প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে। তথ্যপ্রযুক্তির দুনিয়ায় ঘটেছে রীতিমতো বিপ্লব। সহজেই মানুষ তার প্রয়োজনীয় তথ্য পেয়ে যাচ্ছেন। এখন তথ্য সংরক্ষণও অনেক বেশি সহজ। তবে সেই তথ্যের দীর্ঘমেয়াদী অস্তিত্ব নিয়ে সংশয় রয়েছে।
অস্ট্রিয়ার হিয়রলাৎস অঞ্চলটি পর্বতে ঢাকা। অনেক শতাব্দী ধরে এই অঞ্চল পাহাড়ি লবণের কারণে বিখ্যাত। এই অঞ্চলেই তথ্য সংরক্ষণের অভিনব উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন মার্টিন কুনৎসে নামে এক ব্যক্তি। প্রাচীন খনির প্রবেশপথ ও সুড়ঙ্গগুলোর সুরক্ষা নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন আর্কাইভ প্রোজেক্ট।
তার প্রজেক্টে পৌঁছাতে হয় ট্রেনে করে। মাটির প্রায় ৫০০ মিটার গভীরে। তিনি তার আর্কাইভ স্থানটির নাম দিয়েছেন “মানবজাতির স্মৃতিভাণ্ডার”।
আর্কাইভ স্থানটিতে প্রবেশ করলে কয়েকটি মাটির বাক্স ছাড়া তেমন কিছুই চোখে পড়বে না। সেগুলোর মধ্যেই প্রকৃত তথ্যভাণ্ডার লুকিয়ে রয়েছে।
মার্টিন কুনৎসে বলেন, “আমরা যেমনটা ভাবছি, আমাদের ইন্টারনেট ও তথ্য সংরক্ষণ দুর্ভাগ্যবশত ততটা নির্ভরযোগ্য নয়। সেটাও এই আর্কাইভ সৃষ্টির আইডিয়ার অন্যতম কারণ। আমি আগামী প্রজন্মের জন্য তথ্য আরও ভালোভাবে রাখতে চাই, যাতে তারা নিজেদের অতীতে ঢুঁ মারতে পারে।”
কুনৎসে একাই বাছাইয়ের কাজ করেন না। অর্থের বিনিময়ে তিনি যেকোনো মানুষের টেক্সট ও ছবিও সংরক্ষণ করেন। যেমন করোনাভাইরাস মহামারির সময় লকডাউনের দিনপঞ্জি; অথবা পাকিস্তানের এক প্রাচীন নিদর্শন গবেষকের ডক্টরেট থিসিস, যেটি তিনি ডিজিটাল ক্লাউড ও সার্ভারে রাখতে ভরসা পাচ্ছেন না।
এখনই গোটা বিশ্বের বৈদ্যুতিক জ্বালানির প্রায় দুই শতাংশ শুধু তথ্য সংরক্ষণের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। তাছাড়া দীর্ঘমেয়াদী ভিত্তিতে সেই তথ্য মোটেই নিরাপদ নয়। যেকোনো সময় মুছে যেতে পারে বা পড়ার অযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।
কুনৎসের দাবি, “তার টাইলগুলো ধ্বংস করা সম্ভব নয়।” ভিয়েনায় জন্মগ্রহণ করা এই ব্যক্তি মোটেই আনাড়ি নন। তিনি রীতিমতো প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেরামিস্ট। ফলে উপাদান সম্পর্কে তার যথেষ্ট জ্ঞান রয়েছে।
টাইলের ওপর যতটা সম্ভব সূক্ষ্ম রেজোলিউশনে ছবি ও টেক্সট জমা রাখতে তিনি এক বিশেষ প্রক্রিয়া সৃষ্টি করেছেন। নিজের বাসার কর্মশালায় সেই কাজ করতে কখনো কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন সময় লেগে যায়। মার্টিনের মতে, “টাইলের সাদা গ্লেস কালার বডির সঙ্গে সংযুক্ত হয়। তারপর আবার শীতল হয়ে মসৃণ সারফেস সৃষ্টি হয়। এ কারণে এটি টেকসই।”
একটি কপি মার্টিনের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক দশকের মধ্যে একটি হিমবাহ গলে যাচ্ছে, তাতে সেটা দেখা যাচ্ছে।
মার্টিন মনে করেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের নথিকরণ আর্কাইভের এক কেন্দ্রীয় উপাদান। জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত তথ্য স্থায়ীভাবে জমা না রাখলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো টেরই পাবে না যে জলবায়ু পরিবর্তন আদৌ ঘটেছিল কিনা। সেই ঘটনার প্রকৃত মাত্রাও জানতে পারবে না।”
এই উদ্যোগ শুধু টাইলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিজ্ঞানীরা কুনৎসের সঙ্গে মিলে তথ্য সংরক্ষণের নতুন মাধ্যম সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করছেন। আরও কম জায়গায় আরও বেশি তথ্য জমা করাই তাদের উদ্দেশ্য। কারণ আগ্রহীদের ভিড় লেগেই আছে। এমনকি ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ও তথ্য জমা রেখেছে।