যৌথতাই ছিল রবীন্দ্রনাথ নজরুলের সৃষ্টির মর্ম

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস মানে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে চলা আলো জ্বলা জোনাকি। লাল নীল দীপাবলিও বলতে পারি একে। একেক পর্বে আসেন একেক কীর্তিমান। যাদের সৃষ্টিতে আমরা মেতে থাকি মোহিত হয়ে। পরের পর্বে হয়তো আসেন আরেক সৃষ্টিমান। যার লেখনীতে আপ্লুত হয়ে আমরা পূর্বের সঙ্গে সেতুবন্ধন গড়ে তুলি। এ এক বহমান নদী। তাতে বয়ে চললে মিলে যায় ঘাটে ঘাটে আনন্দ মেলা। সাহিত্যের ধারাই এমন। সব ভাষার মতো বাংলা ভাষাও এর ভিন্ন নয়। যদি নতুন না আসে, তবে তো ক্ষরা হবে। জরা ধরবে। বাঁধ তৈরির তৎপরতা চলবে। সাহিত্য তাই স্রোতময় নদীর মতন।

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শীর্ষ ব্যক্তিত্ব রূপে গ্রাহ্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আগমন ১৮৬১ সালে। এর পরেই আরেক দিকপাল খ্যাত কাজী নজরুল ইসলামের আগমন ১৮৯৯ সালে। সাহিত্য থেকে সমাজের প্রতিটি স্তরের বিনির্মাণে বাঙালি আজও ঋণী এই দু’জনের কাছে। তারা ছিলেন নতুন যুগের বার্তাবাহী। উজ্জীবনের শক্তিধারী। দু’জনকেই বলা যায়, রেনেসাঁর পথ প্রদর্শক।

রবীন্দ্রনাথ ব্যাপকভাবে নাড়া দেন জাতে, পাতে, কূলে, গোত্রে বিভক্ত কলকাতা থেকে কুষ্টিয়ার জনপদ। আর নজরুল এককভাবে বাঙালি মুসলমানকে এগিয়ে নিয়ে বের করে আনেন অন্ধকার কুসংস্কারের যুগ থেকে। রবীন্দ্রনাথ নজরুলের অবদান অন্য যেকোনো সাহিত্যিকের চেয়ে বেশি বলা যায়। তাদের সাহিত্য শুধু টেবিলে বসে পড়ার জন্যই নয়। সমাজ সংস্কারেও কার্যকর প্রভাব রেখেছে এই দুই কীর্তিমানের কর্ম। আজও পৃথিবীর যে প্রান্তে বাঙালি আছেন, তারা অন্য কোনো অনুষ্ঠান পালন করুন বা না করুন রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী ঠিকই পালন করেন। শতবর্ষ পরেও কী বিপুল প্রভাব এই দুই যুগ স্রষ্টার তা ভাবতে অবাকই লাগে!

তবে অন্য অনেক ক্ষেত্রের মতন সাহিত্য আঙিনায়ও মতলববাজ কম নেই। তারা চায় মানুষে মানুষে বিভক্তি তৈরি করে হীন স্বার্থ চরিতার্থ করতে। এরা অন্ধকারের প্রতিভূ। অপশক্তির দাস। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে এরা মিথ্যা রটায়। যার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। এদের ‍‍“সাম্প্রদায়িক অপশক্তি” বললে কম বলা হয় না। বরং এতে স্পষ্ট হয় এদের আসল চেহারা। মূল বিষয় না জেনে আমাদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়েন। এর কিছু উদাহরণ দেয়া প্রাসঙ্গিক মনে করি।

প্রায়ই আমরা শুনতে পারি হিন্দু রবীন্দ্রনাথ বনাম মুসলমান নজরুলের নামে যা তা কেচ্ছার বিস্তার। আদতে রবীন্দ্রনাথ পরিবারিকভাবে হিন্দু বা সনাতন ধর্মের উত্তরসূরি ছিলেন না। তিনি ছিলেন এক ঈশ্বরবাদী ব্রাহ্ম সমাজের ব্যক্তিত্ব। পরিণত বয়সে যে রবীন্দ্রনাথ ধর্মের নামে মানুষে মানুষে ভেদের তৎপরতার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। জমিদার হিসেবে এই রবীন্দ্রনাথ প্রাণান্ত ছিলেন মুসলমান কৃষকদের ভাগ্যের উন্নয়নে।

একইভাবে কাজী নজরুল ইসলাম মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও তিনি সাহিত্য ও কর্মে লড়াই করেছেন মানবতার পক্ষ নিয়ে। ব্যক্তি জীবনে নজরুল বিবাহ করেছেন হিন্দু নারীকে। আর ইসলামী সঙ্গীত থেকে শ্যামা সঙ্গীত পর্যন্ত তার সকল সৃষ্টি প্রমাণ করে এ জনপদে বিভক্তির দেয়াল উপড়ে ফেলতেই তার ধরায় আগমন।

অনেকে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের মধ্যে ব্যক্তিগত রেষারেষির বিদ্বেষ গপ্পো প্রচার করেন। এটিও মিথ্যাচার। এরও নেই কোনো বাস্তব ভিত্তি। কাজী নজরুল ইসলাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে লিখেছেন, “বিশ্বকবিকে আমি শুধু শ্রদ্ধা নয়, পূজা করে এসেছি সকল হৃদয়-মন দিয়ে, যেমন করে ভক্ত তার ইষ্ট দেবতাকে পূজা করে। ছেলেবেলা থেকে তার ছবি সামনে রেখে গন্ধ-ধূপ-ফুল-চন্দন দিয়ে সকাল-সন্ধ্যা বন্দনা করে। এ নিয়ে কত লোক কত ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেছেন।”

: প্রবন্ধ “বড় পিরীতি বালির বাধ”, আত্মশক্তি পত্রিকা, ১৯২৭

একইভাবে কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন,

“কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু

আয় চলে আয় রে ধূমকেতু,

আধারে বাধ্ অগ্নিসেতু,

দুর্দিনের এই দুর্গশিরে

উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন!

অলক্ষণের তিলক রেখা

রাতের ভালে হোক না লেখা

জাগিয়ে দেরে চমক মেরে

আছে যারা অর্ধচেতন!”

ব্রিটিশ বিরোধী আপোষহীন রাজনৈতিক সংগ্রামের জন্য কাজী নজরুল ইসলাম যখন আলিপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি, তখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার রচিত ‘বসন্ত’ নাটকটি তাকে উৎসর্গ করেন উপরের কথাগুলো লিখে। এর বাইরেও দুজনের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত উষ্ণ।

আবার বহুল প্রচারিত একটি মিথ্যাচার আছে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল পুরষ্কার প্রাপ্তি নিয়ে। অনেকে বলেন এটি অনুবাদকের কৃতিত্ব। এটিও এক মিথ্যাচার। কারণ গীতাঞ্জলীর প্রায় পুরো অংশ রবীন্দ্রনাথের নিজের করা ইংরেজি অনুবাদ।

তাই বলা যায়, নক্ষত্র আর নক্ষত্রের মধ্যে কোনো সংঘর্ষ হয়না। সংঘাত বাধে উপগ্রহের কক্ষপথে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর কাজী নজরুল ইসলাম স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত দুই নক্ষত্র। মানবতার মুক্তির জন্যই তাদের আবির্ভাব। তাদের যৌথতা তাই প্রমাণ করে।