ইন্টারনেট ব্যবহারের কারণেও অনেক বিদ্যুৎ ব্যয় হয়। সম্পদের প্রকৃত মূল্য, অর্থনৈতিক প্রণালী ও কার্যকলাপের সার্বিক পরিণাম সম্পর্কে নতুন করে ভাবনা-চিন্তার প্রয়োজন বাড়ছে।
পৃথিবীতে পরিবহণ খাতে বছরে ৮০০ কোটি টনেরও বেশি কার্বন নির্গমন ঘটে। অর্থাৎ বিশ্বের মোট কার্বন নির্গমনের প্রায় এক-চতুর্থাংশের জন্য এই খাত দায়ী। সেইসঙ্গে অন্যান্য গ্রিনহাউজ গ্যাসও রয়েছে।
সেনকেনব্যার্গ সোসাইটির ফল্কার মোসব্রুগার এ বিষয়ে বলেন, “খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অবশ্যই বিশাল পরিমাণ জ্বালানির ব্যবহার হয়। সেইসঙ্গে কারখানায় উৎপাদন এবং পরিবহণ খাতও এই তালিকায় রয়েছে। এখন পর্যন্ত আমরা শুধু কারখানার যন্ত্রপাতির বিশাল জ্বালানির চাহিদা কমানোর চেষ্টা করে এসেছি। কিন্তু ভবিষ্যতে মোবিলিটির ক্ষেত্রেও জ্বালানির ব্যবহার কমানোর দিকে আমাদের আরও মনোযোগ দিতে হবে। শুধু বড় কারখানাগুলোর দিকে নজর দিলে চলবে না।”
আরও পড়ুন- বাড়ছে না ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের গ্রাহক
কিন্তু মানুষ নড়াচড়া না করেও জ্বালানি খরচ করে। এখন পর্যন্ত পুরো পৃথিবীতে বিদ্যুতের চাহিদার মাত্র ১%-এর উৎস ইন্টারনেট। কিন্তু ইন্টারনেট যদি একটা আস্ত দেশ হতো, বিদ্যুতের চাহিদার মাপকাঠিতে সেটি শীর্ষ পর্যায়ে থাকতো। গোটা বিশ্বে প্রায় সাড়ে ৪০০ কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। সার্চ ইঞ্জিনে মাত্র ২০ বার কোনো কিছুর খোঁজ করলেই এনার্জি সেভিং বাল্বের এক ঘণ্টার সমান বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়।
ইন্টারনেটের জন্য বিশাল সার্ভার ২৪ ঘণ্টা ধরে চালু রাখতে যে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের প্রয়োজন হয়, সেগুলোর বিদ্যুতের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইন্টারনেট নোডও এর ব্যতিক্রম নয়।
ফল্কার মোসব্রুগার বলেন, “আগামী বছরগুলোতে ইন্টারনেটের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা ১৩.১৪% দাঁড়াবে বলে আমাদের অনুমান। অর্থাৎ ব্যাপক আকারে ডিজিটালাইজেশনের কারণে বিশাল মাত্রায় বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। শুধু ফাইভ-জি ও পরে সিক্স-জি নেটওয়ার্কের কারণে অভাবনীয় পরিমাণ বিদ্যুতের প্রয়োজন হবে।”
স্মার্ট হোম ও অটোনোমাস ড্রাইভিংয়ের মতো তথ্যনির্ভর প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ছে। ডিজিটাল বিপ্লব সবে শুরু হয়েছে।
রয়টার্সআরও পড়ুন- কৃষকদের ডিজিটাল আইডি ও স্মার্ট কার্ড দেবে সরকার
পৃথিবীর ক্ষতি কিছুটা হলেও কমাতে প্রত্যেকটি মানুষ তার দৈনন্দিন জীবনে কিছু পরিবর্তন আনতে পারে। তবে বৃহত্তর পরিসরেও পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে, বিশেষ করে অর্থনৈতিক প্রণালীর মধ্যে সেটা জরুরি হয়ে উঠছে।
ভূতত্ত্ববিদ হিসেবে রাইনহল্ড লাইনফেল্ডার বলেন, “মোবাইল ফোনে লিথিয়ামের মতো নানা উপকরণ থাকে। সামান্য স্বর্ণও থাকে, যা রিসাইকেল করা হয়। এক্ষেত্রে আমাদের আরও উপকরণকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে পুনর্ব্যবহারের এক চক্র চালু করা উচিত।”
লাইনফেল্ডারের মতে, “আমাদের আসলে এক খাঁটি বৃত্তাকার অর্থনীতির প্রয়োজন। ‘বায়োস্ফিয়ার' থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত। সূর্যের শক্তি জীবজগত চালু রেখেছে। যে জিনিসের আর প্রয়োজন নেই, সেটি পচে যায় এবং তা থেকে নতুন কিছু সৃষ্টি হয়। কিছুই হারিয়ে যায় না। যে প্রণালীতে প্রায় সবকিছুর মূল্য টাকার অংকে স্থির করা হয়, সেটি পৃথিবীর কতটা ক্ষতি করছে, মানুষের মধ্যে সেই উপলব্ধি আনা উচিত।”
শুধু জার্মানিতেই কৃষিক্ষেত্র প্রতি বছর ২,১০০ কোটি ইউরো আয় হয়। অন্যদিকে কৃষিকাজের ফলে পরিবেশের যে ক্ষতি হচ্ছে, তার মাত্রা প্রায় ৯,০০০ কোটি ইউরো। অর্থাৎ আখেরে বিপুল পরিমাণ লোকসান হচ্ছে।
আরও পড়ুন- দেশীয় প্রযুক্তিতে সচল সেই ডেমু ট্রেনের উদ্বোধন
মোসব্রুগার এ প্রসঙ্গে বলেন, “এমন সব ব্যয় বিবেচনায় ধরাই হয় না, কেউ সেই মূল্য চোকায় না। সমাজের সামনে হঠাৎ কার্বন-ডাই-অক্সাইডের সমস্যা উঠে আসে। অথবা ভূগর্ভস্থ পানিতে নাইট্রেট, ইকোসিস্টেমের মধ্যে ফসফেট নিয়ে হইচই হয়। তখন কিন্তু সমাজকে সেই ঠেলা সামলাতে হয়। এটা সত্যি বড় এক সমস্যা, যা আমাদের পরিবর্তন করা উচিত।”
আমাদের গ্রহের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে এক সার্বিক পরিবর্তন অপরিহার্য। পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণীর পক্ষে সে কাজ করা সম্ভব করা অস্বাভাবিক কিছু না।