চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়ি ইউনিয়নের বিএম কন্টেইনার ডিপোতে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় দগ্ধ হয়েছেন শতাধিক মানুষ। এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় ৪৯ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। কন্টেইনার ডিপোতে থাকা বিপুল পরিমাণ “হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড” নামক রাসায়নিকের প্রভাবে ভয়াবহ বিস্ফোরণের এ ঘটনার ঘটেছে বলে ধারণা করছেন ঘটনাস্থলে কাজ করা ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।
হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড কী?
হাইড্রোজনের পারঅক্সাইড মূলত একটি রাসায়নিক যৌগ, যার সংকেত H2O2। বিশুদ্ধ অবস্থায় এটা বর্ণহীন তরল। সাধারণভাবে একে ব্লিচিং এজেন্ট বলা হলেও বিশেষজ্ঞরা এ রাসায়নিককে অক্সিডাইজিং এজেন্ট হিসেবে অভিহিত করেন।
রাসায়নিক এ যৌগটি নিজে দাহ্য না হলেও উত্তপ্ত করা হলে তাপীয় বিয়োজনে হাইড্রোজনের পারঅক্সাইড বিস্ফোরক হিসেবে আচরণ করে। আগুন বা দাহ্য পদার্থের আশেপাশে রাখলে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। সরাসরি হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড ব্যবহার বিপজ্জনক বলে নিরাপত্তাজনিত কারণে সবসময় এর জলীয় দ্রবণ পরিমিত পরিমাণে ব্যবহার করা হয়।
আগে বাইরে থেকে আমদানি করা হলেও বর্তমানে বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠানই এখন হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড উৎপাদন করে এবং বিদেশে রপ্তানি করে। শিল্প কারখানায় বিভিন্ন কাজে এর ব্যবহার আছে। কিন্তু সঠিকভাবে সঠিক তাপমাত্রায় এ রাসায়নিকটি ব্যবহার না করলে তা বিপদের কারণ হতে পারে।
হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড যেভাবে আগুনের মাত্রা বাড়ায়
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে, হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডের বিস্ফোরিত হওয়ার বিষয়টি পারিপার্শ্বিক অনেক অবস্থার উপর নির্ভর করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেন, “হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড একটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কেমিক্যাল। এটা খুব সাবধানে ব্যবহার করতে হয়। এটা রাখার জন্য আলাদা ধরনের কন্টেইনার আছে। আলাদাভাবে রাখতে হলে বিশেষ ব্যবস্থায় রাখতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড যেখানে রাখা আছে তার আশেপাশে কী আছে, কতদিন ধরে কীভাবে রাখা আছে- এসব বিষয়ের ওপর এর আচরণ নির্ভর করবে। রাসায়নিক সংরক্ষণের ম্যাটারিয়াল সেইফটি ডেটশিট অনুযায়ী গ্লাস, স্টেইনলেস স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম অথবা প্লাস্টিক কনটেইনারে হাইড্রোজেন পার অক্সাইড রাখতে হয়। অন্য কোনো ধাতুর সংস্পর্শ পেলে এটা বিক্রিয়া করে।”
“হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড নিজে দাহ্য পদার্থ না হলেও অক্সিডাইজার হিসেবে কাজ করে। এতে অক্সিজেন বা ফ্লোরিন বা ক্লোরিনের মতো পদার্থ যুক্ত থাকে, যা দাহ্য পদার্থের মতো আচরণ করতে পারে। তার মানে হলো আগুন লাগলে তার আশেপাশে কোনো অক্সিডাইজার থাকলে সেটি আগুনের মাত্রাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। উচ্চ তাপে এটি বিস্ফোরকের আচরণ করতে পারে। পর্যাপ্ত তাপ ও জ্বালানি পেলেই আগুনের তীব্রতায় এবং এই তীব্রতায় বিস্ফোরণও ঘটতে পারে।”
হাইড্রোজন পারঅক্সাইডের ভয়াবহতা
হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডের স্ফুটনাঙ্ক পানির তুলনায় ৫০ ডিগ্রি বেশি। সে কারণে বেশি তাপমাত্রায় এটা বিপজ্জনক হতে পারে। এর উচ্চ ঘনত্ব বেশ বিপজ্জনক। এরকম রাসায়নিক যেন চোখ আর ত্বকের সংস্পর্শে না আসে, সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা সাবধানতা অবলম্বনের পরামর্শ দেন।
শীতল, শুষ্ক, ভালোভাবে বাতাস চলাচল করে এরকম জায়গায় হাইড্রোজন পারঅক্সাইড সংরক্ষণের ব্যাপারে পরামর্শ দেন। দাহ্য পদার্থের সংস্পর্শে একে না আনাই শ্রেয়। কারণ কোনো দাহ্য পদার্থের কাছে থাকলে বা আগুন লাগার জায়গায় হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড থাকলে আগুন বিপজ্জনক পর্যায়ে চলে যেতে পারে।
ত্বকের সংস্পর্শে এ রাসায়নিক যৌগটি এলে ত্বকে ও চোখে জ্বালাপোড়া হতে পারে। সে কারণে এটি চোখ বা ত্বকের সংস্পর্শে আসলে তাড়াতাড়ি পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। এছাড়া, শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড শরীরে প্রবেশ করলে মাথাব্যথা, নাক জ্বলা বা বমিও হতে পারে। অতিরিক্ত হাইড্রোজেন পার অক্সাইড ফুসফুসেও সমস্যা তৈরি করতে পারে।
হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডের প্রভাবে লাগা আগুন যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়
আগুন লাগলেই সেটা নেভানোর জন্য প্রথমেই পানির কথা মাথায় আসে। কিন্তু পানি দিয়েই সব আগুন নেভানো সম্ভব হয় না। আগুন লাগলেই কিন্তু পানি সবসময় সমাধান নয়। হাইড্রোজনে পারঅক্সাইডের কারণে লাগা আগুনের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কারণ পানির সংস্পর্শে এলেও এ দাহ্য রাসায়নিকটি বিস্ফোরক আচরণ করতে পারে।
হাইড্রোজনে পারঅক্সাইড রাসায়নিক যৌগ বলে এর কারণে কোথাও আগুন লাগলে সেটি পানি দিয়ে নেভানো যায় না। তাই এ আগুন নেভাতে হয় ভিন্ন কৌশলে। ফগ সিস্টেমে এ ধরনের আগুন নেভানো সম্ভব। তাছাড়া, ফোম বা ড্রাই পাউডার জাতীয় অগ্নিনির্বাপন যন্ত্র দিয়েও এমন আগুন নেভাতে হয়।