গল্প: বন্দি

সময়টা ভোররাত। আব্বার ফোনটা বেজেই যাচ্ছে। তিনি ফজরের নামাজের জন্য ওজু করছেন। ভাইয়ার ফোন কি? উঠে ধরতে ইচ্ছা করছে। সিরিয়ায় পৌঁছানোর পর তার খোঁজ নেই। তাও আট মাস হবে। 

আব্বা হাতের পানি মুছে ফোন ধরলেন। পাশের ঘরে আমি শুনতে পাচ্ছি সব। হুম, ভাইয়াই। কিন্তু আব্বা এগুলো কী বলছেন। কোনো সমস্যায় আছেন ভাইয়া? আম্মা ততক্ষণে ফোনের কাছে। লাউড স্পিকার অন করলেন আব্বা। আমিও শুয়ে থাকতে পারলাম না। ফোনের কাছে গেলাম। ভাইয়ার গলা। তিনি কাঁদছেন।

: আব্বা, আমারে এইখান থেকে বাঁচান। ওরা মানুষ না। খুব অত্যাচার করে। আমরা এক ঘরে ৩০ জন বন্দি। কোনো জানালা নাই। এর মধ্যে গত সপ্তাহে ৭ জন মারা গেছেন। লাশ রুমের মধ্যে ছিল দুই দিন। এরপর মরুভূমিতে ফালায় দিছে ওরা। খাবার দেয় শুকনা রুটি দুই দিনে একবার।

আম্মা, আব্বা, আমি কোনো উত্তর পাচ্ছি না। ভাইয়া কাঁদতে কাঁদতেই বলছেন।

: আইজ এক নতুন বাংলাদেশি গার্ড আসছেন। তার ফোনে তোমাদের সঙ্গে কথা বলতেছি। ইউরোপে যাওয়ার জন্য এর মধ্যে ২ লাখ টাকা নিসে। এখন আরও ১০ লাখ চায়। ওরা টাকা ছাড়া কিচ্ছু বোঝে না আব্বা। ওরা সবাইরে মারবে আব্বা। 

ভাইয়ার কান্নার সঙ্গে আব্বা, আম্মার কান্নার শব্দ মিলিয়ে যায়। আমি চোখ মুছি। 

একবার ক্রিকেট খেলতে গিয়ে আমার কপালে বল লাগে। অনেক রক্ত বের হয়। আমি কাঁদছিলাম। ভাইয়া তখন মাথায় হাত দিয়ে বলেছিল, “ধুর! খেলায় ব্যথা পাইয়্যা কেউ কাঁন্দে?” 

আমার সেই ভাই এখন কাঁদছে। আমাদের কারও মুখে উত্তর নেই। চাঁপা কান্নাই এই ভোর রাতে সিরিয়া থেকে আসা ফোনের উত্তর যেন।

এবার আব্বা কথা বলেন।

: তোগো দাদাবাড়ির জমির বিক্রি কইর‌্যা আমি আর বড়জোর লাখ চাইর টাকা জোগাড় করবার পারুম। আর তো কোনো টাকা নাইরে বাজান।

আম্মা কাঁদতে কাঁদতে বিছানায় শুয়ে পড়েছিলেন। এবার তিনি ফোনে আসেন।

: বাজান, আমার গয়নার টাকা আগেরবারই গেছে। এত টাকা আমরা কোথায় পামু? তোরে কি খুব মারে বাজান?  

আবার আম্মার সশব্দে কান্না। ভাইয়া কথা বলে।

: মারে, এইখান থে পলানোর উপায় নাই। ধুধু মরুভূমি চাইরদিক। কোনো কূল-কিনারা নাই। গত মাসে ৩ জন পলানোর চেষ্টা করছে। তাগোও গুলি কইর‌্যা লাশ মরুভূমিতে ফালাইছে। ওরা রাক্ষসের জাত। 

ভাইয়া আগে মালয়েশিয়া ছিলেন। রেস্টুরেন্টে কাজ করতেন। বাড়িতেও টাকা দিতেন। আব্বার ফোন সেই টাকায় কেনা। আগে আমাদের ফোন ছিল না। আমাকে পলিটেকনিকে ভর্তির টাকাও ভাইয়ার পাঠানো। দেশে থাকতে ভাইয়ার প্রেম ছিল আমাদের পাশের বাড়ির নীলা আপার সাথে। নীলা আপা এমনিতে হিজাব পড়তেন। কিন্তু আমাদের বাড়িতে আসতেন খুব সেজে। আহা! ভাইয়ার সাথে নীলা আপার বিয়ে হলে কী যে মজা হতো। উনি আমাকে কত আদর করেন। তাদের বাড়ির গাছের এমন কোনো ফল নাই যে আমাকে ছাড়া খেয়েছেন। সেই নীলা আপার গত মাসে বিয়ে হয়ে গেছে। জামাইয়ের গঞ্জে ওষুধের দোকান। বিয়ের দিন তিনি সবচেয়ে বেশি কাঁদলেন আমাকে জড়িয়ে। ছোট হলেও আমি বুঝতে পারি তার মন পড়েছিল ভাইয়ার দিকে। কিন্তু ভাইয়া তো নিরুদ্দেশ।   

হঠাৎ ফোন লাইনটা কেটে যায়। আম্মা ফোন হাতে নিয়ে মাটিতে পড়ে যান। আব্বা “হ্যালো” “হ্যালো” করেন। ওপাশ উত্তরহীন। 

এই ছিল ভাইয়ার শেষ কথা। সে আছে না নাই কেউ জানেন না। মরুভূমির মরীচিকার মতো আমার ভাইটা এভাবে হারিয়ে গেল।