Sunday, June 28, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বাংলাদেশ থেকে কেন কাঁঠাল নিতে চায় চীন?

চীনের সঙ্গে কাঁঠাল রপ্তানির বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছে বাংলাদেশ

আপডেট : ২৮ জুন ২০২৬, ০৩:৪৫ পিএম

প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক সফরে চীনের সঙ্গে কাঁঠাল রপ্তানির বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছে বাংলাদেশ।

বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করা চীন বাংলাদেশ থেকে কাঁঠাল নেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী, এই বিষয়টি নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে।  

রবিবার (২৮ জুন) বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশ থেকে কাঁঠাল আমদানিতে চীনের আগ্রহ কিন্তু নতুন নয়। এর আগে, গত বছরের মে মাসে চীন যখন বাংলাদেশ থেকে প্রথমবার কাঁচা আম আমদানি শুরু করে, তখন তারা কাঁঠাল ও পেয়ারার মতো ফল আমদানিতেও আগ্রহ দেখিয়েছিল।

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। সফরে দুই দেশের মধ্যে অবকাঠামো, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল ইকোনমিসহ বিভিন্ন বিষয়ে মোট ১৭টি এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়েছে, যার মধ্যে কাঁঠাল রপ্তানির বিষয়টিও রয়েছে।

চীনে কাঁঠাল বা কাঁঠালের তৈরি পণ্য রপ্তানির সুযোগ তৈরি হলে সেটি দেশের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে বলেও মনে করেন তারা। দেশের অন্যান্য কৃষি পণ্যের জন্যও নতুন বাজার তৈরিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন কৃষি পণ্য রপ্তানিখাত সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় কাঁঠাল আমদানিকারক দেশ চীন

বিশ্বব্যাপী কাঁঠালের শত কোটি ডলারের বাজার রয়েছে। ২০১২ সালে বিশ্বব্যাপী কাঁঠাল রপ্তানি যেখানে ২০০ কোটি মার্কিন ডলার ছিল, ২০২৩ সাল নাগাদ তা বেড়ে ৩৭০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, চীন ও ইকুয়েডর বিশ্বব্যাপী রপ্তানির ৬০% সঙ্গে। শুধু ভিয়েতনামই বিশ্ববাজারের ২৫% দখল করে রয়েছে।  

এদিকে চীন হলো কাঁঠালের সবচেয়ে বড় আমদানিকারক। তারা তাদের চাহিদার বড় অংশ ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড থেকে পূরণ করে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ কাঁঠাল উৎপাদনকারী প্রধান দেশগুলোর অন্যতম হলেও বৈশ্বিক বাজারে দেশের অংশগ্রহণের হার কম।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈশ্বিক কাঁঠাল রপ্তানিতে বাংলাদেশের অংশ মাত্র ০.৩%। যুক্তরাজ্যের বাজারে বাংলাদেশের কাঁঠাল রপ্তানির প্রায় ৭৬% যায়। এছাড়া ইতালি, কানাডা ও ফ্রান্সসহ এই চার দেশেই মোট রপ্তানির ৮৫% যায়। ফলে চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে কাঁঠাল বাণিজ্যের একটি বড় সুযোগ রয়েছে।

অর্থনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে কিনা?

বাংলাদেশে ব্যাপক কাঁঠাল উৎপাদন হলেও গ্রাহক পর্যায়ে এর জনপ্রিয়তার সীমাবদ্ধতা এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবের কারণে উৎপাদিত কাঁঠালের বেশিরভাগই নষ্ট হয়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ফল গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বাংলাদেশে আট থেকে ১০ লাখ টন কাঁঠাল উৎপাদন হয়। কিন্তু অভ্যন্তরীণ চাহিদা কম থাকা এবং রপ্তানির সুযোগ না থাকায় প্রতি বছর এর ৪৫% এর বেশি নষ্ট হয়।

ফল গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, “বাংলাদেশে উৎপাদিত ফলের মধ্যে আম প্রথম, কলা দ্বিতীয় এবং তৃতীয় কাঁঠাল।”

তিনি জানান, কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে এ পর্যন্ত কাঁঠালের ছয়টি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। বিশ্বে কাঁঠাল উৎপাদনে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।

কাঁঠাল ব্যবহার করে গবেষণাগারে ভেজিটেবল মিট, চিপস, আচার, জেলি, আইসক্রিম, কেকসহ বিভিন্ন ধরনের খাদ্যদ্রব্য তৈরি করছেন গবেষকরা। এমনকি কয়েক বছর আগে উদ্ভাবিত 'কাঁঠালসত্ত্ব' ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাঁঠাল দিয়ে তৈরি খাবারের জনপ্রিয়তা থাকায় এই পণ্যের ভালো সম্ভাবনা দেখছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা।

তারা বলছেন, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপিন্স, ভিয়েতনামসহ দক্ষিণ এশিয়ার বেশ কিছু দেশে কাঁঠাল দিয়ে তৈরি নানা ধরনের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যদ্রব্যের জনপ্রিয়তা রয়েছে।

চীনের সঙ্গে কাঁঠাল রপ্তানির সমঝোতাকে বাংলাদেশের সার্বিক কৃষি অর্থনীতির জন্য বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ হিসেবেই দেখছেন কৃষি পণ্য রপ্তানিখাত সংশ্লিষ্টরা।

রপ্তানির ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জসমূহ

কাঁঠাল বা কাঁঠালজাত খাদ্যদ্রব্য রপ্তানিতে পণ্যের মান, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং প্যাকেজিংয়ের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা না থাকায় বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে কৃষি অর্থনীতির বড় সুযোগ থাকলেও নানা কারণে তা খুব বেশি এগোতে পারেনি। এক্ষেত্রে নীতিগত ও আইনগত জটিলতার কারণে এ খাত এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি বলেই মনে করেন কৃষি অর্থনীতিবিদ এবং রপ্তানি খাত সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম বলেন, “আমাদের টোটাল কৃষি খাতের রপ্তানি এখনো তেমন ভালো নয়। আমরা যতটুকু রপ্তানি করি তার বেশিভাগই এথনিক মার্কেটে। কৃষি পণ্যের ক্ষেত্রে কোয়ালিটি মেইনটেইন না হওয়ায় ইউরোপিয়ান মার্কেটে এখনও আমরা তেমন ঢুকতে পারিনি।”

তাই মার্কেটে প্রবেশ করার আগে কৃষি পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে এর মান এবং প্রক্রিয়াকরণ এর বিষয়ে প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এক্ষেত্রে সরকারের বিনিয়োগ আরও বাড়ানোর কথা বলছেন কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম। একইসঙ্গে স্থানীয় চাহিদার বিষয়টিও মাথায় রাখতে বলছেন এই কৃষি অর্থনীতিবিদ।

কাঁঠাল কিংবা কাঁঠালজাত খাদ্যদ্রব্য রপ্তানির ক্ষেত্রে এখানেই সবথেকে বড় বাধা দেখছেন বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-বেজড প্রোডাক্টট প্রডিউসারস অ্যান্ড মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ রুহুল আমিন।

কাঁঠাল থেকে খাদ্যদ্রব্য (যেমন- চিপস্, আচার, জেলি) তৈরি এবং প্রক্রিয়াজাত করার একটি উদ্যোগ অতীতে তাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে নেওয়া হলেও নানা জটিলতায় সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি।

কেবল চীন নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশেও বাংলাদেশ থেকে কাঁঠাল দিয়ে তৈরি খাদ্যদ্রব্য রপ্তানির সুযোগ রয়েছে বলেও মনে করেন রুহুল আমিন।

“আমরা যখন সুযোগ পাই, তিনগুণ দাম পাই- তখন সবই দেশের বাইরে পাঠানোর চেষ্টা করি। দেশিয় চাহিদা এবং নিউট্রিশনকেও গুরুত্ব দিতে হবে”, বলেন তিনি।

   

About

Popular Links

x