টানা ভারী বৃষ্টিতে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভূমিধসের ঝুঁকি বেড়েছে। গত ৪ থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত আশ্রয়শিবিরগুলোতে ৯৫টি ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ১৫ জন রোহিঙ্গা নিহত হয়েছেন। গৃহহীন হয়েছেন ৪,৩০৭ জন এবং বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ২৬,১১৯ জন।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সন্ধ্যায় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এসব তথ্য জানায়।
সংস্থাটির বাংলাদেশ প্রতিনিধি ইভো ফ্রেইসেন বলেন, “মানবিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে জরুরি উদ্ধার, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং খাদ্য, চিকিৎসা, আশ্রয়সহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। তবে ১১ জুলাই পর্যন্ত ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় আশ্রয়শিবিরে নতুন করে ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি রয়েছে।”
রোহিঙ্গা কো-অর্ডিনেশন প্ল্যাটফর্মের (আরসিপি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনায় আশ্রয়শিবিরের ঘরবাড়ি, শিক্ষাকেন্দ্র এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সবশেষ গত বুধবার বিকেলে উখিয়ার পাঁচ নম্বর আশ্রয়শিবিরের এ-১১ ব্লকে ভূমিসহ একটি দেয়াল ধসে একটি মাদ্রাসার পাঁচ ছাত্রী নিহত হয়। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে আরও আট শিক্ষার্থী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। এর আগে দুই দিন ধরে উখিয়ার জামতলী, কুতুপালং ও বালুখালী আশ্রয়শিবিরে পৃথক পাহাড়ধসে নারী-শিশুসহ অন্তত আটজনের মৃত্যু হয়।
এ নিয়ে গত কয়েক দিনের ভূমিধসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ জনে। এতে আশ্রয়শিবিরজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
মাদ্রাসায় নিহতদের একজন ছিলেন আশ্রয়শিবিরের বাসিন্দা হাসিম উল্লাহর মেয়ে রাশিদা বেগম (১৩)। বুধবারই তাকে আশ্রয়শিবিরের কবরস্থানে দাফন করা হয়। হাসিম উল্লাহ বলেন, “এক বছর আগে মেয়েকে পবিত্র কোরআন হিফজের জন্য মাদ্রাসায় ভর্তি করেছিলেন। আর মাত্র তিন মাস পর তার হিফজ সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এর আগেই দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়।”
একই ঘটনায় নিহত অপর দুই শিক্ষার্থী উম্মে নেজাতুল (১৩) ও উম্মে সালমা (১২) ছিলেন আবদুস শুকুরের দুই মেয়ে। তাদেরও দুই মাস পর হিফজ সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। দুই মেয়ের মৃত্যুতে পরিবারে শোকের মাতম চলছে বলে জানান তিনি।
ভূমিধসে মেয়েকে হারিয়ে শোকাহত আরেক রোহিঙ্গা মো. ইলিয়াছ বলেন, “মিয়ানমারের জান্তা বাহিনীর নির্যাতন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েও তারা নিরাপদ নন। বর্ষায় পাহাড়ধস, শীতে অগ্নিকাণ্ড এবং অন্য সময় সন্ত্রাসীদের হামলার আতঙ্কে দিন কাটাতে হয়।”
বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে ১৪ লাখের বেশি নিবন্ধিত রোহিঙ্গা বসবাস করছে। এর মধ্যে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর কয়েক মাসে প্রায় আট লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এছাড়া গত দেড় বছরে আরাকান আর্মির নিপীড়নের মুখে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে আরও প্রায় ১ লাখ ৫২ হাজার রোহিঙ্গা এসব আশ্রয়শিবিরে এসেছে।
বালুখালী আশ্রয়শিবিরের রোহিঙ্গা নেতা কামরুল ইসলাম বলেন, “নতুন আসা রোহিঙ্গাদের সরকারিভাবে ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। প্রথমে তারা স্বজনদের ঘরে আশ্রয় নেন। পরে অনেকে আশ্রয়শিবিরের ভেতরের পাহাড় কেটে বসতি গড়ে তোলেন, ফলে ভূমিধসের ঝুঁকি আরও বেড়েছে।”
এদিকে টেকনাফ উপজেলার সাতটি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরেও ভারী বৃষ্টিতে ৩০টির বেশি স্থানে ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। তবে সেখানে এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। এসব শিবিরে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছেন।
টেকনাফের ২৫ ও ২৭ নম্বর আশ্রয়শিবিরের ইনচার্জ খানজাদা শাহরিয়ার জানান, পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা ১০০টি পরিবারকে ইতোমধ্যে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাদের মসজিদ, স্কুল, আশ্রয়কেন্দ্র ও স্বজনদের বাড়িতে অস্থায়ীভাবে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবীদের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পর্যবেক্ষণ এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
জাদিমোরা আশ্রয়শিবির ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান বদরুল আলম জানান, টানা ভারী বৃষ্টিতে রোহিঙ্গাদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়লেও টেকনাফের সাতটি আশ্রয়শিবিরে এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।



রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাদ্রাসার ওপর পাহাড়ধস, নিহত বেড়ে ৮
পাহাড়ধসে ৩০ জন মারা যাওয়ার তথ্য দিলেন ত্রাণমন্ত্রী