এই যে শুনুন। শুনুন। জ্বি। আপনি। হ্যাঁ, হ্যাঁ। আপনি। হ্যাঁ, আপনিই। এদিকে আসুন। এই যে এই দিকে। এই দিকে, এই দিকে। হ্যাঁ, কাছে আসুন। আরও আরও। হ্যাঁ, নিচে নিচে। এবার নিচে তাকান। আরেকটু। হুম। দেখতে পাচ্ছেন আমাকে?
আমি নিচে তাকাই। রাস্তার ম্যানহোল থেকে কে ডাকছে? আটকে পড়া কেউ? এগিয়ে যাই। কিন্তু আমার তো অফিস টাইম। দ্রুত চেকইন করতে হবে। নইলে বেতন কাটা। আর এসব তো ফায়ার সার্ভিস, থানা পুলিশের কাজ। আবার হাসপাতাল পর্যন্ত যেতে হয় কি-না? তবু এড়িয়ে কীভাবে যাই? এবার ভালো মতো লক্ষ্য করি।
ম্যানহোলের ঢাকনা ঠিক আছে। কোনো ফাঁক নেই। কোনো মানুষও দেখি না। একটা ছোট্ট ফড়িং পড়ে আছে। তাহলে কথা বলছে কে? এত মানুষ হাঁটছে তাদের নয়। আমাকেই কেন বলা? আর ফড়িং কেন মানুষের মতো কথা বলবে? হ্যালুসিনেশন হচ্ছে কি আমার? গত রাতে অবশ্য ঘুম হয়নি ঠিকঠাক। সারারাত লোডশেডিং ছিল মহল্লায়। গরমে ঘুম হয়নি। সকালে উঠতে হয়েছে বেশ ভোরে। এখনো ফড়িংয়ের কথা বলা শুনতে পাচ্ছি।
: আপনি তো দেখলেন আমাকে। এরপরও এত কী ভাবছেন?
আমার কি ফড়িংয়ের কথার উত্তর দেওয়া ঠিক হবে? ভাবলাম চুপ থাকি। কিন্তু ফড়িং কথা বলেই যাচ্ছে।
: আমরা কয়েকজন উড়ছিলাম। মা ছিলেন সাথে। হঠাৎ আমি দলছুট হয়ে যাই। এই সামনের একটা পিলারে ধাক্কা খাই। এরপর জ্ঞান হারাই। গড়াতে গড়াতে মনে হয় এখানে এসেছি। এর মধ্যে আপনাদের একজন পিষে মাড়িয়ে গেলেন। সারা গায়ে ব্যাথা। ডানা বোধ হয় ভেঙেছে। প্লিজ একটু হেল্প করুন আমাকে। শুনছেন?
আমি ফোনে ঘড়ি দেখি। এখান থেকে অফিস ১৫ মিনিটের হাঁটা দূরত্ব। আমাকে প্রতিমাসে মেস ভাড়া দিতে হয়। বাকি টাকা গ্রামে থাকা মায়ের জন্য। তার কিডনিতে জটিল অসুখ। ওষুধই লাগে মাসে ৬ হাজার টাকার।
এসব যখন ভাবছি, ডানা ভাঙা পিচ্চি ফড়িংয়ের কথা বলা তখনও থেমে নেই।
: অনেককে ডেকেছি। কেউ শুনতে পাননি। আপনি শুনেছেন। আপনি দাঁড়িয়েছেন। আর একটু কি কষ্ট করবেন আমার জন্য? একটু ধরে আমাকে যেকোনো গাছের একটা ডালে রাখবেন। একটা গাছ পেলেই আমি বাঁচব। আমার মা আমাকে খুঁজে নিতে পারবেন। প্লিজ, একটু দয়া করুন। আমাকে বাঁচতে দিন। মায়ের কাছে ফেরত দিন।
বুঝতে পারি আজ বেতন কাটা যাবেই। তবু নিচু হয়ে ফড়িংটাকে আঙুলে বসাই। কিন্তু প্রথমবারের মতো খেয়াল করি আশেপাশে কোনো গাছ নেই। একটাও নেই। শপিংমল আছে। ব্যাংক আছে। কাস্টমার কেয়ার আছে। বিলবোর্ড আছে অনেকগুলো। পুলিশ চেকবক্স আছে। কিন্তু একটা গাছ নেই। এ কী দশা?
ফুঁ দিয়ে ফড়িংটাকে উড়িয়ে দিই বাতাসে। অফিসের দিকে হাঁটা দেই। যা ঘটল তা তো কাউকে বলা যাবে না। উল্টো মানুয় পাগল ভাববে। এখন অফিসের স্যারকে বলে ‘‘লেট''টা কাটানো যায় কি-না দেখি। দ্রুত হাঁটি বাকি পথ।