মাত্র ১৭ বছর বয়সেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন পেলে। বয়স বিশ পেরোনোর আগেই ব্রাজিলের সরকার তাকে “অরপ্তানিযোগ্য” “জাতীয় সম্পদ” হিসেবে ঘোষণা দেয়। ফুটবলের এই রাজা দীর্ঘদিন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।
ব্রাজিলের সাও পাওলোর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার (৩০ ডিসেম্বর) বাংলাদেশ সময় দিবাগত রাত ১টায় ৮২ বছর বয়সে এই মহাতারকার জীবনাবসান হয়। তার মৃত্যুতে শোকাহত পুরো ফুটবলবিশ্ব।
১৯৫৮ বিশ্বকাপ শিরোপা (জুলেরিমে ট্রফি) হাতে ব্রাজিলের পেলে/সংগৃহীত
পেলের পুরো জীবনের পথচলা, দারিদ্র্যতাপূর্ণ শৈশবের মাঝেও ফুটবলার হয়ে বিশ্বজয়ের ইতিহাস এবং পরবর্তীতে ফুটবলের অসামান্য চূড়ায় আরোহন- সব মিলিয়ে কেমন ছিল পেলের ঘটনাবহুল জীবন?
২৩ অক্টোবর, ১৯৪০
পেলের জন্ম ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোর উত্তরে মিনাস গেরাইসের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তার আসল নাম এডসন আরান্তেস দো নাসিমেন্তো। পেলের বাবা একজন প্রখর অপেশাদার ফুটবলার ছিলেন।
১৯৪৩
আসল নাম এডসন আরান্তেস দো নাসিমেন্তো হলেও ফুটবল বিশ্বে তার পরিচিতি পেলে নামে। তৎকালীন সময়ে বিলে নামে ব্রাজিলে বিখ্যাত ফুটবলার ছিলেন। তিন বছর বয়সী এডসন সেই নাম ঠিকমত উচ্চারণ করতে না পেরে বললেন পেলে। পরে সেই নামটাই তার বাকি জীবনের সঙ্গী হয়ে যায়।
৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৫৬
সান্তোসের হয়ে পেলের পেশাদার ফুটবল ক্যারিয়ার তখন সবে শুরু। ব্রাজিলিয়ান ক্লাবটির জার্সিতে নিজের প্রথম ম্যাচেই করিন্থিয়ানস সান্তো আন্দ্রের বিরুদ্ধে গোল করেন পেলে। পরে সান্তোসেই ক্যারিয়ারের ১৮ বছর পার করে দেন পেলে।
৭ জুলাই, ১৯৫৭
মাত্র ১৬ বছর ৯ মাস বয়সে ব্রাজিলের হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক হয় পেলের। মারাকানা স্টেডিয়ামে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে সেলেসাওদের জার্সিতে পেলে প্রথমবারের মতো মাঠে নামেন। পরে ব্রাজিলের বিখ্যাত হলুদ জার্সিতে তিনি করেন ৭৭ গোল।
২৯ জুন, ১৯৫৮
ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপেই পেলে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেন। ফাইনালে স্বাগতিক সুইডেনের বিপক্ষে ব্রাজিলের জার্সিতে ১৭ বছর ২৪৯ দিন বয়সের পেলে করেন জোড়া গোল। পরে সেলেসাওরাও নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ জিতে নেয়। সেই থেকে সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলা এবং বিশ্বকাপ ফাইনালের গোলদাতার রেকর্ড আজও পেলের দখলে।
১৯৫৮ বিশ্বকাপে ১৬ দিনের ব্যবধানে তিনটি রেকর্ড গড়েছিলেন পেলে, যা আজও কেউ ভাঙতে পারেনি পেলে সংগৃহীত১৯৬২
চিলিতে অনুষ্ঠেয় ১৯৬২ বিশ্বকাপের আগেই ফুটবলের মহাতারকার আসনে বসে গেছেন পেলে। গ্রুপপর্বের প্রথম ম্যাচে মেক্সিকোর বিপক্ষে চার ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে অসাধারণ এক গোল করলেও পরের ম্যাচে চেকস্লোভাকিয়ার বিপক্ষে দূরপাল্লার শট নিতে গিয়ে চোটের শিকার হন। পরে সেই চোট তাকে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে দেয়।
১৯৬৬
নিজের তৃতীয় বিশ্বকাপে গ্রুপপর্বের প্রতিটি ম্যাচেই বাজে ফাউল আর ট্যাকেলের শিকার হন পেলে। চোটগ্রস্ত হয়ে গ্রুপপর্বের দ্বিতীয় ম্যাচে পেলে মাঠের বাইরে ছিলেন। দলের প্রয়োজনে শেষ ম্যাচে তিনি আবার মাঠে ফেরেন। ওই ম্যাচে চোটগ্রস্ত ডান পা নিয়ে খেলেও শেষ রক্ষা হয়নি, ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল বিদায় নেয় গ্রুপপর্ব থেকেই।
১৯ নভেম্বর, ১৯৬৯
পেনাল্টি থেকে লক্ষ্যভেদের মাধ্যমে ভাস্কো দা গামার বিপক্ষে নিজের এক হাজারতম গোল করেন পেলে। স্টেডিয়ামে উপস্থিত সান্তোস ও ভাস্কো দা গামার সমর্থকেরা তাকে দাঁড়িয়ে সম্মান জানান। শুধু তাই না, মাঠের চারদিকে পেলের ল্যাপ অব অনারের জন্য ২০ মিনিট খেলাও থামিয়ে রাখা হয়েছিল।
২১ জুন, ১৯৭০
ব্রাজিলের হয়ে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপার স্বাদ পেলেন পেলে। সেই থেকে এখন পর্যন্ত ফুটবল ইতিহাসের একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে তিনবার বিশ্বকাপ জেতার কীর্তি আছে শুধু পেলের দখলেই। সেই আসরের ফাইনালে ইতালির বিপক্ষে ব্রাজিলকে প্রথম গোল এনে দেন পেলে। শেষ পর্যন্ত ৪–১ ব্যবধানের জয়ে চ্যাম্পিয়নও হয় সেলেসাওরা।
ফুটবল ইতিহাসে পেলে একমাত্র ফুটবলার, যিনি তিনটি বিশ্বকাপ জয় করেন/ সংগৃহীত১৮ জুলাই, ১৯৭১
মাত্র ৩০ বছর বয়সে মারাকানা স্টেডিয়ামে যুগোস্লোভিয়ার বিরুদ্ধে ব্রাজিলের জার্সিতে নিজের শেষ সর্বশেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেন পেলে। ম্যাচটি ২-২ গোলে ড্র হয়।
১০ জুন, ১৯৭৫
৩৪ বছর বয়সে ক্যারিয়ার সায়াহ্নে পেলে যোগ দেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাব নিউইয়র্ক কসমসে। যুক্তরাষ্ট্রে সকার তথা ফুটবল বিপ্লব শুরু হওয়ার পেছনে নিউইয়র্ক কসমসে পেলের যোগদান বড় ভূমিকা রাখে।
ফুটবলের রাজা পেলে/ ফিফা১ অক্টোবর, ১৯৭৭
নিউইয়র্ক কসমস ও সান্তোসের মধ্যকার প্রদর্শনী ম্যাচের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বুট জোড়া তুলে রাখেন পেলে। ওই ম্যাচের প্রথমার্ধে কসমস এবং দ্বিতীয়ার্ধে সান্তোসের হয়ে খেলেন তিনি।
১৮ মে, ১৯৭৮
খেলাধুলার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে শিশুসুরক্ষায় অবদান রাখায় ইউনিসেফের কাছ থেকে আন্তর্জাতিক শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হন পেলে।
১৯৯৪-১৯৯৮
পেলেকে ব্রাজিলের ক্রীড়ামন্ত্রী নিযুক্ত করা হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে কোনো কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের দখলে ওই পদে ছিলেন না।
৩ ডিসেম্বর, ১৯৯৭
যুক্তরাজ্যের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ পেলেকে অনারারি নাইটহুড উপাধি দেন।
একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে দেশের হয়ে তিনবার বিশ্বকাপ জিতেছেন ফুটবলের রাজা পেলে/টুইটার১৯৯৯
আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির কছ থেকে শতাব্দীর সেরা ক্রীড়াবিদ হিসেবে সম্মানিত হন পেলে।
১১ ডিসেম্বর, ২০০০
বিংশ শতাব্দীর সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি দিতে প্লেয়ার অব দ্য সেঞ্চুরি পুরস্কারের ব্যবস্থা করে ফিফা। রোমে অনুষ্ঠিত ফিফা ওয়ার্ল্ড গালায় পেলে এবং ম্যারাডোনাকে যৌথভাবে পুরস্কারটি দেওয়া হয়।
২৯ ডিসেম্বর, ২০২২
৮২ বছর বয়সে পেলে মৃত্যুবরণ করেন।