Friday, June 26, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

দুই মাস ধরে ‌‘একঘরে’ বগুড়ার ট্রান্সজেন্ডার নারী হোচিমিনের পরিবার

হোচিমিনের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোয় আরও চার পরিবারকে একঘরে রাখা হয়েছে

আপডেট : ০৬ জুন ২০২২, ০৩:২০ পিএম

বগুড়ায় দুই মাস ধরে হোচিমিন ইসলাম নামে এক ট্রান্সজেন্ডার (রূপান্তরিত) নারীর পরিবারকে একঘরে করে রাখার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী পরিবারটির পাশে দাঁড়ানো কারণে আরও চার পরিবারকে একঘরে রেখেছে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল। গত মার্চের শেষে সম্পত্তির ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধের জেরে এ ঘটনার সূত্রপাত।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, হোচিমিন ইসলাম বগুড়া সদরের নিশিন্দারা ইউনিয়নের বারোপুর তালুকদারপাড়ায় মৃত নজরুল ইসলামের মেয়ে। তিনি ঢাকায় চাকরি করেন। বাড়িতে তার মা রেহেনা খাতুন ও বোন নিলুফা ইয়াসমিন থাকেন। নিলুফার স্বামী একজন বিজিবি সদস্য, তার বর্তমান কর্মস্থল চট্টগ্রাম। দুই সন্তান স্থানীয় স্কুলে পড়াশোনা করে।

২০২০ সালে স্বেচ্ছায় হোচিমিন ট্রান্সজেন্ডারে রূপান্তরিত হন। বিষয়টি জানাজানি হলে গ্রামবাসী তার পরিবারকে বিভিন্নভাবে হেনস্তা করতে শুরু করে।

হোচিমিন জানান, তিনি বগুড়া টিএমএসএস নার্সিং কলেজে লেখাপড়া করেছেন। বর্তমানে ঢাকায় একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তিনি ভারতে গিয়ে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে নারীতে রূপান্তরিত হন। কিছুদিন আগে চাচা রেজাউল করিম হোচিমিনের মায়ের কাছে দাবি করেন, তার দুই সন্তানই মেয়ে হওয়ায় তারা আইন অনুসারে ভাইয়ের অর্থাৎ হোচিমিনের বাবার সম্পত্তির ভাগ পাবেন। এ নিয়ে গ্রামের লোকজনের সঙ্গে তার বৈঠকও হয়েছে।

কিন্তু তার দাবি অনুযায়ী জমির ভাগ দিতে অস্বীকৃতি জানালে রেজাউল করিম হোচিমিনদের একঘরে করে রাখার পরিকল্পনা করেন। পাশাপাশি তাদের বিভিন্নভাবে হুমকি দিতে শুরু করেন। বাধ্য হয়ে তিনি (হোচিমিন) সদর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। গত ১৩ মার্চ থানায় তাদের ডেকে আপস করে দেওয়া হয়। 

তবে থানায় ডাকার বিষয়টি রেজাউল করিম ভালোভাবে নেননি। এ ঘটনায় তিনি হোচিমিনের পরিবারের ওপর ক্ষুব্ধ হন। 

গত শব-ই-বরাতের রাতে তিনি তার পক্ষের লোকজনকে বাড়িতে ডাকেন। সেখানে আলোচনা শেষে সিদ্ধান্ত হয় গ্রামের কেউ হোচিমিনের পরিবারের সঙ্গে মেলামেশা ও কথা বলতে পারবে না। ওই আলোচনায় হোচিমিনের চাচা রেজাউল করিম ছাড়াও নিশিন্দারা ইউনিয়নের সাবেক সদস্য আহসান হাবিব হারুন, রাহিজুল ইসলাম তালুকদার, খায়রুল ইসলাম, শাহীন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। হোচিমিন ঢাকা থেকে জরুরি সহায়তা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করলে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। তখন অভিযুক্তরা সরে পড়েন।

হোচিমিনের বোন নিলুফা ঢাকা ট্রিবিউনকে জানান, চাচার ষড়যন্ত্রে একঘরে হওয়ার পর থেকে তাদের পরিবারে অশান্তি দেখা দিয়েছে।

“যেসব প্রতিবেশী এ ষড়যন্ত্রে জড়িতে তারা আমাদের গালিগালাজ ও এ ঘটনায় হোচিমিনকে দোষারোপ করে। তারা আমাদের বাচ্চাদের সঙ্গে তাদের সন্তানদের মেলামেশা ও খেলতে দেয় না। পাড়ার দুটি দোকান তাদের কাছে কিছু বিক্রি করে না। বাধ্য হয়ে কেনাকাটার জন্য ৪-৫ কিলোমিটার দূরের ঘোড়াধাপ হাট বা শহরের বাজারে যেতে হয়।”

তিনি আরও বলেন, “মাতবরদের কথা অমান্য করে আতাউর রহমান, শাহজাহান আলী তালুকদার, লুৎফর রহমান, ইমরুল হোসেন ও তাদের পরিবার আমাদের সঙ্গে মেলামেশা করায় তাদেরও একঘরে করা হয়েছে। বর্তমানে মাতবররা হত্যার হুমকি দিচ্ছেন। আমরা পরিবার-পরিজন নিয়ে আতঙ্কিত। পুলিশের পরামর্শে আবারও থানায় জিডি করেছি। গত ১১ মে পুলিশ দুই পক্ষকে থানায় ডেকে আপস করে দেয়। কিন্তু এলাকায় ফিরে প্রভাবশালী মাতবররা আবার আগের মতো আচরণ করতে থাকেন।”

হোচিমিনদের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে মাতবরদের রোষানলে পড়া ইমরুল হোসেনের স্ত্রী নাদিয়া জানান, থানায় আপসের পরদিন তাদের বাড়ির পয়ঃনিষ্কাশনের সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আতাউর নামের বাড়ির বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও পরে ঠিক করা হয়েছে।

আরেক ভুক্তভোগী শাহজাহান আলী তালুকদারের অভিযোগ, “হোচিমিন নারীতে রূপান্তর হওয়াকে কেন্দ্র করে এসব সমস্যা হয়েছে। ওই পরিবারকে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়। আর এসবের মূলহোতা হলেন হোচিমিনের চাচা রেজাউল করিম। পরবর্তীতে রেজাউল কিছুটা থামলেও হারুন, রাহিজুল, খায়রুলরা ওদের হুমকি-ধামকি দিতে থাকেন।”

হোচিমিনের প্রতিবেশি শাহজাহান আলী জানান, ওই পরিবারের পক্ষে কথা বলায় তাকে একঘরে করা হয়েছে। দোকানে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিষপত্র বেচা-কেনায় নিষেধ করা হয়েছে।

তবে লিটন নামের স্থানীয় এক দোকানির দাবি, “হোচিমিনরা তার দোকান থেকে কিছু কেনেন না। আকিকার মাংস দেওয়া হলেও হোচিমিনের মা রেহেনা খাতুন তা নেননি।”

হোচিমিনের বাল্যবন্ধু চুমকি আকতার জানান, “গ্রামের মাতবররা হোচিমিনকে ‘হিজড়া’ বলে হেয় করে। তাদের বাড়িকে হিজড়ার বাড়ি বলে গালিগালাজ করে।”

এসব অভিযোগের বিষয়ে হোচিমিনের চাচা রেজাউল করিম জানান, “গ্রামে বিচার না চেয়ে তারা (হোচিমিন) তাকে থানায় নিয়ে যায়। এ জন্য তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শরিক হিসেবে জমির ভাগ চেয়েছি। পরবর্তীতে কোনো সমস্যা না করার মর্মে থানায় মুচলেকা দেওয়া হয়েছে।”

এ প্রসঙ্গে বগুড়ার পুলিশ সুপার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “হোচিমিনের বিষয়টি পুলিশ অবগত। এর আগে তাদের আইনি সহায়তা দেওয়া হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে কোনো সমস্যা হলে পুলিশ সেখানে সহযোগিতা করবে।”

   

About

Popular Links

x