কয়েক দশক আগে ডায়াবেটিস রোগটি তেমন দেখা না গেলেও বর্তমানে প্রতিনিয়ত এ রোগে ভুক্তভোগীর সংখ্যা পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। একসময় কেবল চল্লিশোর্ধ ব্যক্তিরা টাইপ টু ডায়াবেটিসে ভুগতেন। কিন্তু জীবনধারার পরিবর্তনের কারণে শিশু-কিশোর-তরুণরাও টাইপ টু ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছেন।
গবেষণা অনুযায়ী, অল্পবয়সীদের স্থূলতা এবং ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে ভূমিকা রাখছে শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা। ৯-১৫ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে শারীরিক কার্যকলাপ কমে যাওয়ায় বিপাকীয় ব্যাধিগুলোর ঝুঁকি বাড়ছে।
ডায়াবেটিস নিজে একটি পৃথক রোগ হলেও এর কারণে শরীরে নানা অসুখ দেখা দেয়। ডায়াবেটিসের হাত ধরে শরীরে বাসা বাঁধে কোলেস্টেরল, থাইরয়েড, উচ্চ রক্তচাপের মতো হাজারটা রোগ। তাই ডায়াবেটিসকে অনেক রোগের সূতিকাগার বললেও ভুল হবে না। চলুন দেখে নিই কী কী উপায়ে উঠতি বয়সে টাইপ টু ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা যায়-
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
খাদ্যতালিকায় ফলমূল, শাকসবজি, চর্বিহীন প্রোটিন এবং স্বাস্থ্যকর খাবার রাখুন। কারণ, সুষম খাদ্য রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার, কোমল পানীয়, প্রক্রিয়াজাত স্ন্যাকস এবং অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন।
শরীরচর্চা
নিয়মিত শরীরচর্চার মাধ্যমে যেমন ওজন নিয়ন্ত্রণ করা যায় তেমন ইনসুলিন সংবেদনশীলতাও উন্নত হয়। শরীরচর্চার পাশাপাশি প্রতিদিন দেড় ঘণ্টা দ্রুত হাঁটা বা সাইকেল চালানোর মতো মাঝারি তীব্রতার অ্যারোবিক ব্যায়ামের দিকেও খেয়াল রাখুন।
ওজন নিয়ন্ত্রণ
ডায়াবেটিস প্রতিরোধে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই) অনুযায়ী নিজের শরীরের ওজন বজায় রাখুন। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত ও বাড়তি খাবারকে না বলুন।
মানসিক চাপ দূরীকরণ
দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ শুধু মানুষকে অস্বাস্থ্যকর জীবনধারার দিকেই ঠেলে দেয় না, বরং ইনসুলিন প্রতিরোধেও ভূমিকা রাখে। মানসিক চাপ দূর করতে ধ্যান (মেডিটেশন), যোগব্যায়াম (ইয়োগা) বা গভীর শ্বাসের ব্যায়ামের মতো কৌশল অবলম্বন করুন।
পর্যাপ্ত ঘুম
ঘুমের অভাবে ক্ষুধামন্দার মতো সমস্যা দেখা দেয়। সেই সঙ্গে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় হরমোন উৎপাদনও ব্যাহত হতে পারে। তাই টাইপ টু ডায়াবেটিস প্রতিরোধে প্রতি রাতে কমপক্ষে ৭-৯ ঘণ্টা ঘুম নিশ্চিত করুন।
স্ক্রিনটাইম কমানো
অনেকেই কাজের বাইরে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় টেলিভিশন বা ল্যাপটপের সামনে বসে থাকেন এবং স্মার্টফোন ব্যবহার করেন। টাইপ টু ডায়াবেটিস থেকে বাঁচতে ডিভাইস এড়িয়ে শখের কাজ কিংবা সামাজিক কার্যকলাপে নিজেকে নিয়োজিত করুন।
হাইড্রেটেড থাকা
সারাদিন প্রচুর পানি পান করা করলে রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সর্বোত্তম শারীরবৃত্তীয় কার্যকারিতা বজায় থাকে। তাই সুস্বাস্থ্যের জন্য চিনিযুক্ত পানীয় পান থেকে বিরত থাকুন। বরং পানি বা ভেষজ চা পানের অভ্যাস গড়ে তুলুন।
ধূমপান-মদ্যপান পরিহার
অতিরিক্ত ধূমপান, মদ্যপান ও তামাকজাত দ্রব্য সেবনে ডায়াবেটিসের সঙ্গে অন্যান্য বিভিন্ন স্বাস্থগত জটিলতার ঝুঁকি বাড়ে। তাই ধূমপান, তামাক সেবন, মদ্যপানের মতো ক্ষতিকর অভ্যাস বর্জন করুন।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা
প্রিডায়াবেটিস বা ইনসুলিন উৎপাদন প্রতিরোধের যেকোনো লক্ষণ প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করতে রক্তের গ্লুকোজ নিরীক্ষণসহ নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিকল্প নেই। সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা এবং জীবনধারার পরিবর্তনের মাধ্যমে ডায়াবেটিস থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব।
সচেতনতা
ডায়াবেটিস সম্পর্কিত ঝুঁকির কারণ, লক্ষণ এবং জটিলতা বোঝার মাধ্যমে যে কেউ নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন থাকতে পারেন। নিজে সতর্ক হওয়ার পাশাপাশি পরিবার ও আশেপাশে অন্যদের মাঝেও ডায়াবেটিস প্রতিরোধ এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের গুরুত্ব নিয়ে সচেতনতা ছড়িয়ে দিন।