শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ায় আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে শ্রমিক অসন্তোষ। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকালে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে কারখানায় হাজিরা দিয়ে বেরিয়ে এসে অন্যান্য কারখানার শ্রমিকদেরও কাজে যোগ না দিতে বাধ্য করেন বিক্ষোভকারীরা।
এতে একযোগে শতাধিক পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। পরে আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কে অবস্থান নেন শ্রমিকরা।পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি পয়েন্টে শ্রমিকদের সরিয়ে দেয় পুলিশ।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকাল আটটার দিকে শ্রমিকরা প্রথমে নিজ নিজ কারখানায় প্রবেশ করে কার্ড পাঞ্চের মাধ্যমে হাজিরা নিশ্চিত করেন।
এরপর কারখানা থেকে বেরিয়ে অন্যান্য কারখানার প্রধান ফটকের সামনে জড়ো হয়ে অন্য শ্রমিকদেরও বেরিয়ে আসতে বাধ্য করেন। একপর্যায়ে আশপাশের কারখানাগুলো সাধারণ ছুটি ঘোষণা করলে শতাধিক কারখানার শ্রমিক রাস্তায় নেমে আসেন।
পরে বিক্ষোভকারীরা আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কে অবস্থান নিলে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। পুলিশ কয়েকটি পয়েন্ট থেকে ধাওয়া করে তাদের সরিয়ে দিলে শ্রমিকরা বিভিন্ন শাখা সড়কে অবস্থান নেন।
গতকাল সাভারে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ, পুলিশভ্যান ও মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর আজ সকাল থেকে সাভার শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি অনেকটাই শান্ত রয়েছে।
শ্রমিকদের দাবি, মজুরি বোর্ড কমিশন আগামী ডিসেম্বরে বেতন বাড়ানোর ঘোষণা দিলেও কত টাকা বেতন বাড়ানো হবে, তা সুনির্দিষ্ট করে জানানো হয়নি। এ অনিশ্চয়তার কারণেই তারা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে, যেকোনো ধরনের নাশকতা ও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে শিল্পাঞ্চলজুড়ে জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পুলিশের পাশাপাশি মোতায়েন রয়েছে বিজিবি। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পুলিশের সাঁজোয়া যানও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
শিল্প পুলিশ ১ এর পুলিশ সুপার মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ ঢাকার আওতাধীন সাভারের আশুলিয়া এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি ভালো রয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের আওতাধীন মোট ১,৮৬৩টি কারখানার মধ্যে আজকের দিনের জন্য ৭০টি কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। বাকি কারখানাগুলোতে কার্যক্রম চালু আছে।
তিনি বলেন, “আজ জামগড়া এলাকায় কয়েকটি কারখানায় ছুটির পর কিছু দুষ্কৃতকারী ঢিল ও পাটকেল নিক্ষেপ করছিল। এসময় তাদের কয়েকজনকে আটক করার পর তারা পুলিশের ওপর আক্রমণ করে এবং পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করে। তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করা হয়।”
বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, “পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কিছুক্ষণ আগে প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিক জিরাবো থেকে এনভয় কারখানা পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ মিছিল করেছেন। গাজীপুরে শ্রমিক হত্যার প্রতিবাদে তারা এ কর্মসূচি পালন করেন।”
গ্রেপ্তার ও নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আজকের ঘটনায় কতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো তাদের কাছে কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে এখন পর্যন্ত তাদের কাছে কেউ আটক নেই। এছাড়া বিজিবির পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছে। বর্তমানে পাঁচ প্লাটুন বিজিবি এপিসিসহ এলাকায় মোতায়েন রয়েছে।”
মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, “এ পরিস্থিতিতে থানা-পুলিশ ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ একযোগে কাজ করছে। দুই বাহিনী সমন্বিতভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে এবং সে অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
শ্রমিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “শ্রমিকেরা কর্মপ্রিয় মানুষ, তারা কাজ করতে চান। কিন্তু বাইরে থেকে কিছু দুষ্কৃতকারী ও নাশকতাকারী এসে তাদের ইন্ধন জোগাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উস্কানি দিয়ে তাদের কাজে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছে।”
বিভিন্ন সময় শ্রমিকেরা একত্র হয়ে হইচই করছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, “সরকার এরইমধ্যে ন্যূনতম মজুরি বোর্ড ঘোষণা করেছে। এ কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং জানুয়ারি মাসের শুরু থেকে নতুন মজুরি কার্যকরের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। মালিকপক্ষ নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ।” তাই শ্রমিকেরা কাজে ফিরে গিয়ে আবারও উৎসবমুখর ও কর্মচঞ্চল পরিবেশ ফিরিয়ে আনবেন বলে তারা আশাবাদী।
আন্দোলনে উসকানিদাতাদের শনাক্ত করার বিষয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাঁরা এসব কর্মকাণ্ডে উসকানি দিচ্ছেন, তাদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। ইতিমধ্যে অনেককে আটক করা হয়েছে এবং জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে তাঁদের পরিচয় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।”
তিনি বলেন, “বাইরে থেকে বিভিন্ন দুষ্কৃতকারী ও বহিরাগত ব্যক্তি এসে অশান্ত পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করছে। শ্রমিকদের সামনে রেখে পেছন থেকে তারা উসকানি দিচ্ছে। এসব ব্যক্তির পেছনে কোনো রাজনৈতিক দলের ছত্রচ্ছায়া রয়েছে কি না, তা তারা জানেন না। তবে তাঁরা শ্রমিক নন, বহিরাগত উসকানিদাতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা বেশ সক্রিয়। কোথায় শ্রমিকেরা নামছেন, কোথায় গাড়ি ভাঙচুর হচ্ছে কিংবা কোথায় পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে, সেসব বিষয় নিয়ে তারা প্রচার চালাচ্ছে।



