জিএম কাদেরের বাড়িতে হামলার ঘটনায় বৈষম্যবিরোধী দুই নেতাকে জিজ্ঞাসাবাদ

রংপুরে জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের পৈত্রিক বাসভবন স্কাই ভিউয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সেনাবাহিনী বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের দুই নেতাসহ বিএনপি নেতাদের ডেকে এনে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে তাদের সহায়তা চেয়েছে।

শনিবার (৩১ মে) গভীর রাতে রংপুর নগরীর পায়রা চত্বরে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় রাত ৩টা পর্যন্ত নগরী জুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়।

সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দুই নেতাসহ বিএনপি নেতাদের ডেকে বৃহস্পতিবার জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের বাসায় হামলা ভাঙচুরসহ তাণ্ডবের ঘটনায় অংশগ্রহণকারীদের ভিডিও চিত্র ও ছবি দেখিয়ে হামলাকারীদের ধরিয়ে দিতে সহায়তা চেয়েছে।

জানা গেছে, শনিবার রাত ১২টার দিকে সেনাবাহিনী রংপুর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মহানগর আহ্বায়ক ইমতিয়াজ আহমেদ ইমতি ও জেলা আহ্বায়ক ইমরান আহমেদকে পায়রা চত্বরে ডেকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করার খবর পেয়ে রাত দেড়টার দিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তিনি সেনাবাহিনীর ৭২ ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়িার জেনারেল হুমায়ুন কাইয়ুমের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন।

এনসিপির দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, শনিবার রাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দুই নেতা ইমরান ও ইমতিয়াজ শুক্রবার রাতের ঘটনায় রংপুর মেট্রোপলিটান কোতয়ালী থানায় জাপা  চেয়ারম্যান জিএম কাদেরকে প্রধান আসামী ও সাবেক সিটি মেয়র মোস্তাফিজার রহমানসহ ১৮ জনের নামে লিখিত অভিযোগ দায়ের করে থানা থেকে বাসায় ফিরছিলেন। এ সময় সেনাবাহিনীর একটি দল তাদের ডেকে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে।

এসময় সেখানে উপস্থিত রংপুর মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক শমসুজ্জামান শামু, সদস্য সচিব মাহফুজুন্নবী ডন, জেলা সদস্য সচিব আনিসুর রহমান লাকুকেও জিএম কাদেরের বাসায় হামলায় অংশগ্রহণকারীদের ভিডিও দেখিয়ে এ ঘটনায় তাদের দলের লোকজন জড়িত ছিল কি না তা জানতে চায় সেনাবাহিনীর দলটি। এ ছাড়াও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও বিএনপি নেতাদের সেনাবাহিনী ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে তাদের সহযোগিতা কামনা করে।

মহানগর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক ইমতিয়াজ আহমেদ ইমতি সাংবাদিকদের জানান, সেনাবাহিনীর পক্ষ তাদেরকে ফোন করে কোথায় আছেন জানতে চাওয়া হয়। তারা পায়রা চত্বরে আছেন জানালে সেনাবাহিনী সদস্যরা সেখানে চলে আসেন। হামলার ঘটনায় জড়িতদের শনাক্তে তাদের সহযোগিতা চেয়েছেন সেনাবাহিনী বলে জানান তারা।

অপরদিকে, বিএনপির মহানগর আহ্বায়ক শামসুজ্জামান শামু সাংবাদিকদের জানান, সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আমাদেরকেও  এখানে ডাকা হয়েছে । তারা আমাদের কাছে জানতে চেয়েছেন বৃহস্পতিবার রাতে জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের বাস ভবনে হামলার ঘটনায় তাদের দলের কারা কারা জড়িত ছিল। সেনাবাহিনী ওই ঘটনার বেশ কয়েকটি ভিডিও তাদেরকে দেখিয়েছে। আমরা ওই ভিডিও দেখে একজনকে শনাক্ত করেছি। এ ধরনের  সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে কেউ জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তারা।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন সারজিস আলম/ঢাকা ট্রিবিউন

এদিকে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এমন সংবাদ জানতে পেরে রাত ১টার দিকে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম।

তিনি ওই স্ট্যাটাসে লিখেন, “রংপুরে ফ্যাসিস্টদের দোসরদের গ্রেপ্তার না করে অভ্যুত্থানের সহযোদ্ধাদের বিব্রত করলে আগামীকাল রংপুরের রাজপথে আবার দেখা হবে। আর আমরা সেখানে সামনের সারিতে থাকব।”

এর কিছুক্ষণ পর রাত দেড়টার দিকে পর বৃষ্টির মধ্যেই ঘটনাস্থল পায়রা চত্বরে এসে উপস্থিত হন এনসিপি নেতা সারজিস আলম। সেখানে সেনাবাহিনীর ৭২ পদাতিক ব্রিগেডের কমান্ডার বিগ্রেডিয়ার জেনারেল হুমায়ুন কাইয়ুমের সঙ্গে কথা বলেন।

পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “জাতীয় পার্টি বিগত ১৬ বছর আওয়ামী লীগকে স্বৈরাচারী সরকারে পরিণত হতে সমর্থন দিয়েছে। জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের বি-টিম । তারা রংপুরে অরাজকতা সৃষ্টির মাধ্যমে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। তাদের সঙ্গে মিছিলে আওয়ামী লীগ যুবলীগের নেতাকর্মীরা অংশ নিচ্ছে। জিএম কাদের রংপুরে এসে গোপন বৈঠক করে জাতীয় পার্টির আড়ালে আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করার ষড়যন্ত্র করছিলেন। বৈষম্যবিরোধী  ছাত্র আন্দোলন এর প্রতিবাদ করলে জাতীয় পার্টির সন্ত্রাসীরা তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “আওয়ামী লীগের মতো জাতীয় পার্টিকেও নিষিদ্ধ করতে হবে। আমরা সরকারের সঙ্গে এসব নিয়ে কথা বলবো। জাতীয় পার্টির নেতা অবৈধ ভোটে রংপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচিত মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা এখন মেয়র পদ ফিরে পেতে আন্দোলন করছেন। তারা আলটিমেটাম দেন, বিক্ষোভ করেন। তাদের সঙ্গে কারা কারা আছেন, এদের খুঁজে বের করতে হবে।”

এদিকে, সেনাবাহিনীর ৭২ পদাতিক ব্রিগেডের কমান্ডার বিগ্রেডিয়ার জেনারেল হুমায়ুন কাইয়ুম সাংবাদিকদের বলেন, “বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের স্বার্থে সবকিছু করতে প্রস্তুত, সেটাই আমরা রংপুরে করে যাচ্ছি। দেশের মানুষের বিরুদ্ধে যেটা যাবে, সেটা দলমত নির্বিশেষে যে খারাপ কাজ করবে তার বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান খুবই কঠোর। কোনোভাবেই মানুষের ক্ষতি হয়, ভ্যান্ডালিজম করা, কোনো কিছু ভেঙে ফেলা–এই জিনিসগুলো করার অবকাশ আমাদের অবস্থানকালীন নেই। এটাই আমাদের বার্তা।”

তিনি আরও বলেন, “বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও বিএনপি নেতৃবৃন্দ দুপক্ষই আমাদের সহযোগিতা করতে চেয়েছেন। তারা বৃহস্পতিবারের ঘটনার ভিডিও ফুটেজ এবং ছবি দেখে শনাক্ত করতে পেরেছেন কে কে আছেন তাদের দলে, যাদের হাতে লাঠি এবং অন্যান্য জিনিস ছিল, সেগুলো থাকার কথা ছিল না। এজন্য তারা বিব্রতবোধ করেছেন এবং কথা দিয়েছেন আগামীকাল তাদের হাজির করবেন। ভবিষ্যতে তারা এমনটা করবেন না, এটা আমরা আশা করছি।”

প্রসঙ্গত, রংপুরে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের স্কাইভিউ বাসভবনে গত বৃহস্পতিবার (২৯ মে) রাতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর, ককটেল বিস্ফোরন ও মোটরসাইকেল জ্বালিয়ে দেওয়া এবং জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদেরকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে হামলা চালানোর অভিযোগ করে শুক্রবার (৩০ মে) রাতে জাতীয় ছাত্র সমাজের কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব আরিফ আলী বাদি হয়ে একটি মামলা দায়ের করলেও পুলিশ মামলা রেকর্ড না করে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে। এর প্রতিবাদে শনিবার (৩১ মে) জাতীয় পার্টি রংপুর নগরীতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে থানা ঘেরাও হরতালসহ কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করার কথা জানিয়েছে।