ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর গ্রুপ পর্বের হাইভোল্টেজ ম্যাচে আজ চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন শক্তিশালী জার্মানির মুখোমুখি হচ্ছে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে নতুন রূপকথা ‘কুরাসাও’। ক্যারিবিয়ান সাগরের ছোট্ট এই দ্বীপদেশটির মোট জনসংখ্যা ২ লাখেরও কম, যা বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার মিরপুর এলাকার (প্রায় ৫ লাখ) জনসংখ্যার অর্ধেকেরও কম। অথচ ৪৪৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দেশটিই আজ বিশ্বমঞ্চে জার্মানির মতো পরাশক্তির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এত কম জনসংখ্যা বা ছোট আয়তনের কোনো দেশ এর আগে কখনো মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেনি। একসময় ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ১৫০-এর বাইরে থাকা কুরাসাও বর্তমানে বিশ্বের সেরা ৪৮টি দেশের একটি হিসেবে বিশ্বমঞ্চে খেলছে। তবে শুধু ফুটবলই নয়, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি এবং বিস্ময়কর এক ইতিহাস নিয়ে আজ বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে দেশটি।
গ্রুপ ‘ই’-তে কুরাসাওয়ের প্রতিপক্ষ হিসেবে রয়েছে জার্মানি, ইকুয়েডর ও আইভরি কোস্ট। আজ জার্মানির বিপক্ষে মাঠে নামার আগে দলটির অন্যতম বড় বিজ্ঞাপন তাদের ডাচ কোচ ডিক অ্যাডভোকাট। ৭৮ বছর বয়সী এই প্রবীণ কোচ বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক হেড কোচ হিসেবে রেকর্ড গড়েছেন। দলে বৈচিত্র্য হিসেবে আরও আছেন অধিনায়ক লিয়ান্দ্রো বাকুনা এবং তার ছোট ভাই জুনিনহো বাকুনা।
ভূগোল ও রাজনীতির দিক থেকে কুরাসাও দুটি দ্বীপ নিয়ে গঠিত, মূল দ্বীপ কুরাসাও ও ছোট্ট জনবসতিহীন দ্বীপ ক্লেইন কুরাসাও। অবস্থানগত কারণে হারিকেন বেল্টের বাইরে থাকায় দেশটির আবহাওয়া সারা বছরই চমৎকার থাকে। রাজনৈতিকভাবে এটি সম্পূর্ণ স্বাধীন রাষ্ট্র নয়, আবার পরাধীনও বলা যায় না। ২০১০ সালে নেদারল্যান্ডস রাজ্যের মধ্যে একটি স্বায়ত্তশাসিত দেশের মর্যাদা পায় কুরাসাও। এর বিদেশনীতি ও প্রতিরক্ষার ভার নেদারল্যান্ডসের হাতে থাকলেও অভ্যন্তরীণ সব সিদ্ধান্ত নেয় দেশ নিজেই।
কুরাসাওয়ের সরকারি ভাষা ‘পাপিয়ামেন্তো’। স্প্যানিশ, পর্তুগিজ, ডাচ, ফরাসি আর ইংরেজি মিলেমিশে তৈরি এই ভাষাটি মূলত দেশটির দাস–বাণিজ্য ও ঔপনিবেশিক ইতিহাসের ফসল। একসময় দাসদের মধ্যে ‘গুয়েনে’ নামের একটি গোপন ভাষা প্রচলিত ছিল, যা মালিকেরা বুঝতেন না। সেই ভাষার মিশ্রণও এতে রয়েছে। বর্তমানে দেশটিতে ৫০টিরও বেশি জাতীয়তার মানুষ বাস করেন এবং এখানকার অধিকাংশ মানুষ অনায়াসে ৪-৫টি ভাষায় কথা বলতে পারেন। এই ভাষার একটি বহুল প্রচলিত শব্দ হলো ‘ডুশি’, যার অর্থ মিষ্টি বা সুন্দর। কুরাসাওয়ের সংস্কৃতিতে ভালোবাসা ও ইতিবাচকতার প্রতীক হিসেবে সব জায়গায় এই শব্দটির ব্যবহার দেখা যায়।
ফুটবল দিয়ে বিশ্বজুড়ে হইচই ফেলার আগে থেকেই কুরাসাও বিশ্বক্রীড়ায় নিজেদের নাম লিখিয়েছে বেসবলের মাধ্যমে। ১৯৮৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এই পুঁচকে দেশ থেকে ১৭ জন মেজর লিগ বেসবল খেলোয়াড় উঠে এসেছেন।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের তলানি থেকে উঠে এসে বিশ্বমঞ্চে জার্মানির মুখোমুখি হওয়া, কুরাসাওয়ের এই অবিশ্বাস্য যাত্রা প্রমাণ করে যে, দৃঢ় সংকল্প থাকলে যেকোনো ছোট দেশও বিশ্বকে চমকে দিতে পারে। মাঠের লড়াইয়ে হার-জিত যা-ই হোক, বিশ্বমঞ্চে কুরাসাওয়ের এই উপস্থিতিই ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সুন্দর এক অধ্যায়।