মরার রোগীরে নিয়েও টানা হ্যাঁচড়া। আছি ক্যান্সারের শেষ স্টেজে। নিউ ইয়র্কের এক হাসপাতালের প্যালিয়েটিভ কেয়ারে। রোবট নার্সরা একবার এইখানে নেয়। আবার আরেকবার আরেকখানে।
এখন ব্রেইন ট্রান্সপ্ল্যান্ট খুব স্বাভাবিক বিষয়। মৃত্যুর পর আমার ব্রেইন সেটআপ হবে পক্ষাঘাতগ্রস্ত এক বাংলাদেশি তরুণীর মাথায়। বিষয়টির একইসঙ্গে বৈজ্ঞানিক ও আইনি কিছু প্রক্রিয়া আছে। রোবট নার্সরা তা নিয়েই ব্যস্ত। কিন্তু আমার নিজের ওয়ার্ডের বিছানায় ফিরতে ইচ্ছে করছে।
আমার স্ত্রী গত বছর মারা গেছেন। একমাত্র ছেলে ইফসান লন্ডনে। গত মাসে এসেছিল ও। সঙ্গে পরিবার। একটাই নাতি আমার। পুত্রবধূ ফৌজিয়া বলছিল, বাবা, আপনার নাতির চোখ দেখেন। অবিকল আপনার চোখ পেয়েছে ও।
আমি ৪ বছর বয়সী নাতি ইসতির দিকে তাকাই। আমার রক্তধারা। আমাদের রক্তধারা। ইসতি আমার কেমোতে হারানো চুলহীন ন্যাড়া মাথায় বিলি কাটে। ওর মতো করে কথা বলছিল।
: দাদু, আমরা এবার তোমাকে নিয়ে বাংলাদেশে যেয়ে রিকশা আর ইলিশ মাছ ভাজা খাবো।
একবারই ঢাকায় এসেছিল ইসতি। বাংলাদেশ মানে ওর কাছে রিকশা আর ইলিশ মাছ। আমি হাসি। কিন্তু চোখ দিয়ে গড়াচ্ছিল জল। আমি তো চলে যাচ্ছি। আমার এক টুকরো স্মৃতি কি থাকবে পরিণত বয়সের ইসতির মনে?
যে তরুণীর মাথায় আমার ব্রেইন ট্রান্সপ্ল্যান্ট হবে তাকে দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে। তার সমস্ত ডেটা আমাকে দেওয়া হয়েছে। মেয়েটি বড় হয়েছে সিলেটের হবিগঞ্জে। ১০ বছর বয়সে এক সড়ক দুর্ঘটনায় সে প্যারালাইসড। এখন সে ২৮ বছরের তরুণী। আমার ৮৪ বছরের ব্রেইনে সে সুস্থ হবে। ডাক্তাররা অবশ্য নিশ্চিত করতে পারেননি আমার মৃত্যুর দিনক্ষণ। তবে সব প্যাথলজিক্যাল টেস্ট মাফিক আমার আয়ু বড়জোড় আর ৩ মাস। এ সময়ের মধ্যে হবিগঞ্জের তরুণীকে নিউ ইয়র্ক আনা হবে।
আমি ছাত্রজীবনে একবার হবিগঞ্জ গিয়েছিলাম। খোয়াই নদীপাড়ের এক ছোট্ট জনপদ। খুব কুয়াশা সে সময়। যাত্রা ট্রেনে। ভোরে স্টেশনে নেমে এক ঘুমন্ত মফস্বলের দেখা পাই। স্টেশন ঘেঁষা এক পিঠার দোকানে গরম ভাপা পিঠা খাই। একটা ডিম চিতই পিঠাও খাই। দেশি মুরগির ডিমে তৈরি। কুসুমটা ছোট্ট টকটকে লাল। এরপর গাভীর দুধের চা খাই। খেয়াইয়ের পাড়ে যাই। কুয়াশায় মধ্যে দেখি খালের মতো এক জোলো পরিবেশ। তাতে মন খারাপ নয় বক, শালিক, চড়ুইদের। সশব্দে খোয়াই মাতিয়ে রাখছিল ওরা। ছোট্ট টিলার পাশ থেকে তখন সূর্যের আড়মোড়া ভাঙার পালা। আচ্ছা, এখনো তো শীতকাল। আবার মনেও আছে হবিগঞ্জের স্মৃতি। আমার ব্রেইন ট্রান্সপ্ল্যান্ট হচ্ছে যে তরুণীর মাথায় তারও নিশ্চয় হবিগঞ্জে শৈশবের স্মৃতি অনেক। আমার স্মৃতি সে তুলনায় তুচ্ছ।
আমার চিন্তায় এখন নিয়মিত এই তরুণীর ভাবনা। আমার দেহের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গে সে সুস্থ হবে। জীবনে ফিরবে সে। সে জীবন কেমন হবে? ভীষণ কৌতূহল জাগে। আফসোস, আমার দেখার সৌভাগ্য হবে না এর কিছুই!
আমাদের প্রথম সন্তান কিন্তু ইফসান না। ওর আগে এক মেয়ে জন্ম দেন আমার স্ত্রী। পৃথিবীর আলো দেখার আগেই তার মৃত্যু হয়। বেঁচে থাকলে মেয়েটার বয়সও হতো ২৮। হবিগঞ্জের তরুণীটি এখন যে বয়সী। এজন্যই ওর কথা ভাবতে ভালো লাগে। যদি দেখা হয়। আর কথা বলার অবস্থায় থাকি। তবে তার হাত ধরে বলব,
“মারে জীবনটা অনেক সুন্দর। বড় আনন্দে বেঁচো।”