সাতক্ষীরায় পূর্ববর্তী সব রেকর্ড ভেঙে গত ২৪ ঘণ্টায় ২১৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা জেলার ইতিহাসে একদিনে সর্বোচ্চ।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) রাতভর এই রেকর্ড ভাঙা টানা বর্ষণে তীব্র জলাবদ্ধতায় পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সাতক্ষীরা জেলা।
পৌরসভাসহ উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখন পানির নিচে। সরকারি অফিস, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়ায় স্থবির হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক কার্যক্রম। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন লাখো মানুষ, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংকটে আছেন নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী ও কৃষকরা।
তলিয়ে গেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি দপ্তর
টানা বৃষ্টিতে পৌর সদরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন পানিতে থইথই করছে। সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ, কলেজ মাঠ, জেলা হাসপাতাল চত্বর, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসসহ একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি দপ্তরের আঙিনায় এখন হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ রোড থেকে শুরু করে মাঝখোলা এলাকার বাসিন্দারা। এসব এলাকার রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় ঘরের ভেতর পানি ঢুকে পড়েছে। নষ্ট হচ্ছে রান্নাঘর, টয়লেট ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা।
সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী অমিত হাসান বলেন, “পানির কারণে কলেজে যাওয়া যাচ্ছে না। নোংরা পানি পার হতে গিয়ে পোশাক নষ্ট হয়ে যায়। টিউবওয়েলগুলো পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এখন পানি কিনে পান করতে হচ্ছে।”
অপরিকল্পিত নগরায়ন ও স্থানীয়দের ক্ষোভ
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ—অপরিকল্পিত নগরায়ন, পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাব এবং ড্রেনগুলো নিয়মিত পরিষ্কার না করায় বছরের পর বছর ধরে এই কৃত্রিম বন্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
কলেজ রোডের দীর্ঘদিনের বাসিন্দা হাসান আলী গাজী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “২০ বছর ধরে এই এলাকায় আছি। আগে সামান্য বৃষ্টিতেই যা হতো, এখনও তাই হচ্ছে। তাহলে উন্নয়নটা হলো কোথায়? নতুন সরকার এসেছে, এখন আল্লাহ জানে আদৌ কোনো স্থায়ী কাজ হবে কিনা।”
মাঝখোলা গ্রামের গৃহবধূ রহিমা বেগম তার দুর্ভোগের কথা জানিয়ে বলেন, “১০ বছর ধরে এই অবস্থা দেখছি। রান্নাঘরে পানি ঢুকে হাঁড়ি-পাতিল ভেসে গেছে, খাওয়া-দাওয়া বন্ধ। ঘরে সাপ-পোকার আতঙ্কে সন্তানদের নিয়ে নিরাপদ জায়গায় রাত কাটাতে হচ্ছে।”
কর্মহীন শ্রমজীবী মানুষ, কিস্তির দুশ্চিন্তা
হঠাৎ এই দুর্যোগে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছেন দিনমজুর ও ভ্যানচালকরা। টানা বৃষ্টির কারণে দু-দিন ধরে বাইরে বের হতে পারছেন না তারা।
ভ্যানচালক ভোলা মিয়া দুশ্চিন্তাগ্রস্ত কণ্ঠে বলেন, “বৃষ্টির জন্য ভ্যান নিয়ে বের হতে পারছি না, কোনো ভাড়া নাই। প্রতিদিনের চাল-ডাল কেনা বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে এনজিওর কিস্তি কীভাবে দেবো, সেই চিন্তায় মাথা কাজ করছে না।”
একই সংকটের কথা জানিয়ে দিনমজুর আখতারুল ইসলাম বলেন, “দুই দিন ধরে ঘরে বসে আছি। পরিবার নিয়ে কী খেয়ে বাঁচবো বুঝতে পারছি না।”
সাতক্ষীরা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী রিপন জানান, মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে এই রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে। সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। তবে তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, খুব দ্রুতই বৃষ্টির এই প্রভাব কমে আসবে।
অন্যদিকে, জলাবদ্ধতা নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) অর্নব দত্ত।
তিনি বলেন, “শহরের জলাবদ্ধতা দূর করতে দ্রুত স্লুইস গেটগুলো খুলে দেওয়া হবে। শহরের প্রাণসায়ের খালে পানি নিষ্কাশনের জন্য সকল ড্রেন সচল করে খালের সঙ্গে যুক্ত করার কাজ চলছে। আশা করছি দ্রুতই পরিস্থিতির উন্নতি হবে “
তবে এলাকাবাসীর আশঙ্কা, বৃষ্টিপাত যদি আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকে এবং দ্রুত পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে এই জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করবে।



