বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের শেষ দিনে দীর্ঘ বিদায়ী বার্তা দিয়েছেন নাছির উদ্দীন নাছির।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকালে নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ পথচলা, দায়িত্বকালের নানা অভিজ্ঞতা, সাফল্য-ব্যর্থতা, জুলাই-আগস্টের আন্দোলন এবং সংগঠনের নেতাকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।
বিদায়ী বার্তায় নাছির বলেন, ‘‘ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের আজ শেষ দিন।’’ তার ভাষায়, এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ, কঠিন, ঘটনাবহুল এবং একই সঙ্গে গৌরবের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি হচ্ছে। বিদায়ের মুহূর্তে সংগ্রাম, সাফল্য, ব্যর্থতা, আনন্দ-বেদনার পাশাপাশি সহযোদ্ধাদের ভালোবাসার কথা স্মরণ করেন তিনি।
ওয়ান-ইলেভেনের কঠিন সময়ে রাজনৈতিক জীবনের শুরু হয়েছিল উল্লেখ করে নাছির জানান, দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজনৈতিক পথচলায় সংগ্রাম, ত্যাগ, নির্যাতন, গুম ও খুনের ভয়াবহ বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এ সময়ে যারা গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন তিনি।
নোয়াখালীর সুবর্ণচরের সন্তান নাছির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হন। একসময় সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক হওয়ার সুযোগ পাবেন, তা তখন ভাবেননি বলেও জানান তিনি। তার মতে, রাজনীতি শুধু পদ-পদবির বিষয় নয়; মানুষের জন্য কাজ করা, সংকটে পাশে দাঁড়ানো এবং নিজের বিশ্বাসের পক্ষে দাঁড়িয়ে থাকার দীর্ঘ যাত্রা।
২০২৪ সালের ১ মার্চ সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে পথ চলতে হয়েছে উল্লেখ করে নাছির বলেন, তার দায়িত্বকালের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় ছিল ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন।
সেই সময়ে নেতাকর্মীদের রাজপথে সক্রিয় রাখা, তাদের সাহস জোগানো এবং সংগঠনের প্রতিটি স্তরকে আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে ছাত্রদলের অসংখ্য নেতাকর্মীর ভূমিকার কথা তুলে ধরে নাছির ঢাকার পাঁচ বিশ্ববিদ্যালয়, পাঁচ কলেজ ও চার মহানগরের তৎকালীন নেতৃত্বের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
তিনি জানান, আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেকের নাম হয়তো ইতিহাসের পাতায় লেখা হবে না। তবে গণআন্দোলনের ইতিহাস শুধু কয়েকজন মানুষের নাম দিয়ে শেষ হয় না; এর পেছনে থাকে হাজারো পরিচয়হীন ও নির্ভীক তরুণের ত্যাগ।
আন্দোলনের সময় নাহিদ, আসিফ, হাসনাত, সারজিস, কাদের, মাহিন, রিফাত রশিদ ও হান্নান মাসুদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন নাছির। সংকটের সময়ে একসঙ্গে কাজ করার জন্য তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের পর নোয়াখালী-ফেনী অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হলে সেখানে ছুটে যাওয়ার কথাও স্মরণ করেন নাছির।
তিনি জানান, ওই এলাকার সন্তান হিসেবে বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে তাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। পরে তারেক রহমানও তাকে ফেনীতে গিয়ে বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেন। নির্দেশনা পাওয়ার পর সেদিন রাতেই ফেনীর উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা জানান তিনি।
নাছিরের ভাষায়, রাজনীতি শুধু মিছিল-মিটিংয়ের বিষয় নয়; মানুষের দুর্দিনে তাদের পাশে দাঁড়ানোই রাজনীতির সবচেয়ে বড় পরিচয়।
দায়িত্ব পালনকালে সংগঠনের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেরও মূল্যায়ন করেছেন নাছির। তার দাবি, এ সময়ে প্রায় দুই হাজারের বেশি সাংগঠনিক কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে এটিকে কোনো ব্যক্তির কৃতিত্ব না দিয়ে ছাত্রদলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের সম্মিলিত পরিশ্রমের ফল হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
তবে কিছু অপূর্ণতার কথাও স্বীকার করেছেন বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিত অংশ সম্পন্ন করতে না পারার আক্ষেপ রয়েছে বলে জানান তিনি। এ জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখও প্রকাশ করেন।
কমিটিতে দায়িত্ব না পাওয়া নেতাকর্মীদের উদ্দেশে নাছির বলেন, একটি পদ কারও যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি নয়। যারা এবার দায়িত্ব পাননি, তাদের অনেকেই ভবিষ্যতের নেতৃত্বে আরও বড় ভূমিকা রাখবেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
দায়িত্বকালের আরেকটি আক্ষেপ হিসেবে ছাত্রসংসদ নির্বাচনে প্রত্যাশিত ফলাফল না পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেন নাছির।
একজন সংগঠক হিসেবে এ ফলাফল তাকে ভাবিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, কোথায় ঘাটতি ছিল এবং কোথায় আরও ভালো করা যেত, তা নিয়ে তিনি নিজের কাছে প্রশ্ন করেছেন। তবে রাজনীতিতে পরাজয়ও শিক্ষা দেয় উল্লেখ করে ভবিষ্যতে এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ছাত্রদল আরও শক্তিশালী, গ্রহণযোগ্য ও সংগঠিত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
দায়িত্ব পালনের সময়ে ভুল, সীমাবদ্ধতা ও সিদ্ধান্তের ঘাটতি থাকার কথা স্বীকার করেছেন নাছির। তবে ছাত্রদলের স্বার্থের বাইরে গিয়ে কাজ করার ইচ্ছা কখনো ছিল না বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব, ছাত্রদলের সিনিয়র নেতা এবং সংগঠনের কেন্দ্রীয়, জেলা, মহানগর, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। কোনো পদ-পদবির প্রত্যাশা ছাড়াই যারা সংগঠনের জন্য কাজ করেছেন, তাদের বিশেষভাবে স্মরণ করেন নাছির।
সহযোদ্ধাদের কাছে কোনো আচরণে কষ্ট দিয়ে থাকলে, কোনো সিদ্ধান্তে অন্যায় হয়ে থাকলে কিংবা কারও প্রাপ্য সম্মান দিতে ব্যর্থ হলে ক্ষমা চান তিনি।
বিদায়ী বার্তার শেষ দিকে নাছির স্পষ্ট করেন, সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব শেষ হলেও ছাত্রদলের সঙ্গে তার সম্পর্ক শেষ হচ্ছে না।
তিনি বলেন, ‘‘আজ দায়িত্ব থেকে বিদায় নিচ্ছি, কিন্তু ছাত্রদল থেকে নয়।’’ তার ভাষায়, পদ থেকে বিদায় নেওয়া যায়; আদর্শ, ভালোবাসা ও সহযোদ্ধাদের কাছ থেকে নয়।
আগামী দিনে ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্বের প্রতি পূর্ণ আস্থা থাকবে জানিয়ে নাছির বলেন, তাদের প্রয়োজন হলে তিনি আগের মতোই পাশে থাকবেন।
‘‘অন্য কোনো প্ল্যাটফর্মে, অন্য কোনো দায়িত্বে, অন্য কোনো সময়ে’’ আবার দেখা হবে, এমন ইঙ্গিতও দেন তিনি। একই সঙ্গে নতুন নেতৃত্বের হাত ধরে ছাত্রদল আরও শক্তিশালী, সংগঠিত ও গতিশীল হবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশের গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হোক এবং ভবিষ্যতে একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও সফল বাংলাদেশ দেখার স্বপ্নের কথাও জানান নাছির।