চলমান ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে অনলাইনে খেলা দেখার ‘ফ্রি’ লিংকের আড়ালে বড় ধরনের সাইবার প্রতারণার ফাঁদ তৈরি হয়েছে। ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর কারিগরি জটিলতার সুযোগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষতিকর ও অননুমোদিত লিংক ছড়িয়ে দিচ্ছে হ্যাকার এবং অনলাইন জুয়ার চক্র। এতে সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের ডিভাইস হ্যাক হওয়া এবং ব্যক্তিগত ও ব্যাংকিং তথ্য চুরির মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
ওটিটি জটিলতা ও দর্শকের অভিজ্ঞতা
গত ১১ই জুন থেকে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে শুরু হয়েছে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল। নানা জটিলতার পর বাংলাদেশ সরকারের প্রচেষ্টায় রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিটিভিসহ মোট তিনটি টেলিভিশন সরাসরি খেলা দেখানোর স্বত্ব কেনে। একইসঙ্গে অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও সাবস্ক্রিপশন ফি দিয়ে মাই রবি, টফি, বায়স্কোপ ও আইস্ক্রিনে খেলা দেখার সুযোগ রাখা হয়।
যাদের বাসায় টেলিভিশন নেই, তাদের অনেকেই টাকা দিয়ে খেলা দেখার প্যাকেজ কেনেন। কিন্তু বিশ্বকাপের উদ্বোধনী দিনেই সাবস্ক্রিপশন নেওয়া ব্যবহারকারীদের অনেকেই কারিগরি ত্রুটির কারণে বার বার চেষ্টা করেও ওয়েবসাইটে ঢুকতে পারেননি।
এমনই একজন ভুক্তভোগী ঢাকার মোহাম্মদপুরের বেসরকারি চাকরিজীবী সুলতান মাহমুদ (ছদ্মনাম)। সন্তানদের আসক্তির কারণে বাসায় টিভি না রাখা এই ফুটবলভক্ত ওটিটি প্ল্যাটফর্মের প্যাকেজ কিনেও উদ্বোধনী ম্যাচে লগইন করতে পারছিলেন না, কারণ তার মোবাইলে ওটিপি আসছিল না। নিরুপায় হয়ে ফেসবুকে ফ্রি লাইভ দেখার লিংক খুঁজতে গিয়ে তিনি একটি অ্যাপ ডাউনলোড করেন। কিন্তু ভিডিও কোয়ালিটি ভালো না হওয়ায় যখনই তিনি এইচডি অপশনে ক্লিক করেন, তখনই তাকে একটি অনলাইন জুয়ার সাইটে নিয়ে যাওয়া হয়। নিরাপদ মনে না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তিনি আর অনলাইনে খেলা দেখেননি।
যেভাবে ফাঁদে ফেলা হয়: সাইবার বিশেষজ্ঞদের হুঁশিয়ারি
বিশ্বকাপের স্বাগতিক দেশ কানাডা সরকার তাদের ওয়েবসাইটে সাম্প্রতিক এক সতর্কবার্তায় বলেছে, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে ভুয়া স্ট্রিমিং সাইট, নকল অ্যাপ, ফিশিং এবং বিভিন্ন ধরনের অনলাইন প্রতারণা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক তানভীর হাসান জোহা জানান, ফ্রি অনলাইন ফুটবল স্ট্রিমিং সাইট ব্যবহার করলে বড় ধরনের সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়। প্রতারকেরা ফিফার আদলে হুবহু নকল ওয়েবসাইট তৈরি করে ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করতে ওয়েব ঠিকানায় সামান্য বানান পরিবর্তন করে দেয়, যা দেখে বোঝার উপায় থাকে না।
তিনি সতর্ক করে বলেন, “এই ধরনের অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে প্রায়ই ম্যালওয়্যার, ট্রোজান, স্পাইওয়্যার এবং ক্ষতিকর স্ক্রিপ্ট লুকিয়ে থাকে। এর ফলে ‘কুকি হাইজ্যাক’ - এর মাধ্যমে ব্রাউজারে সংরক্ষিত সেশন কুকি চুরি করে প্রতারকেরা পাসওয়ার্ড ছাড়াই ব্যবহারকারীর ফেসবুক, জিমেইল বা ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে ঢুকে পড়ে এবং ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়।”
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপ
বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) অনলাইন প্রতারণা সংক্রান্ত এই অপরাধগুলো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান জানান, যেসব ফেসবুক আইডির রিচ বেশি, সেখানে কমেন্ট করে খেলার ভুয়া লিংক দিয়ে প্রতারক চক্র ব্যবহারকারীদের তাদের প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসে।
সিআইডি গত দেড় মাসের অভিযানে (১লা মে থেকে ১৬ই জুন এবং পরবর্তী সময়ে) এমন ২৭৮টি ক্ষতিকর ওয়েবসাইটের সন্ধান পেয়েছে। এই ওয়েবসাইটগুলো বন্ধ করতে ইতোমধ্যে বিটিআরসি-র কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এই সংক্রান্ত অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে অন্তত ১৭ জন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং অপরাধে ব্যবহৃত দুই হাজারেরও বেশি আর্থিক মোবাইল পরিষেবা অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিএফআইইউ - এর কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সম্প্রতি এই ধরনের অপরাধে শাস্তি ও দণ্ডের পরিমাণও বাড়ানো হয়েছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আমিনুল হক বাপ্পী বলেন, “বড় ধরনের ঝুঁকি এড়াতে অনলাইনে এই ধরনের লিংক দেখলে সেগুলো আগে যাচাই করে তবেই প্রবেশ করা উচিত।”
আর এর মাধ্যমে কেউ প্রতারিত হলে দ্রুতই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।