১৯৯৯ সালে জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থার (ইউনেস্কো) স্বীকৃতির পর থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এর আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে দিনটিকে মহান শহীদ দিবস হিসেবে পালন করা হতো। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকে স্বাধীন বাংলাদেশ জন্মের প্রথম ধাপ বলে মনে করা হয়। ৫০ বছর আগের সেই আন্দোলনের পেছনের প্রেক্ষাপটের ব্যাপ্তি ছিল অনেক দীর্ঘ অনেক গভীর।
ভাষা নিয়ে এ উপমহাদেশে মূল বিরোধ শুরু হয় চল্লিশের দশক থেকেই। ভাষা সৈনিক আবদুল মতিন ও আহমদ রফিকদের ভাষা আন্দোলন-ইতিহাস ও তাৎপর্য বইয়ের বর্ণনা অনুযায়ী, ভাষা নিয়ে প্রথম লড়াইটা প্রধানত সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনেই সীমাবদ্ধ ছিল। চল্লিশের দশকে বাঙালী মুসলমান সাহিত্যিক, শিক্ষক, রাজনীতিবিদদের মধ্যে বাংলা, উর্দু, আরবি ও ইংরেজি চারটি ভাষার পক্ষ-বিপক্ষে নানান মত ছিল।
দেশ বিভাগের বিষয় নিশ্চিত হওয়ার পর সেসময়কার গুরুত্বপূর্ণ “মিল্লাত” পত্রিকায় এক সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছিল, “মাতৃভাষার পরিবর্তে অন্য কোন ভাষাকে রাষ্ট্রভাষারূপে বরণ করার চাইতে বড় দাসত্ব আর কিছু থাকিতে পারে না।”
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পর ভাষা নিয়ে মতবিরোধ আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে অর্থনীতি ও রাজনীতিও হয়ে ওঠে সে বিতর্কের অনুষঙ্গ। ওই বছর দৈনিক আজাদি পত্রিকায় লেখক সাংবাদিক আবদুল হক লিখেছিলেন, “উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেকটি উর্দু-শিক্ষিতই চাকুরীর যোগ্য হবেন এবং প্রত্যেকটি বাংলা ভাষীই চাকুরীর অনুপযুক্ত হয়ে পড়বেন।”
১৯৪৭ সালে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডক্টর জিয়াউদ্দিন আহমেদ উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব করলে আবারও ভাষা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। বাঙালিরা বরাবরই দুইপক্ষের সাংস্কৃতিক বিরোধ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। তাদের সেই উদ্বিগ্নতাকে সত্য প্রমাণ করে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির কয়েক মাসের মধ্যেই পাকিস্তানের প্রথম মুদ্রা, ডাকটিকেট, ট্রেনের টিকেট, পোস্টকার্ড ইত্যাদি থেকে বাংলাকে বাদ দিয়ে উর্দু ও ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করা হয়। পাকিস্তান পাবলিক সার্ভিস কমিশনের এ ঘোষণায় পর ঢাকায় ছাত্র ও বুদ্ধিজীবীদের বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ও পরবর্তীতে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল খাজা নাজিমুদ্দিন ১৯৪৮ সালে আইন পরিষদের অধিবেশনে বলেছিলেন, ভাষা সম্পর্কিত বিতর্ক শুরু হওয়ার আগেই এসব ছাপা হয়ে গেছে। যদিও তার এই বক্তব্য সর্বস্তরে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। তখনই বুদ্ধিজীবীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, মাতৃভাষা পরিবর্তে উর্দু চাপিয়ে দিলে বাংলা ভাষাভাষী পরবর্তী প্রজন্মের অশিক্ষিত এবং বাংলা ভাষার অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে।
ধীরে ধীরে বাঙালীদের মনে ক্ষোভের অনুভূতি সৃষ্টি হয়। আর এখান থেকেই জন্ম নেয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। তখনকার ইসলামি সাংস্কৃতিক সংগঠন তমদ্দুন মজলিসের নূরুল হক ভূঁইয়া, তৎকালীন সংসদ সদস্য সামসুল হক, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লীগের প্রতিষ্ঠাতা অলি আহাদ, পরবর্তীতে বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ তোয়াহাসহ অনেকেই এ পরিষদের সদস্য ছিলেন। তারা শুরুতে গোপনে এটির কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন।
নতুন সৃষ্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রে তখন বাংলা ভাষীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার পরেও ১৯৪৮ সালের ২১শে মার্চ পূর্ব পাকিস্তান সফরে এসে রেসকোর্স ময়দানে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এক সমাবেশে স্পষ্ট ঘোষণা করেছিলেন যে “উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা”। সেই সমাবেশেই উপস্থিত অনেকেই সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে ওঠেন। ফলে দুই পক্ষের ভাষা ও সাংস্কৃতিক পার্থক্য ছিল আরও জোরালোভাবে প্রকাশ্য।
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ওই ঘোষণাকে নতুন রাষ্ট্র সম্পর্কে বাঙালীর স্বপ্নভঙ্গের সূচনা বলা যেতে পারে। কারণ বাঙালীদের মনে পাকিস্তানের প্রতি অবিশ্বাসের ভীত তৈরি হওয়ায় জাতীয়তাবাদের ধারণা স্পষ্ট হতে শুরু করে।
১৯৪৭ থেকে ১৯৫২ সালের প্রথমদিক পর্যন্ত বাঙালীরা জোরালোভাবে রাষ্ট্রভাষা উর্দু সম্পর্কে তাদের বিরুদ্ধ মনোভাব ব্যক্ত করে থেমে থেমে আন্দোলন গেছেন, কারণ জিন্নাহ'র মৃত্যুর পরও রাষ্ট্রভাষা নিয়ে নানা রকম প্রস্তাব, পাল্টা প্রস্তাব চলতে থাকে। তবে সবকিছুর সীমা ছাড়িয়ে যায়, ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি পাকিস্তানের অ্যাসেম্বলিতে উর্দুকেই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়। পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসী হলেও পরদিন ঢাকা সফরে খাজা নাজিমুদ্দিন একই কথার পুনরাবৃত্তি করেন। এরপর 'রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই' স্লোগানটি দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।
ধারণা করা হয়, রাজনৈতিক কারণে খাজা নাজিমুদ্দিনের নেওয়া অবস্থান ও তার দেওয়া বক্তব্য ভাষা আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। কারণ তার সেই মন্তব্যের পরদিন থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় পূর্ব-পাকিস্তানে স্বতঃস্ফূর্ত ধর্মঘট ও বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়।
২১ ফেব্রুয়ারি ভাসানীর নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক, সংস্কৃতিকর্মী এবং পেশাজীবী সম্প্রদায়ের মানুষজন সম্মেলনে অংশ নেন। ওইদিনের পূর্ব ঘোষিত সাধারণ ধর্মঘট প্রতিহত করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও তার আশপাশের এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছিলো।
কিন্তু তা লঙ্ঘন করেই সেদিন জন্ম হয়েছিল শহীদ দিবসের। ঢাকা মেডিকেল কলেজের কাছেইবাংলা ভাষার জন্য আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর গুলিবর্ষণ করা হয়েছিল। সেদিনের ভাষা আন্দোলনে কতজন শহীদ হয়েছিলেন সে বিষয়ে সঠিক হিসাব এখনও জানা যায়নি। সেদিন এবং পরদিন পুলিশের গুলিতে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার এবং শফিউর ছাড়াও আরও অনেকে শহীদ হয়েছিলেন বলে ভাষা আন্দোলন নিয়ে বিভিন্ন বইয়ে উঠে এসেছে।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র হিসেবে হাসপাতালের জরুরী বিভাগে কর্মরত ছিলেন মুহাম্মদ মাহফুজ হোসেনের ভাষ্যমতে, “একুশে ফেব্রুয়ারি দুপুরে গুলিবিদ্ধ তিনজনকে হাসপাতালে গ্রহণ করি আমি। কপালে গুলিবিদ্ধ রফিককে দেখেই মৃত ঘোষণা করা হয়, আর উরুতে গুলিবিদ্ধ বরকত মারা যান রাতে, আমার চোখের সামনেই।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা তখন বাইরে থেকে বহু আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম। আমরা শুনেছিলাম বহু মানুষ গুলিতে আহত হয়েছে। মুহূর্তেই ইমারজেন্সি ওয়ার্ড পূর্ণ হয়ে যায়। আহতদের অনেকেই মুমূর্ষু, তাদের সঙ্গে আসা মানুষজন আর চিকিৎসকে ঠাসাঠাসি হয়ে যায় জরুরী বিভাগ।”
এ ঘটনার পরও দুই বছরের বেশি সময় পর, ১৯৫৪ সালের ৭ মে পাকিস্তান সংসদ বাংলাকে একটি রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকার করে প্রস্তাব গ্রহণ করে। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি কার্যকর হতে আরও দুই বছর সময় লেগেছিল। তবে ভাষা আন্দোলনের এ সফলতা পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রভাব ফেলে বিরাট ভূমিকা রাখে।



