বিশ্বকাপজয়ী ইতালিয়ান কিংবদন্তি ফ্রাঙ্কো বারেসি আর নেই

ইতালির কিংবদন্তি ফুটবলার ফ্রাঙ্কো বারেসি মারা গেছেন। ৬৬ বছর বয়সে বারেসির মৃত্যুর খবর আজ জানিয়েছে তার সাবেক ক্লাব এসি মিলান।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিলানের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ফ্রাঙ্কো বারেসির প্রয়াণে অশ্রুসিক্ত মিলান। তার আদর্শ ও সততা ক্লাবের ডিএনএতে চিরকাল খোদাই করা থাকবে, ঠিক যেমন অমর হয়ে আছে তাঁর ঐতিহ্যবাহী ৬ নম্বর জার্সিটি।’

বারেসির মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ প্রকাশ করেনি মিলান। ফুসফুসের টিউমার অপসারণের জন্য ২০২৫ সালের আগস্টে তার একটি অস্ত্রোপচার হয়েছিল। এরপর থেকে তিনি লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যান।

শেষবার বারেসিকে জনসমক্ষে দেখা গিয়েছিল ফেব্রুয়ারিতে। ২০২৬ শীতকালীন অলিম্পিকের আগে সান সিরোতে অলিম্পিক মশাল বহন করেছিলেন তিনি। মিলানের সম্মানসূচক ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন বারেসি।

১৯৮২ বিশ্বকাপে ইতালি দলের সদস্য হয়েও মাঠে নামার সুযোগ পাননি ফ্রাঙ্কো বারেসি। চার বছর পর জাতীয় দলে জায়গা হয়নি তার। তবে ১৯৯০ সালে ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে নিজের প্রথম ম্যাচ খেলার সুযোগ পান এই কিংবদন্তি। সুইপার ও সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার হিসেবে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে জায়গা করে নেন বিশ্বকাপের অলস্টার দলে।

১৯৯৪ বিশ্বকাপে ইতালির অধিনায়ক ছিলেন বারেসি। তার নেতৃত্বে ফাইনালে ওঠে ইতালি। তবে ব্রাজিলের বিপক্ষে সেই ফাইনালে নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় গোলশূন্য থাকার পর টাইব্রেকারে হেরে যায় ইতালি। শুটআউটে বারেসি নিজেও পেনাল্টি থেকে গোল করতে পারেননি।

১৯৮০ ও ১৯৮৮ ইউরোতেও ইতালির প্রতিনিধিত্ব করেন বারেসি। তার বড় ভাই জিউসেপ্পে বারেসিও ইতালি জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন। ১৯৮০ ইউরোতে দুই ভাই একইসঙ্গে ইতালি দলে থাকলেও ফ্রাঙ্কো মাঠে নামার সুযোগ পাননি। বড় কোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে দুই ভাইয়ের একসঙ্গে ইতালি দলের প্রতিনিধিত্বের ঘটনা সেটিই একমাত্র।

১৯৬০ সালের মে মাসে লোম্বার্দিতে জন্ম নেওয়া ফ্রাঙ্কিনো ফ্রাঙ্কো বারেসি ১৯৭৪ সালে এসি মিলানের বয়সভিত্তিক দলে যোগ দেন। মাত্র ১৮ বছর বয়সে ক্লাবটির মূল দলে অভিষেক হয় তার। এরপর পুরো খেলোয়াড়ি জীবন কাটিয়েছেন মিলানেই।

শুরু থেকেই প্রতিপক্ষের আক্রমণ আগেভাগে বুঝে ফেলা, নিখুঁত ট্যাকল, অসাধারণ টেকনিক ও নেতৃত্বের গুণে দ্রুতই নজর কাড়েন বারেসি। মিলানে তাকে প্রথম দিকে ‘পিসকিনিন’ বা ‘লিটল ওয়ান’ নামে ডাকা হতো। পরে সুইপার হিসেবে তার অসাধারণ দক্ষতার কারণে জার্মান কিংবদন্তি ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের সঙ্গে তুলনা করে ‘কাইজার ফ্রাঞ্জ’ নামেও পরিচিতি পান।

মিলানে পাওলো মালদিনি, মাউরো তাসোত্তি ও আলেসান্দ্রো কোস্তাকুর্তাকে সঙ্গে নিয়ে শক্তিশালী এক রক্ষণভাগ গড়ে তোলেন বারেসি। প্রতিপক্ষের স্ট্রাইকারদের জন্য এই রক্ষণভাগ হয়ে উঠেছিল বড় আতঙ্ক।

১৯৯৭ সালে অবসর নেওয়ার আগে মিলানের হয়ে ৭১৯ ম্যাচ খেলেন বারেসি। ক্লাবটির হয়ে এর চেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছেন কেবল পাওলো মালদিনি। মিলানের হয়ে দীর্ঘ ২০ বছরের ক্যারিয়ারে জিতেছেন ছোট-বড় মিলিয়ে ১৯টি শিরোপা এবং ১৫ মৌসুম অধিনায়কত্ব করেছেন।

ইতালির জার্সিতে ১২ বছরের ক্যারিয়ারে ৮১ ম্যাচ খেলে করেছেন এক গোল। ১৯৮২ বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য হলেও কোচের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে ১৯৮৬ মেক্সিকো বিশ্বকাপে দলে জায়গা পাননি। ১৯৯০ বিশ্বকাপে ইতালিকে সেমিফাইনাল পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার পথেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তার।

আশি ও নব্বইয়ের দশকের ইতালিয়ান ফুটবলের অন্যতম বড় তারকা ছিলেন বারেসি। পাওলো মালদিনির মতো কিংবদন্তি সতীর্থ থাকা সত্ত্বেও অনেকের চোখে তিনিই মিলানের ইতিহাসের সেরা ডিফেন্ডার। ক্লাবটির প্রতি তার ভালোবাসার প্রমাণও মেলে ক্যারিয়ারের পুরোটা সময় মিলানেই কাটানোর সিদ্ধান্তে।

বারেসির সম্মানে ১৯৯৭ সালে অবসরের পর মিলান তার ৬ নম্বর জার্সি চিরতরে তুলে রাখে। ক্লাবটির ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে এই বিরল সম্মান পান তিনি।