হাসান শাওনের গল্প: ভক্ত

এফডিসির পাশে রেললাইন। চারপাশে অনেক ঝুঁপড়ি। এরই একটিতে চৌকিতে ঘুমাচ্ছে জব্বার। একটু পর পর ট্রেন যায়। রেলের চাকার সঙ্গে চলা বগির ঘর্ষণের শব্দ সয়ে গেছে এ জায়গার সবার। জব্বারের ঘুম ভাঙল ছাগলের ডাকের। মিটকির মা’র ছাগল। বুড়ি মা বছর দশেক ধরে প্যারালাইসড। সারাদিন চৌকিতে পড়ে থাকে। আর মিটকিকে একটু একটু পর ডাকে, “ঐ ছ্যাড়া আইজ ভাতের লগে সালুন কী?” মিটকি রেললাইনে গাঁজা বিক্রি করে। পুরিয়া প্রতি চল্লিশ টাকা দিতে হয় পুলিশকে। বাকি টাকায় তো পোলাও, বিরিয়ানি সম্ভব না। অচল হয়ে পড়ে থাকা এখনো না মরা বুড়ি তবু তার চৌকিতে বান্ধা ছাগলের মতোই “সালুন-সালুন” করে চিল্লায়।

জব্বার ঘুম ভাঙার পর দেরি করে না। আজ নায়ক মান্নার মৃত্যুবার্ষিকী। সে টাঙ্গাইলে যাবে কবর জিয়ারত করতে। প্রতিবছরই যায়। জব্বার পানি সাপ্লাইয়ের কলের দিকে বদনা নিয়ে যায়। পানি নেয়। এরপর পর্দা টাঙানো পায়খানার সামনে চার-পাঁচজনের লাইনের শেষে দাঁড়ায়। সবাই পানি ভরা বদনা হাতে দাঁড়ানো। প্রকৃতির ডাক এ লাইনে আর্তনাদ ছাড়িয়ে প্রকাশিত ইত্যকার খিস্তিতে- “..পোলার হাগা বাইর হয় না?” “সোনারগাঁ হোটেলের খাওন প্যাডে পড়ছেনি? তাড়াতাড়ি কর!” মানুষের প্রাকৃতিক বর্জ্যের চেয়ে এ জায়গায় যেন খিস্তির দুর্গন্ধ বেশি।

জব্বার সিরিয়াল পায় একসময়। তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করে সে খুঁপড়িতে পৌঁছায়। তার কাছে আছে মাত্র ৬০ টাকা। এ টাকায় টাঙ্গাইল যাওয়া-আসা হবে না। কাজে নামতে হবে তাকে। সপ্তাহে চারদিন সে কাজ করে। সে কাজ হচ্ছে টানা পার্টির কাজ। এফডিসি সিগনালে রিকশা বা বাইক থেকে আরোহীর ব্যাগ টান দিয়ে দৌড়। তারপর কাওরানবাজারে পুরান মালের দোকানে কাদেরের কাছে বিক্রি। কপালে থাকলে কোনো দিন হাজার পাঁচেক মেলে। কোনো দিন পাওয়া যায় দামি ব্যাগে ৩০ টাকারও কম কিছু। বাকি সময় জব্বার খুঁপড়িতেই থাকে। ভিসিডিতে নায়ক মান্নার সিনেমা দেখে। তার সব ছবি আগে দেখা শেষ। তবু বারবার দেখে। নায়ক মান্নার টান সে উপেক্ষা করতে পারে না।

জব্বার এফডিসি মোড়ের দিকে হাঁটা দেয়। পৌঁছে দেখে অন্য দৃশ্য। বাকিতে বিড়ি নেয় সোহরাবের কাছ থাকে। সোহরাব মূলত পুলিশের ফর্মা। আবার সে রেললাইনে গাঁজা বিক্রি বন্ধে পুলিশি রেইডের খবর আগে থেকে জানে। আবার ঝুঁপড়িবাসীদের সে সময় জানিয়ে দেয়। এভাবে দুদিকেই ভারসাম্য রাখে সোহরাব।

সোহরাব বলে, “সোনারগাঁও হোটেলে ফেরানসের পরধানমন্ত্রী আইসে। আইজ এই এলাকা কাম করতে পারবা না জব্বার মিয়া।” ফেরানস শুনেই জব্বারের মনে পড়ল একটা সেন্টের শিশির কথা। একবার এক মেয়ের ব্যাগ টান দিয়ে নিয়েছিল সে। তা বিক্রির সময় মহাজন কাদের বলেছিল, ব্যাগে তো এই সেন্টের শিশি ছাড়া কিছু নাই জব্বার। তয় সেন্টটা হেভি কড়া। ফেরানসের মনে হয়। এ যে দ্যাহো মিয়া ফেরানসের নাম লেখা। আরে মিয়া হুইগ্যা দ্যাহো গন্ধডা। কড়া জিনিস!” জব্বার ছোট্ট সিসি থেকে ঘ্রাণ নিয়েছিল ঐ সেন্টের। মান্না ভাই জীবিত থাকতে একবারই এফডিসিতে শুটিংয়ের সময় তার খুব কাছে পৌঁছাতে পেরেছিল সে। তার গায়ে অবিকল এমন গন্ধ পেয়েছিল জব্বার। শুধু এই ফেরানসের সেন্টের জন্য সে মহাজন কাদেরের কাছ থেকে ৪ হাজার টাকা পেয়েছিল সে। তার একবার মনে হয়েছিল যে সেন্ট মান্না ভাই গায়ে দিতেন সেই গন্ধটা তার বিক্রি করা ঠিক হচ্ছে কি-না? কিন্তু সে মাসে তার ঝুঁপড়ির ভাড়া বাকি পড়েছিল দুই মাসের। টাকার টান তাই তার উপেক্ষা সম্ভব হয়নি। 

আজ কি টাঙ্গাইল যাওয়া হবে না জব্বারের? সোহরাব বারবার সতর্ক করে- “পুরা ঢাকায় আইজ রেড চলব।” কিন্তু মৃত্যুবার্ষিকীতে মান্না ভাইয়ের কবরের সামনে দাঁড়াতেই হবে। জব্বার হাঁটতে থাকে। রেইডের শহরে তার চোখ খুঁজছে ব্যাগ হাতে একজোড়া বেখেয়ালি হাত।