Monday, October 19, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

মৌলভীবাজারের পাঁচগাঁওয়ে ৩০০ বছরের ঐতিহ্য, লাল বর্ণে পূজিত হন দেবী দুর্গা

প্রাচীন এই ঐতিহ্য ও ধর্মীয় বিশ্বাসকে ঘিরে প্রতিবছর অসংখ্য ভক্তের সমাগম ঘটে
আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৩৭ পিএম

শারদীয় দুর্গোৎসবে সাধারণত দেবী দুর্গার প্রতিমা দেখা যায় সোনালি বা গৌর বর্ণে। তবে এই চিরচেনা রীতির ব্যতিক্রম রয়েছে মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁওয়ে। এখানে প্রায় ৩০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে লাল বর্ণের প্রতিমায় পূজিত হয়ে আসছেন দেবী দুর্গা। প্রাচীন এই ঐতিহ্য ও ধর্মীয় বিশ্বাসকে ঘিরে প্রতিবছর দুর্গোৎসবে দেশ-বিদেশের অসংখ্য ভক্ত ও দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে।

স্থানীয় জনশ্রুতি ও লোককথা অনুযায়ী, প্রায় তিন শতাব্দী আগে আধ্যাত্মিক সাধক সর্বানন্দ দাস পাঁচগাঁওয়ে লাল বর্ণের দুর্গাপূজার প্রচলন করেন। কর্মসূত্রে তিনি আসামের শিবসাগরে অবস্থান করতেন। একবার আসামের কামাখ্যা মন্দিরে পূজা দিতে গিয়ে তিনি এক অলৌকিক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন বলে প্রচলিত রয়েছে।

কথিত আছে, পূজার সময় এক কিশোরীর শরীরের বর্ণ ধীরে ধীরে রক্তিম হয়ে ওঠে। সর্বানন্দ দাস তখন উপলব্ধি করেন, তার সামনে স্বয়ং দেবীর আবির্ভাব ঘটেছে।

এরপর তিনি দেবীর কাছে প্রার্থনা জানান, প্রতিবছর শারদীয় দুর্গোৎসবে দেবী যেন তার জন্মভূমি পাঁচগাঁওয়ে ফিরে আসেন। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী তাঁকে পাঁচগাঁওয়ে লাল বর্ণের প্রতিমায় পূজা করার নির্দেশ দেন। সেই বিশ্বাস থেকেই বংশপরম্পরায় আজও এখানে লাল বর্ণের দুর্গাপ্রতিমায় পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

দুর্গোৎসব এলেই উৎসবের আমেজে মুখর হয়ে ওঠে পাঁচগাঁও। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভক্ত ও দর্শনার্থীরা এখানে ছুটে আসেন। দেশের বাইরের অনেক ভক্তের কাছেও এ পূজার পরিচিতি ছড়িয়ে পড়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।

পূজার ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি মন্দির প্রাঙ্গণে বসে মেলা। বিভিন্ন ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণে পুরো এলাকায় তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। ভক্তদের কাছে লাল দুর্গার দর্শন কেবল ধর্মীয় আচার নয়, বরং দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও বিশ্বাসের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের উপলক্ষ।

পাঁচগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি সুমন্ত দাস বলেন, “প্রায় তিনশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এ মণ্ডপে মানুষের আনাগোনা। দেশের সীমা ছাড়িয়ে এ পূজার পরিচিতি এখন বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। এটি কেবল একটি পূজা নয়, আমাদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও ভক্তদের গভীর বিশ্বাসের প্রতীক। বছরের পর বছর ধরে চলা এ ঐতিহ্য ধরে রাখা আমাদের দায়িত্ব।”

শারদীয় দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে স্থানীয় প্রশাসন প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়েছে। রাজনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এনামুল হক চৌধুরী জানান, উপজেলার পূজামণ্ডপগুলোতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে পুলিশ নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা ছাড়াই আনন্দঘন পরিবেশে দুর্গোৎসব সম্পন্ন হবে।

ধর্মীয় ঐতিহ্যের পাশাপাশি ঐতিহাসিক গুরুত্বও রয়েছে মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁওয়ের। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এবং ভারতীয় উপমহাদেশের বিপ্লবী নেত্রী লীলা নাগের স্মৃতিবিজড়িত এই জনপদ স্থানীয় ইতিহাসেও বিশেষ স্থান দখল করে আছে।

একদিকে প্রাচীন ধর্মীয় আচার, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও স্থানীয় সংস্কৃতি সব মিলিয়ে পাঁচগাঁও পেয়েছে স্বতন্ত্র পরিচিতি। স্থানীয়দের মতে, লাল দুর্গার পূজা শুধু একটি গ্রামের ধর্মীয় আয়োজন নয়; এটি পুরো অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মানুষের বিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা এই ব্যতিক্রমী পূজার ঐতিহ্য আজও পাঁচগাঁওকে শারদীয় দুর্গোৎসবের অন্যতম আকর্ষণীয় জনপদ হিসেবে পরিচিত করে রেখেছে।

   

About

Popular Links

x