বিশ্বকাপ ফুটবলের এমন কিছু রেকর্ড যা ভাঙা ‘অসম্ভব’ (শেষ পর্ব)

অন্যান্য প্রতিযোগিতার মতো বিশ্বকাপ ফুটবলও স্বাক্ষী অজস্র রেকর্ডের। বলা হয়ে থাকে রেকর্ড গড়াই হয় সেটি ভেঙে নতুন রেকর্ডের জন্ম দেওয়ার জন্য। “গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ”-খ্যাত ফিফা বিশ্বকাপের একেকটি আসরও বিভিন্ন রেকর্ডের ভাঙা-গড়ার হাতছানি নিয়ে উপস্থিত হয়।

বিশ্বকাপের প্রায় প্রতি আসরেই এমন কিছু রেকর্ডের জন্ম হয়, তা হয়ত আসলেই ভাঙা অসম্ভব। ফুটবলে যদিও অসম্ভব বলে কিছু নেই। তবুও কিছু রেকর্ড ভাঙা বেশ দুরূহই।

বিশ্বকাপ ফুটবলের রেকর্ড বইয়ের পাতা ঘুরে এমন কিছু রেকর্ডের কথা আলোচনা করা যাক যেগুলো রীতিমতো আশ্চর্যের-

টানা সর্বোচ্চ ফাইনালে উপস্থিতি: কাফু (৩)

বিশ্বকাপ ইতিহাসে সফলতম দল ব্রাজিলের হয়ে অনেকেই টানা দুবার বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন মারিও জাগালো, দিদি, গারিঞ্চা, ভাভা, দুঙ্গা, ক্লদিও তাফারেল, রোনালদো, বেবেতো, রবার্তোর মতো সেলেসাও কিংবদন্তিরা। অন্য দেশের হয়েও কেউ কেউ এ কীর্তি ছুঁয়েছেন।

কিন্তু ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা রাইটব্যাক কাফুর নামের পাশে এমন রেকর্ড আছে, যা আর কোনো খেলোয়াড়ের দখলে নেই। বিশ্বকাপের ইতিহাসে ব্রাজিলের হয়ে সর্বোচ্চ ২১ ম্যাচ খেলা কাফু দলের হয়ে পা রেখেছিলেন টানা তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনালে। 


আরও পড়ুন- বিশ্বকাপ ফুটবলের এমন কিছু রেকর্ড যা ভাঙা ‘অসম্ভব’


বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে প্রথমবার কাফু পা রাখেন ১৯৯৪ সালে। সেবার অবশ্য ইতালির বিপক্ষে ফাইনালে কাফুকে নামানো হয় বদলি হিসেবে। তবে মাঠ ছেড়েছিলেন ব্রাজিলের চতুর্থ বিশ্বকাপ শিরোপা উদযাপন করেই।

একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে টানা তিন বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলেছেন ব্রাজিলের কাফু/টুইটার

চার বছর পর ১৯৯৮-এ ফের ফাইনালে ব্রাজিল। এবার আর বদলি হিসেবে নয়, শুরু থেকেই মাঠে ছিলেন ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডার। তবে এবার স্বাগতিক ফ্রান্সের কাছে ০-৩ গোলের পরাজয় নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয় কাফুর দলকে।

২০০২ সালে অনুষ্ঠিত একবিংশ শতাব্দীর প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠে ব্রাজিল। এশিয়ার সেই বিশ্বকাপে কাফু ছিলেন ব্রাজিলের অধিনায়ক। তার নেতৃত্বে জার্মানিকে ২-০ গোলে হারায় সেলেসাওরা। প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে টানা তিন বিশ্বকাপে উপস্থিতির কীর্তিকে দলপতি হিসেবে সোনালী ট্রফি উঁচিয়েই স্মরণীয় করে রাখেন কাফু।

দ্রুততম লাল কার্ড: জোসে বাতিস্তা (৫৬ সেকেন্ড)

১৯৮৬ বিশ্বকাপকে সবাই মনে রেখেছে ডিয়েগো ম্যারাডোনার একক দক্ষতায় আর্জেন্টিনাকে বিশ্বসেরা বানানোর জন্যই। তবে সেই বিশ্বকাপেই চরম অপ্রিয় এক রেকর্ড করে বসেন উরুগুয়ের জোসে বাতিস্তা।

লাতিন আমেরিকান দেশটিকে ১৯৮৬ বিশ্বকাপে নিয়ে আসার পথে এই উরুগুইয়ান ডিফেন্ডারের ছিল বড় ভূমিকা। তাই উরুগুয়ের সমর্থকরাও বাতিস্তাকে ঘিরেই সাফল্যের স্বপ্ন দেখছিল।

কিন্তু বিশ্বকাপে গিয়ে ঘটলো তার বিপরীতটাই। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বের প্রথম ম্যাচে পশ্চিম জার্মানির সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করলেও পরের ম্যাচে ডেনমার্কের কাছে ১-৬ গোলে হেরে উড়ে যা দুবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা।

১৯৮৬ বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ৫৬ সেকেন্ডেই লাল কার্ড দেখেছিলেন উরুগুয়ের জোসে বাতিস্তা/সংগৃহীত

প্রথম রাউন্ডে খাদের কিনারায় দাঁড়ানো উরুগুয়ের শেষ ম্যাচের প্রতিপক্ষ ছিল স্কটল্যান্ড। সেই ম্যাচের শুরুতেই মেজাজ হারিয়ে স্কটিশ মিডফিল্ডার গর্ডন স্ট্রেকানকে বাজেভাবে স্লাইডিং ট্যাকেলে ফাউল করে বসেন বাতিস্তা। ঘড়ির কাঁটায় ম্যাচের বয়স ৫৬ সেকেন্ড হতেই রেফারির লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় তাকে।

স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করে নিজ গ্রুপে তৃতীয় হয়েও প্রথম রাউন্ডের বৈতরণী পার হয় উরুগুয়ে। তবে দ্বিতীয় রাউন্ডে সেবারের চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার কাছে ০-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হয় তাদের।


আরও পড়ুন- বিশ্বকাপ ফুটবলের এমন কিছু রেকর্ড যা ভাঙা ‘অসম্ভব’ (দ্বিতীয় পর্ব)


শুধু বিশ্বকাপ ইতিহাসেই নয়, কুখ্যাতির কারণে বাতিস্তার নাম ঠাঁই পেয়েছে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের পাতাতেও। গিনেস বুকে জায়গা করে নিতে হয়ত সবাই চাইবেন, তবে বাতিস্তা বোধহয় এভাবে চাননি।

বয়োজ্যেষ্ঠ গোলদাতা: রজার মিলা (৪২)

তুলনামূলক কম গোল, রক্ষণাত্মক ফুটবল এবং লাল কার্ডের আধিক্যের জন্য অন্যান্য আসরের চেয়ে ১৯৯০ বিশ্বকাপ কিছুটা ঔজ্জ্বল্য হারিয়েছিল। তবে ইতালিতে অনুষ্ঠিত সেই আসরে আলোর উৎস হয়ে এসেছিল ক্যামেরুন। ১৯৯০ সালে অনুষ্ঠিত ইতালি বিশ্বকাপে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে ফিফা বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে পা রাখে ক্যামেরুন।

অদম্য সিংহদের এই স্বপ্নযাত্রার মূল কারিগর ছিলেন রজার মিলা। সেই বিশ্বকাপে এই ক্যামেরুনিয়ান ফরোয়ার্ড করেছিলেন ৪টি গোল। গোলের পর কর্নার ফ্ল্যাগের কাছে কোমর দুলিয়ে ঐতিহাসিক গোল উদযাপনের জন্ম দেওয়া এ ফরোয়ার্ড সেবারের আসরের দ্বিতীয় রাউন্ডে কলম্বিয়ার বিপক্ষে ৩৮ বছর বয়সে বল জালে জড়িয়ে বিশ্বকাপের বয়োজ্যেষ্ঠ গোলদাতা হওয়ার রেকর্ড গড়েন।

১৯৯৪ বিশ্বকাপে ৪২ বছর বয়সে গোল করে ক্যামেরুনের রজার মিলার উল্লাস/সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ১৯৯৪ বিশ্বকাপে আবারও ক্যামেরুনের হয়ে মাঠে নেমেছিলেন রজার মিলা। সেবার অবশ্য আফ্রিকান দেশটি নতুন কোনো রূপকথার জন্ম দিতে পারেনি, বিদায় নিয়েছিল প্রথম রাউন্ড থেকেই। তবে গ্রুপপর্বে রাশিয়ার বিপক্ষে ৪২ বছর ৩৯ দিন বয়সে গোল করার মাধ্যমে চার বছর আগে নিজের গড়া বিশ্বকাপ ইতিহাসের বয়োজ্যেষ্ঠ গোলদাতা হওয়ার রেকর্ড নিজেই ভাঙেন মিলা।

ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে রজার মিলার সেই কীর্তি আজও বহাল তবিয়তে টিকে রয়েছে। এই ক্যামেরুনিয়ান ফরোয়ার্ডের পর আর কোনো আউটফিল্ড খেলোয়াড়ই তার চেয়ে বেশি বয়সে বিশ্বকাপ ফুটবলে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেননি। রজার মিলার রেকর্ডটি যে তাই খুব দ্রুতই নিকট ভবিষ্যতে ভাঙছে না, সে ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকাই যায়।

বিশ্বকাপের এক ম্যাচে সর্বোচ্চ সেভ: টিম হাওয়ার্ড (১৬)

ফুটবলের সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত বিষয় গোলের জন্য বিশ্বকাপের মঞ্চে ফরোয়ার্ড-মিডফিল্ডাররাই মূলত পাদপ্রদীপের আলোয় থাকেন। কিন্তু গোল ঠেকানোর কারিগর হয়েও কখনও কখনও গোলরক্ষকরাই হয়ে ওঠেন সব আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। ২০১৪ বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক গোলরক্ষক টিম হাওয়ার্ডও ছিলেন এমনই একজন।

ব্রাজিলের এল সালভাদরে ২০১৪ বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল বেলজিয়াম এবং যুক্তরাষ্ট্র। সোনালী প্রজন্মের বেলজিয়াম দলটি সেই ম্যাচের প্রথম মিনিট থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণভাগের ওপর স্টিমরোলার চালানো শুরু করেছিল, যা অব্যাহত ছিল অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো সেই ম্যাচের শেষ পর্যন্ত।

বেলজিয়ান আক্রমণের সামনে যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণ বার বার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়লেও তাদের গোলপ্রহরী টিম হাওয়ার্ড যেন হয়ে উঠেছিলেন চীনের প্রাচীর। মার্কিন গোলরক্ষক ওই ম্যাচে একে একে বেলজিয়ান খেলোয়াড়দের নেওয়া ১৬টি শট প্রতিহত করেছিলেন, যার ১২টি হাত দিয়ে এবং বাকিগুলো পা দিয়ে।

২০১৪ বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের বিপক্ষে একে একে ১৬টি সেভ দিয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের টিম হাওয়ার্ড/সংগৃহীত

সেই ম্যাচে গোলবারের সামনে হাওয়ার্ড এতটাই দুর্ভেদ্য হয়ে উঠেছিলেন যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টুইটারে তাকে নিয়ে বলা হয়, তিনি ওইদিন ডায়নোসরের বিলুপ্তি এমনকি আইসবার্গের সঙ্গে সংঘর্ষের হাত থেকেও টাইটানিক জাহাজকে বাঁচিয়ে ফেলতে পারতেন! এমনকি উইকিপিডিইয়াতেও তখন হাওয়ার্ডকে আমেরিকান সেক্রেটারি অব ডিফেন্স হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।

তবে নিজের শতভাগের চেয়ে বেশি দিয়েও যুক্তরাষ্ট্রকে হার থেকে বাঁচাতে পারেননি টিম হাওয়ার্ড। তাকে দু'বার ফাঁকি দিয়ে বেলজিয়াম ২-১ গোলে জয় তুলে নেয়। তবে সেই ম্যাচে হাওয়ার্ডের নৈপুণ্য বিশ্বকাপের তো বটেই, জায়গা করে নিয়েছে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের পাতাতেও।