লিঙ্গবৈষম্য ও বর্ণবাদকে এক ধরনের সামাজিক ব্যাধি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সমাজ থেকে তাই লিঙ্গবৈষম্য ও বর্ণবাদ দূর করতে সচেতন মহল সচেষ্ট। আর এই ব্যাধি দূর করার অন্যতম কার্যকর ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয় খেলাধুলাকে।
ক্রীড়াক্ষেত্রকে লিঙ্গবৈষম্য ও বর্ণবাদ দূর করার আদর্শ জায়গা মনে করার কারণও আছে। বিশ্বজুড়ে ক্রীড়াবিদদের অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে মানেন অনেকেই। তাই ক্রীড়া তারকারা বর্ণবাদ আর লিঙ্গবৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলে সমাজের সবার মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
কিন্তু কখনো কখনো পথভ্রষ্ট খেলোয়াড়রা বর্ণবাদ আর লিঙ্গবৈষম্যের বিষবাষ্প ছড়ান সমাজে। এমনই এক খেলোয়াড়ের নাম ওলি রবিনসন। ইংল্যান্ডের এই ক্রিকেটার নিজে ঠিকই মাঠে নামার সময় সাম্যের জয়গান গেয়েছন। কিন্তু ৯ বছর আগের বর্ণবাদ আর নারীবিদ্বেষী মতামতের জন্য নিষেধাজ্ঞার মুখেও পড়তে হয়েছিল তাকে।
২০১৩ সালে ইয়র্কশায়ারের হয়ে কাউন্টি ক্রিকেটে পা রাখার মাধ্যমে ওলি রবিনসনের পেশাদার ক্যারিয়ারের সূচনা। পরের বছরই এই ইংলিশ পেসার যোগ দেন হ্যাম্পশায়ারে। তবে ২০১৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত সাসেক্সের হয়ে কাউন্টি ক্রিকেটে খেলে যাচ্ছেন ২৯ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার।
কাউন্টি ক্রিকেটে প্রায় ৭ বছর খেলার পর রবিনসনের জন্য ইংল্যান্ড জাতীয় দলের দরজা খোলে বছর তিনেক আগে করোনাভাইরাস মহামারির সময়। থ্রি লায়ন্সদের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ডানহাতি এই ফাস্ট বোলারের অভিষেক হয় ২০২১ সালে, ঘরের মাটিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে।
২০২১ সালের ২ জুন ক্রিকেটের তীর্থখ্যাত লর্ডসে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে রবিনসন প্রথমবারের মতো মাঠে নামেন। অভিষেক টেস্টের দিনেই ম্যাচ শুরুর আগে কালো টিশার্ট পরে দলের বর্ণবাদ ও লিঙ্গবৈষম্যবিরোধী অবস্থানেও যোগ দিয়েছিলেন এই ক্রিকেটার। কিন্তু ইংলিশ এই পেসার হয়ত তখনও জানতেন না, এই বর্ণবাদ ও লিঙ্গবৈষম্যের কারণেই তাকে শাস্তির মুখে পড়তে হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের দিনেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টুইটারে রবিনসনের বর্ণবিদ্বেষী ও লিঙ্গ বৈষম্যমূলক মন্তব্য সামনে আসে। টুইটারে রবিনসন সেই পোস্টগুলো করেছিলেন আন্তর্জাতিক অভিষেকেরও অনেক বছর আগে। কিন্তু সমালোচনার মুখে পড়লে ২০১২ ও ২০১৩ সালের সেই টুইটগুলোই এ ক্রিকেটারের জন্য গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়ায়।
শেষ পর্যন্ত অতীতের লিঙ্গবৈষম্য ও বর্ণবাদী মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চান রবিনসন। তাতে চিড়ে ভেজেনি। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে পরের টেস্ট থেকেই তাকে বহিষ্কার করা হয়। শুধু তাই না, রবিনসনের বিরুদ্ধে পরে তদন্ত এবং শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে রবিনসনের শাস্তিও ঘোষণা করে ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড (ইসিবি)।
বর্ণবিদ্বেষী ও লিঙ্গ বৈষম্যমূলক মন্তব্যের কারণে রবিনসনকে ৮ ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল ইসিবি। এই আট ম্যাচের মধ্যে ৫ ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা ছিল আবার দুই বছরের জন্য স্থগিত। অর্থাৎ দুই বছরের মধ্যে নতুন করে আবার এই বিতর্কে না জড়ালে রবিনসনের এই শাস্তি মওকুফ করা হবে।
স্থগিত নিষেধাজ্ঞা বাদে বাকি তিন ম্যাচের নিষিদ্ধ হওয়ার মেয়াদ খুব দ্রুতই পূর্ণ হয়ে যায় রবিনসনের। তাই অল্প সময়ের মধ্যেই আবার ক্রিকেটে ফেরেন এই ইংলিশ পেসার। নতুন করে আর বিতর্কে না জড়ানোয় পরবর্তীতে তাকে আরনিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হয়নি। তবে ৩,২০০ পাউন্ড জরিমানা ঠিকই গুণতে হয় অলি রবিনসনকে।
সম্প্রতি রবিনসনের মতো একই চিত্র দেখা গেছে বাংলাদশ জাতীয় দলের জার্সিতে সদ্য অভিষেক হওয়া তানজিম হাসান সাকিবের ক্ষেত্রে। সদ্য সমাপ্ত এশিয়া কাপের সুপার ফোরে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে আন্ত আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখেন অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপজয়ী এই তরুণ পেসারের। ওয়ানডেতে নিজের অভিষেক ম্যাচেই ব্যাট হাতে ছোটখাটো ক্যামিওর পাশাপাশি বল হাতে শুরুতে জোড়া উইকেট নিয়েছেন ২০ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার।
মাঠের পারফরম্যান্সে প্রসংসিত হলেও ভাইরাল হওয়া পুরোনো কিছু ফেসবুক পোস্টের কারণে তোপের মুখে পড়েছেন সাকিব। ২০২২ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তানজিম সাকিবের ফেসবুক পেজে দেওয়া একটি পোস্ট নিয়েই মূলত বিতর্কের সূত্রপাত।
সেই পোস্টে সাকিব বলেন, “স্ত্রী চাকরি করলে স্বামীর হক আদায় হয় না, স্ত্রী চাকরি করলে সন্তানের হক আদায় হয় না, স্ত্রী চাকরি করলে তার কমনীয়তা নষ্ট হয়, স্ত্রী চাকরি করলে পরিবার ধ্বংস হয়, স্ত্রী চাকরি করলে পর্দা নষ্ট হয়, স্ত্রী চাকরি করলে সমাজ নষ্ট হয়। স্ত্রীকে যেই স্বামী বলে- আমার স্ত্রীর চাকরি করার দরকার নেই। আমি যা পাই তোমাকে খাওয়াব, সে তাকে রাজরানি হয়ে আছে। এখন সে রাজরানি না হয়ে কর্মচারী হতে চায়। আসলে স্ত্রী স্বামীর মর্যাদা বোঝেনি, স্ত্রী নিজের মর্যাদাও বোঝেনি।”
পোস্টে সাকিব আরও বলেন, “ঘর একটি জগৎ। অসংখ্য কাজ রয়েছে। আজ ছেলেদের বেকারত্বের বড় কারণ হচ্ছে- মেয়েরা এগিয়ে আসছে, ছেলেরা কোনো চাকরি পাচ্ছে না। একটি ছেলেকে চাকরি দিলে পুরো পরিবারের উপকার হয়। (অতএব মা-বোনেরা নিজের আত্মমর্যাদা রক্ষার্থে স্বামীর আনুগত্য ও বাসায় অবস্থান করে রানির হালাতে অবস্থান করুন। অতএব মা-বোনেরা দুনিয়া কামাতে যেয়ে আখেরাত না হারিয়ে ঘরে অবস্থান করে স্বামী-সন্তানের খেদমত করে দুনিয়া ও আখেরাত দুটিই কামাই করতে পারবেন ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তাওফীক দান করুন। আমিন।)” পোস্টের শেষে একটি মাইক্রোফোনের ইমোটিকনসহ “শায়খ আবু বকর মুহাম্মাদ জাকারিয়া (হাফিযাহুল্লাহ)” নামটি লেখা আছে।
এর আগে ইমার্জিং এশিয়া কাপ চলাকালেও সাকিবের পেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ফ্রি মিক্সিং অথবা অবাধ মেলামেশা নিয়ে মন্তব্য করা হয়েছিল। পরে সেটি নিয়েও বিতর্ক হয়। গত ১৯ জুলাইয়ের সেই পোস্টটিতে লেখা ছিল, “ভার্সিটির ফ্রি মিক্সিং আড্ডায় অভ্যস্ত মেয়েকে বিয়ে করলে আর যাই হোক সন্তানের জন্য একজন লজ্জাশীলা মা দিতে পারবেন না। অবশ্য এই বিতর্কিত পোস্টটি পরে মুছে ফেলা হয়।”
সাম্প্রতিক সময় এসব পোস্ট ভাইরাল হওয়ার পর সেগুলো নিয়ে সাকিবের বিরুদ্ধে সমালোচনা হলেও তিনি এখনো এ নিয়ে মুখ খুলেনি।