শুরু হওয়ার আগেই নানা ধরনের বিতর্কে জর্জরিত ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬৷ বিতর্কের সবচেয়ে বড় পাঁচটি কারণ নিয়ে এ প্রতিবেদন৷
১. ফিফার প্রশ্নবিদ্ধ রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা
২০২৬ বিশ্বকাপ শুরুর আগের কয়েক মাসে ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে বেশ কয়েকবার দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে৷ তাদের একাধিক সাক্ষাৎ ফিফার “নিরপেক্ষতা” নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে৷ বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্টের শান্তি বিষয়ক পরিষদ (বোর্ড অফ পিস)-এর বৈঠকে ইনফান্তিনোকে ইউএসএ লেখা লাল রঙের বেসবল টুপি পরে মঞ্চে বসে থাকতে দেখে এবং বিশ্বকাপ ড্রয়ের সময় ট্রাম্পকে ফিফা শান্তি পুরস্কার দিতে দেখে বিস্মিত হয়েছেন অনেকেই৷ নিজস্ব গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ফিফার সবসময় রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ থাকার কথা৷ কিন্তু ইনফান্তিনোর এমন ভূমিকা ফিফার নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে৷ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যখন যুদ্ধ চলছে, তখন ফিফা সভাপতির এমন ভূমিকা জন্ম দিয়েছে সমালোচনার৷ উল্লেখ্য, এর আগে কখনো বিশ্বকাপের কোনো আয়োজক দেশকে বিশ্বকাপের কোনো দলের সঙ্গে সামরিক সংঘাতে জড়াতে দেখা যায়নি৷
২. খেলা দেখার সুযোগ : কেউ পাবে, কেউ পাবে না
২০২৬-এর ফুটবল বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র৷ কিন্তু কঠোর ভিসা বিধিনিষেধের কারণে বিশ্বকাপে অংশ নেবে এমন কয়েকটি দেশের সমর্থকদের পক্ষে খেলা দেখতে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া কার্যত অসম্ভব৷ ইরান ও হাইতির দর্শকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে রয়েছে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা৷ এই দুটি দেশের ফুটবল দল ও তাদের সহায়তা-কর্মীরাই শুধু যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার অনুমতি পেয়েছে৷
২০২৬-এর ফুটবল বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র৷ কিন্তু কঠোর ভিসা বিধিনিষেধের কারণে বিশ্বকাপে অংশ নেবে এমন কয়েকটি দেশের সমর্থকদের পক্ষে খেলা দেখতে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া কার্যত অসম্ভব৷ ইরান ও হাইতির দর্শকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে রয়েছে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা৷ এছাড়া সেনেগাল ও আইভরি কোস্টের অনেত সমর্থকের জন্যও মাঠে গিয়ে খেলা দেখা প্রায় অসম্ভব৷ কারণ, এসব দেশের নাগরিকদের জন্য পর্যটন ভিসা ইস্যু করা অনেকাংশেই স্থগিত রাখা হয়েছে৷ এর বড় কারণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে অতীতে এসব দেশ থেকে আসা অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষেও যুক্তরাষ্ট্রে থেকে যাওয়ার প্রসঙ্গ৷ এমন আশঙ্কা দূরে রাখতে মার্কিন সরকার এবার কিছু দেশের দর্শনার্থীদের জন্য ১৫ হাজার ডলার (১২ হাজার ৮৭৪ ইউরো)পর্যন্ত নিরাপত্তা জামানত (সিকিউরিটি ডিপোজিট)-এর নিয়ম চালু করেছিল৷ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে যাবার পর সেই অর্থ ফেরত দেওয়ার কথা৷ কিন্তু বিশ্বকাপ শুরুর কয়েকদিন আগে সেই সুযোগও প্রত্যাহার করা হয়৷ এ কারণে বিশ্বকাপ ম্যাচের টিকিট কেটেও যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পারছেন না অনেকে৷
৩. চড়া দামের টিকিট : এক টিকিটের দাম ছয় লাখ ৯০ হাজার ডলার!
টিকটি বিক্রি শুরুর পরপর কিছু টিকিটের দাম ছিল অস্বাভাবিক রকমের চড়া৷ অনেক আসনের জন্য তখন গুনতে হয়েছে কয়েক হাজার ডলার৷ ফাইনালর প্রিমিয়াম টিকিটের প্রাথমিক দাম ছিল প্রায় ১১ হাজার ডলার৷
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ফিফা পরিবর্তনশীল মূল্য নির্ধারণ (ডায়নামিক প্রাইসিং) পদ্ধতি অনুসরণ করার কারণেই টিকিটের চাহিদা অনুযায়ী দামে এমন বড় ধরনের ওঠানামা হয়েছে৷ একই পর্যায়ে একই ধরনের আসনের জন্য ভিন্ন ভিন্ন দামও দিতে হযেছে ক্রেতাদের৷
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্টেডিয়ামের নির্দিষ্ট কোনো ক্যাটাগরি বা অবস্থান বেছে নেওয়া সত্ত্বেও অপেক্ষাকৃত কম সুবিধাজনক আসনের টিকিট পাওয়ার অসন্তোষ৷
ফুটবল ভক্তদের সংগঠন এবং ভোক্তা অধিকার সংস্থাগুলো এরমধ্যে ফিফার বিরুদ্ধে টিকিটের অতিরিক্ত দাম আদায়, স্বচ্ছতার অভাব এবং অন্যায্য বিক্রয়-প্রক্রিয়া অনুসরণের অভিযোগ তুলেছে৷ এসব বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নে দাযের করা হয়েছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ৷ যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি ও নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলরা ইতিমধ্যে ফিফার টিকিট বিক্রয় কার্যক্রম নিয়ে তদন্ত শুরু করেছেন৷
২৮ মে পর্যন্ত ফিফার ওয়েবসাইটে ফাইনাল ম্যাচের সবচেয়ে সস্তা টিকিটের দাম ছিল আট হাজার ৬২৫ ডলার৷ হুইলচেয়ার ব্যবহারের উপযোগী আসনের দাম শুরুই হয়েছিল ন্যূনতম ১০ হাজার ৩৫০ ডলার থেকে আর মাঠের কোণার পতাকা (কর্নার ফ্ল্যাগ)-এর কাছাকাছি অংশের সামনের সারির যে আসনটি একেবারে শেষ পর্যন্ত অবশিষ্ট ছিল তার দাম ধরা হয়েছিল ছয় লাখ ৯০ হাজার ডলার৷
২০২২ ফিফা বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর বেঞ্চে বসা জার্মান দলের খেলোযাড়দের হতাশা৷ সেবার বিশ্বকাপ ছিল ৩২ দলের৷ এবার দলের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৪৮৷ দল বাড়লেও খেলার মান প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে তো?২০২২ ফিফা বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর বেঞ্চে বসা জার্মান দলের খেলোযাড়দের হতাশা৷ সেবার বিশ্বকাপ ছিল ৩২ দলের৷ এবার দলের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৪৮৷ দল বাড়লেও খেলার মান প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে তো?
এবার নকআউট পর্বে ওঠা আগের তুলনায় অনেক সহজ৷ কারণ, প্রতিটি প্রাথমিক গ্রুপ থেকে শীর্ষ দুই দলের পাশাপাশি তৃতীয় স্থানে থাকা সেরা আট দলও পরবর্তী ধাপে খেলার সুযোগ পাবে৷ দলের সংখ্যা বেশি হওয়ায় এবার ৩২ দলের পর্ব ('রাউন্ড অফ ৩২)-ও রাখতে হয়েছে৷ পর্যবেক্ষকদের অনেকেই বলছেন, এই সংস্কার প্রধানত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
অফিসিয়াল টিকিট বিক্রির পাশাপাশি নিজস্ব পুনঃবিক্রয় প্ল্যাটফর্মও পরিচালনা করছে ফিফা৷ সেখানে প্রতিটি লেনদেন থেকে ৩০ শতাংশ অর্থ কেটে নেয়া হয়৷ সমালোচকরা মনে করেন, নানা কারণে টিকিটের দাম অত্যধিক হয়ে যাওয়ায় অনেকেই এবার বিশ্বকাপে প্রিয় দলের খেলা মাঠে বসে দেখতে পারবেন না৷
৪. সবচেয়ে বেশি দল : কতটা ভালো, কতটা মন্দ?
এবারের বিশ্বকাপে দলের সংখ্যা ৩২ থেকে হয়েছে ৪৮৷ এর ফলে মোট ম্যাচ ৬৪ থেকে বেড়ে ১০৪-এ গিয়ে ঠেকেছে৷ এতো দল এবং এতো ম্যাচের এ আসরে খেলার মান খুব ভালো হবে কিনা সে বিষয়ে অনেকেই সন্দিহান৷
এবার নকআউট পর্বে ওঠা আগের তুলনায় অনেক সহজ৷ কারণ, প্রতিটি প্রাথমিক গ্রুপ থেকে শীর্ষ দুই দলের পাশাপাশি তৃতীয় স্থানে থাকা সেরা আট দলও পরবর্তী ধাপে খেলার সুযোগ পাবে৷ দলের সংখ্যা বেশি হওয়ায় এবার ৩২ দলের পর্ব ( 'রাউন্ড অফ ৩২)-ও রাখতে হয়েছে৷ পর্যবেক্ষকদের অনেকেই বলছেন, এই সংস্কার প্রধানত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত৷ তারা মনে করেন, দলের সংখ্যা বাড়ানোয় সবচেয়ে বেশি লাভ হবে ছোট ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনগুলোর এবং ফিফায় সেই দেশগুলোর ভোটের গুরুত্ব অপরিসীম৷
৫. কতটা টেকসই এবং জলবায়ুবান্ধব?
ফিফা প্রচারণায় স্থায়িত্ব ও জলবায়ু সুরক্ষার বিষয়গুলোর গুরুত্ব দিলেও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাবের কারণে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ইতিমধ্যে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে৷ বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এ আসরে ৯০ লাখ টনেরও বেশি কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গত হবে৷ এর প্রধান কারণ বিভিন্ন ভেন্যুর মধ্যে বিশাল দূরত্ব এবং খুব বেশি বিমান-ভ্রমণ৷ এ কারণে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো ফিফার এ আয়োজনকে ইতিহাসের ‘সবচেয়ে বেশি জলবায়ু-ক্ষতিকারক বিশ্বকাপ' হিসেবে অভিহিত করেছে৷