব্যবস্থা করুন।

এই সঙ্গে পাঁচটি কবিতা পাঠাচ্ছি, পরে প্রবন্ধ ইত্যাদি (এখন কিছু লেখা নেই) পাঠাব। আমার একটি উপন্যাস (আমার নিজের নামে নয়— ছদ্মনামে) পূর্বাশায় ছাপতে পারেন; দরকার বোধ করলে পাঠিয়ে দিতে পারি, আমার জীবনস্মৃতি আশ্বিন কিংবা কার্তিক থেকে পূর্বাশা’য় মাসে মাসে লিখব। সবই ভবিষ্যতে, কিন্তু টাকা এক্ষুনি চাই— আমাদের মতো দু-চারজন বিপদগ্রস্ত সাহিত্যিকের এ রকম দাবি গ্রাহ্য করবার মতো বিচার বিবেচনা অনেক দিন থেকে আপনারা দেখিয়ে আসছেন— সে জন্য গভীর ধন্যবাদ।

লেখা দিয়ে আপনার সব টাকা শোধ করে দেব, না হয় ক্যাশে। ক্যাশে শোধ করতে গেলে ছ'সাত মাস (তার বেশি নয়) দেরি হতে পারে। কবিতাগুলোর সবই এক সময়ে লেখা নয়। কবিতা বেছেই পাঠিয়েছি; তবু যদি কিছু অপছন্দ হয় আমাকে ফিরিয়ে দিতে পারেন। কবিতা আপনার সুবিধামতো পূর্বাশায় কিংবা অন্য কোনো ভালো পত্রিকায় (উপযুক্ত টাকা দিলে ও মর্যাদা রাখলে) ছাপতে পারেন। জরুরি। আজকালই প্রত্যাশা করছি।

প্রীতি নমস্কার।

ইতি

জীবনানন্দ দাশ ”

এর উত্তরে টাকা এসেছিল কি-না জানা নেই। তবে আপনি থেমে ছিলেন না। তা মেস জীবনে না খেয়ে, পুঁই শাকের চচ্চরি ও কুঁচো চিংড়ির ঘণ্ট পেটে পুরেও বিশ্বাস করতেন মানুষ অলীক ক্ষমতায়।

“গল্প লিখবার ঘণ্টা মুহূর্তগুলো মানুষের জীবনের খুব একটা উৎসর্জনের জিনিস বলে মনে হয়। মানুষ ভাত খেয়ে বাঁচে না শুধু। সে পুঁই শাকের চচ্চরি ও কুঁচো চিংড়ির ঘণ্ট খেতে পারে কিন্তু চিন্তা ও কল্পনা তবুও তার। সে পশ্চিমের মেঘে সোনার সিংহ আবিস্কার করতে পারে, অদৃশ্য সমুদ্রের শব্দ শুনতে পারে, ভোরের রাঙা সূর্য্যে অর্ধনারীশ্বরের ভয়াবহ সুন্দর রূপ দেখতে পারে। ....”

: জীবনানন্দ দাশের ডায়েরি।

এ তো গেল গল্পের বিষয়। আপনার ‘‘কবিতার কথা’’য় পাই শুদ্ধতম কবির বয়ান।

আপনি এ প্রবন্ধের শুরু করেছেন এভাবে -

“সকলেই কবি নয়। কেউ কেউ কবি ; কবি—কেননা তাদের হৃদয়ে কল্পনার এবং কল্পনার ভিতরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার সারবত্তা রয়েছে, এবং তাদের পশ্চাতে অনেক বিগত শতাব্দী ধরে এবং তাদের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক জগতের নব নব কাব্যবিকীরণ তাদের সাহায্য করেছে। কিন্তু সকলকে সাহায্য করতে পারে না ; যাদের হৃদয়ে কল্পনা ও কল্পনার ভিতরে অভিজ্ঞতা ও চিন্তার সারবত্তা রয়েছে তারাই সাহায্যপ্রাপ্ত হয় ; নানারকম চরাচরের সম্পর্কে এসে তারা কবিতা সৃষ্টি করবার অবসর পায়।...”

খুঁজতে খুঁজতে না পেয়ে এখন স্বপ্নেই দেখা হয় ‘‘মিলু’’ ডাকনামের ‘‘কেউ কেউ কবি’’দের অন্যতম জীবনানন্দ আপনার সঙ্গে। এখন মনে হয় নির্জনতার কবি আর আপনি নন। আপনাকে ঘিরে এখন লাখো কোটি ফ্যান ফলোয়ার। তাদের রক্তের ভেতর বিপন্ন বিস্ময় খেলা করে। তখন আপনিই সহায়।

আপনার রূপসী বাংলা আজও শুভ রাষ্ট্র হয়নি। চারপাশে বেনিয়াদের দাপট। পৃথিবীর অবস্থাও একই রকম। মারী, যুদ্ধ, শিশু মৃত্যু, দুর্ভিক্ষ আপনার সময়ের মতোই বিরাজমান।

বেঁচে থাকা এখনো নির্মম। তাই আপনার জন্মের এই ক্ষণে অনেকের মনেই মরিবার সাধ জাগে।

‘‘স্বপ্নের হাতে’’ কবিতায় লিখেছিলেন,

“পৃথিবীর যত ব্যথা,- বিরোধ,- বাস্তব
   হৃদয় ভুলিয়া যায় সব!
   চাহিয়াছে অন্তর যে - ভাষা,
   যেই ইচ্ছা - যেই ভালোবাসা
   খুঁজিয়াছে পৃথিবীর পারে পারে গিয়া,-
   স্বপ্নে তাহা সত্য হয়ে উঠেছে ফলিয়া!’’

তাই স্বপ্নের ওপরই ভরসা। স্বপ্নেই দেখা হয় বরিশাল থেকে নক্ষত্র জুড়ে মিলু আপনার সাথে। আত্মার সারথি হয়ে থাকুন ঘাস হয়ে ফিরে আসার পূর্বাবধি।


লেখক ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।

২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।