ওষুধ হিসেবে কাজ করতে পারে মাদক, বলছেন বিশেষজ্ঞরা

যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে সাইকোথেরাপিতে ওষুধ হিসেবে মাদক নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা। অবসাদ, উদ্বেগ, পোস্টট্রম্যাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার, ওসিডির মতো সমস্যার ক্ষেত্রে এটি প্রয়োগ করা হচ্ছে। আসক্তির চিকিৎসায়ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাদকের ব্যবহার সফল হচ্ছে।

সাইকেডেলিক চিকিৎসা পদ্ধতির একজন প্রবক্তা ড. আন্দ্রেয়া ইয়ুংআবারলে এসব তথ্য জানিয়েছেন। জার্মানির বার্লিনে নিজের চেম্বারেও তিনি এই পদ্ধতির প্রয়োগ করছেন।

মাদককে ক্ষতিকর পদার্থ হিসেবেই দেখা হয়। এখন যেকোনো পার্টি বা অনুষ্ঠানে তরুণদের ভেতর মাদক নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। মাদক ছাড়া কোনো পার্টির আয়োজন অনেকে ভাবতেও চান না। পার্টিতে মাদক গ্রহণ করে রাতভর নৃত্য, হই-হুল্লোড় যেন স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন অবস্থায় মাদকের চিকিৎসাগুণ নিয়েও গবেষণা চালানো হচ্ছে। এবং চিকিৎকেরা সাইকোথেরাপির অংশ হিসেবে এটি ব্যবহার করছেন।

ইয়ুংআবারলে বার্লিনে নিজের চেম্বারে কেটামিন নামের একটি পদার্থ প্রয়োগ করছেন। হাসপাতালে অ্যানেস্থেসিয়া ও এমারজেন্সি বিভাগে এই অ্যাক্টিভ ইনগ্রেডিয়েন্ট ব্যবহার করা হয়। রোগীকে অজ্ঞান করতে বা রোগীর ব্যথা কমাতে সেটি প্রয়োগ করা হয়। 

শরীরে কেটামিন প্রবেশ করলে হ্যালুসিনেশন বা বিভ্রম তৈরি হয়। ফলে পার্টিতেও এই ওষুধ সেবনের মাত্রা দিনদিন বাড়ছে। যদিও এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। তবে ডিপ্রেশন বা অবসাদ কমাতে সাইকোথেরাপির ক্ষেত্রে কেটামিন ইতিবাচক অবদান রাখতে পারে বলে মনে করেন ড. আন্দ্রেয়া ইয়ুংআবারলে।

তিনি বলেন, “এই পদার্থ মনকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যায় যেখানে নানা ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সিউডো হ্যালুসিনেশন বা আপাত বিভ্রম সৃষ্টি হয়। স্মৃতির কোনো বিষয় সম্পর্কে অন্তরের অত্যন্ত জোরালো কিছু উপলব্ধি ওই সময় জেগে ওঠে। মস্তিষ্কের যে অংশ দেখা ও শোনার দায়িত্ব পালন করে; কেটামিনের মাধ্যমে সেগুলো আরও নিবিড়ভাবে পরস্পরের কাছাকাছি চলে আসে। তখন পরিবেশের অতি ক্ষুদ্র বিষয় সম্পর্কেও উপলব্ধি জোরালো হয়ে ওঠে।”

তবে এমন পদার্থ সেবনে নেতিবাচক প্রভাবও পড়তে পারে। আতঙ্ক বা প্যারানয়া জেগে উঠতে পারে। ফলে থেরাপির সময় এটির প্রয়োগে সতর্কতা বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎকেরা।

ড. ইয়ুংআবারলে বলেন, “পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া ছাড়া কোনো কার্যকর ওষুধ নেই। যখনই কোনো কার্যকর ওষুধ ব্যবহার করা হয়, পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা দেবেই। অন্তত কিছু মানুষের ক্ষেত্রে তো বটেই। দুটি ঘটনা ঘটতে পারে। একটি হলো উচ্চ রক্তচাপ, অন্যটি চোখের মধ্যে ইন্ট্রাসেলুলার প্রেশার বা অন্তঃকোষীয় চাপ। এ জন্য যাদের গ্লুকোমা আছে, তাদের এভাবে চিকিৎসা করা হয় না।”

একাধিক গবেষণা অনুযায়ী, কেটামিন নিউরোপ্লাস্টিসিটির উন্নতি করে। এটি গ্রহণ করার ফলে মস্তিষ্কের পরিবর্তন ও স্পন্দনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা আরও বেড়ে যায়। এই পদার্থ মস্তিষ্কের অতি উত্তেজিত রিসেপ্টরগুলোর রাশ টানে। ফলে ডিপ্রেশনের লক্ষণ কমে যায়।

প্রচলিত অ্যান্টি ডিপ্রেশন ওষুধের তুলনায় কেরাটিন আরও দ্রুত কার্যকর হয়। একবার গ্রহণেই রোগীরা ভালো বোধ করেন। 

ড. আন্দ্রেয়া ইয়ুংআবারলে বলেন, “আমরা সাধারণত একের পর এক সেশনে কেটামিন প্রয়োগ করি না। মাঝে বেশ কয়েক সপ্তাহ সময় রেখে সেটি কার্যকর হতে দিই। কারণ বিরতির সময়েও কিন্তু থেরাপি চলে। দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সময়েও থেরাপি চলতে থাকে। পাঁচ থেকে ছয়টি সেশনের পর কারও উন্নতি হয়েছে লক্ষ্য করলেই আমরা চিকিৎসার পরের পর্যায় শুরু করি। তখন মানুষকে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় আবার ফেরত পাঠানো হয়।”

আন্দ্রেয়া ইয়ুংআবারলের মতে, “৭০ থেকে ৮০% রোগীর ক্ষেত্রে কেটামিন সেশন কার্যকর হয়। থেরাপির পর তার রোগীরা অবসাদ বা উদ্বেগ ছাড়াই আবার স্বাভাবিক জীবন ফিরে পান।”