কোকেন সেবনে যেসব শারীরিক ও মানসিক সমস্যা হয়

সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে আফ্রিকার দেশ মালাউয়ের এক নাগরিকের কাছ থেকে আট কেজি তিনশ গ্রাম কোকেন উদ্ধার করা হয়। যার বাজার মূল্য একশো কোটি টাকার বেশি। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বলছে, বাংলাদেশে এটাই এখন পর্যন্ত কোকেনের সবচেয়ে বড় চালান। অধিদপ্তর বলছে, এই কোকেন মালাউয়ি থেকে ইথোপিয়া ও দোহা হয়ে ভারতে পাচারের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশকে রুট হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

তবে, কোকেনের এত বড় চালান ধরা পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে অনেকের মধ্যেই নানা প্রশ্ন জেগেছে। কোকেন কোন ধরনের মাদক’ কোকেন সেবন করলে কী ধরনের ক্ষতি হয়; সেসব জানতে অনেকেই গুগলে সার্চ করছেন।

চিকিৎসকরা বলছেন, কোকেন মূলত উদ্দীপক মাদক। কোকেনের কারণে স্বল্পমেয়াদে ও দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক স্বাস্থ্যগত ও মানসিক ঝুঁকির মধ্যে পড়েন সেবনকারী ব্যক্তি।

চিকিৎসকরা আরও বলছেন, কোকেন গ্রহণের ৪৮ ঘণ্টা পরেও প্রস্রাবে এর উপস্থিতি থাকে। যা অন্য মাদকে থাকে না। এছাড়া অন্য মাদকসেবীদের চেয়ে কোকেনসেবীদের ২৪ গুণ বেশি হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা থাকে।

কোকেন সেবনে যেসব শারীরিক ও মানসিক সমস্যা হয়

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, কোকেন সেবনকারীরা অতিরিক্ত উত্তেজনায় ভোগে। অতিরিক্ত কথাবার্তা বলে। নাক দিয়ে অনবরত পানি পড়ে। নাক দিয়ে অনেক সময় রক্তপাত হয়। কোকেনের প্রতিক্রিয়ায় ঘুম কমে যায়, ক্ষুধা মন্দাভাব হয়, ওজন কমে যায়। অতিরিক্ত কোকেন সেবনের ফলে হার্টবিট বেড়ে যায়, যা রক্ত সঞ্চালনে বাধা দেয়। ফলে হার্ট অ্যাটাক হয়। অতিরিক্ত কোকেন সেবনে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হতে পারে। স্ট্রোকের মতো ঘটনা ঘটে।

কোকেন সেবনকারীদের প্রথম পর্যায়ে অনেক সেবনকারী আত্মবিশ্বাস বেড়ে যাওয়ার কথা বলে থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি তাদের বিষণ্ণতা, অবসন্নতার দিকে ঠেলে দেয়। চরম মাত্রায় সেবনকারীর মুড সুইং হয়, অনেক সময় বিপজ্জনক আচরণ করে।

বাংলাদেশে মাদক বিরোধী প্রচারণা নিয়ে কাজ করা সংগঠন “মানস” এর প্রতিষ্ঠাতা ডা. অরূপ রতন চৌধুরী যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলাকে বলেন, “অন্য মাদকসেবীদের চেয়ে কোকেন সেবনকারীদের ২৪ গুণ বেশি হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা থাকে। কোকেন এমন ধরনের মাদক যা সেবন করার ৯০ দিন পরও শরীরে যার উপস্থিতি পাওয়া যায়। ৯০ দিন পরও সেবনকারীর চুল পরীক্ষা করলে কোকেন সেবনের প্রমাণ পাওয়া যায়।”

কোকেন আসক্তদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিকিৎসকরা বলছেন, এরা প্রচণ্ড পরিমাণে নোংরা হয়ে যায়, স্বাস্থ্যগত নানা বিষয় ভুলে যায়। নাকের মধ্যে সাদা পাউডারের মতো কোকেনের পাউডার লেগে থাকে।  কোকেন সেবনকারীরা একাকী থাকতে পছন্দ করে, ফলে অসামাজিক হয়ে পড়ে। স্বভাবগতভাবে দুর্বিনীত হয়ে যায় এরা। এটি মিথ্যা কল্পনার জগতে নিয়ে যায় সেবনকারীকে। স্বল্পমাত্রায় কোকেন সেবন মাদকাসক্তদের তাৎক্ষণিক আনন্দ দিলেও এক সময় এডিকশানের দিকে চলে যায়। ফলে কোকেন নেয়ার মাত্রা বেড়ে যায়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান খান আবুল কালাম আজাদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, “কেউ কেউ আবার হেরোইন ও কোকেন মিলিয়ে একটা আলাদা মিশ্রণ তৈরি করে। এটাকে বলে ‘স্পিট বল’। কোকেন মস্তিষ্ককে উদ্দীপন করে আবার হেরোইন মানুষের নার্ভাস সিস্টেমকে বিষণ্ণতায় ফেলে। এই দুইয়ের মধ্যে তারা একটা বিপরীতধর্মী প্রতিক্রিয়া পাওয়ার চেষ্টা করে। মস্তিষ্কে সবসময় কোকেনের চাহিদা তৈরি হয় ফলে তা না পেলে তাদের বিষণ্ণতা বোধ তৈরি হবে। একসময় ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে তাদের আচরণ। যারা কোকেন নেয় তারা ধীরে ধীরে বিয়ার, অ্যালকোহল, ফেনসিডিলসহ অন্য ধরনের মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ে।” অর্থাৎ কোকেন সেবনকারীরা “পলিড্রাগ এবিউজার” এ পরিণত হয় বলে জানান তিনি।

কোকেন উৎপাদন

কোকেন মূলত উদ্দীপক মাদক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কোকা পাতা থেকে কোকেন তৈরি হয়। এই পাতাকে পরিশুদ্ধ করে বেইজ তৈরি করা হয়। পরে অ্যামোনিয়া, সোডিয়াম বাই কার্বনেট বা সালফিউরিক এসিড এবং পানি দিয়ে এটি পাউডার হিসেবে তৈরি করা হয়।

দক্ষিণ আমেরিকার বেশ কয়েকটি দেশে এই পাতার চাষ বেশি হয়। সেখান থেকেই সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে এটি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে দুইশ-আড়াইশ ফুট উপরে কোকা পাতা উৎপাদন হয়।

জাতিসংঘের অপরাধ ও মাদক বিষয়ক কার্যালয় (ইউএনওডিসি)র “গ্লোবাল কোকেন রিপোর্ট ২০২৩” এ বলা হয়েছে, ২০২০ সালে বিশ্বের মোট কোকেনের ৬১% কলম্বিয়াতে উৎপাদন হয়েছে। এ সময় পেরুতে ২৬%, বলিভিয়া ও আশেপাশের এলাকায় ১৩% কোকেন উৎপাদিত হয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের চিফ কেমিক্যাল এক্সামিনার দুলাল কৃষ্ণ সাহা বিবিসি বাংলাকে জানান, বর্তমান ইরাক এক সময়ের মেসিডোনিয়াতে কোকা পাতার উৎপাদন বেশি হতো। সে সময় মেসিডোনিয়ার রাখালরা তাদের ভেড়াগুলোকে মাঠে ছেড়ে দিতো। ওই পাতা ভেড়ার খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

কোকা পাতাকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার পর এক কেজি কোকেন তৈরি করতে বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৫ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়। তাই এটি বিশ্বজুড়েই বেশ দামি মাদক। কোকেন ব্যবসায়ীদের “ব্যারোন” বলা হয়।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮-তে, কোকেনকে গুরুতর অপরাধ বিবেচনা করে “ক” শ্রেণীভুক্ত করা হয়েছে। এই আইনে, ২৫ গ্রামের বেশি কোকেনসহ কোনো ব্যক্তি ধরা পড়লে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।