বগুড়ার সারিয়াকান্দির হাটশেরপুর ইউনিয়নে যমুনা নদীর ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। গত ১০ দিনে ১৯৫ পরিবারের বসতভিটে যমুনায় বিলীন হয়েছে। এলাকাবাসীরা ভিটেমাটি হারিয়ে নতুন জেগে ওঠা চর বা নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাচ্ছেন।
এদিকে ভাঙন এলাকায় দ্রুত কাজ শুরু হবে কিনা সে ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ড নিশ্চিত করে বলতে পারেনি। তবে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা প্রশাসন ভাঙন মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সারিয়াকান্দি উপজেলার হাটশেরপুর ইউনিয়নের চকরথিনাথ, ধনারপাড়া, করনজাপাড়া, শেরপুর, শিমুলবাড়ী, নয়াপাড়া, কর্ণিবাড়ী, দুব্বাগাড়ী এবং চালুয়াবাড়ী ইউনিয়নের সুজালিরপাড়া গ্রামে গত ২০১৫ সাল থেকেই যমুনা নদীর ভাঙন চলছে।
হাটশেরপুর ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে এ ইউনিয়নের উল্লিখিত গ্রামগুলোর প্রায় ২,০০০ পরিবার যমুনা নদী ভাঙনের শিকার হয়েছে। একইসঙ্গে হাজার হাজার হেক্টর কৃষি জমি যমুনায় বিলীন হয়েছে।
এ বিষয়ে প্রতিবছর বিভিন্ন দৈনিকে সচিত্র সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু গত কয়েক বছরেও এখানে যমুনা নদীর ভাঙনরোধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে এসব গ্রামের মানুষরা বারবার ভাঙনের শিকার হয়ে বিভিন্ন এলাকায় বসতি স্থাপন করছেন।
সর্বশেষ গত ১০ দিন আগে হাটশেরপুর ইউনিয়নের চকরথিনাথ এবং শেরপুর গ্রামে যমুনা নদীর ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করে। ফলে এ গ্রামের মানুষরা দিশেহারা হয়ে তাদের বাড়িঘর ভেঙে নিয়ে যাচ্ছেন। কেউ যমুনার জেগে ওঠা নতুন চরাঞ্চলে নতুন করে বসতি স্থাপন করছেন। কেউবা একেবারেই এলাকাছাড়া হচ্ছেন।
গত কয়েকদিনের নদী ভাঙনে এসব গ্রামের দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভাঙনের শিকার হয়েছে। এ গ্রামের একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চকরথিনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টিও ভাঙনের শিকার হয়েছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ ক্রসবাঁধে বিদ্যালয়টির পাঠদান কোনোরকমে চালু রাখা হয়েছে।
গ্রামটি সরেজমিন পরিদর্শন করলে দেখা যায়, সেখানে চলছে বাড়িঘর ভাঙার আয়োজন। কেউবা যত্ন করে গড়ে তোলা বড় বড় গাছ কাটছেন, কেউবা নিজের ঘরের খুঁটি তুলছেন, কেউবা টিনের বেড়া টানতে ব্যস্ত রয়েছেন। কেউবা একত্রে দলবেঁধে ঘরের চালা নৌকায় তুলছেন। গ্রামের গৃহবধূরা এসব কাজে সহযোগিতা করছেন। কেউবা নিজের চুলোয় এ বাড়ির শেষ রান্না করছেন। কারণ এ চুলাতে আর তার রান্না করা হবে না। এ বাড়ির উঠানেও আর তার দৌড়াদৌড়ি করতে হবে না। এভাবে ভাঙন চলতে থাকায় এ গ্রামের চারটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বেশকিছু মসজিদ ও বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানসহ প্রায় ৩০০ এর বেশি পরিবারের বসতভিটে, কয়েক হাজার বিঘা ফসলি জমি ভাঙন হুমকিতে রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে চকরথিনাথ গ্রামের আব্দুল জলিল শেখ জানান, চকরথিনাথ চরেই চারবার নদী ভাঙনের শিকার হয়েছেন। গত সাত বছর আগে এই চকরথিনাথ গ্রামের একেবারে শেষ সীমানায় শেরপুরে বাড়ি করেছিলেন। গত সাত বছরে তার বসতভিটায় বেশ বড়বড় গাছপালা হয়েছিল। বিদ্যুৎ সুবিধাও পেয়েছিলেন। কিন্তু যমুনা নদীর ভাঙনে এখানে আর থাকতে পারলেন না। বাড়িঘর ভেঙে নতুন জেগে ওঠা চরের ধূধূ বালুচরে আবার নতুন করে বসতভিটে গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন।
তিনি দুঃখ প্রকাশ করে জানান, সরকার এতো জায়গায় নদী ভাঙনরোধে কাজ করে কিন্তু তাদের হাটশেরপুর ইউনিয়নে কেন কাজ করে না, তা তাদের বোধগম্য নয়।
হাটশেরপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নূর মো. মেহেদী হাসান আলো জানান, গত সাতদিন আগে নদী ভাঙনের শিকার ১৪০টি পরিবারের তালিকা করেছেন। এ তালিকা বাড়ছে। গত বুধবার পর্যন্ত ১৯৫টি পরিবার নদী ভাঙনের শিকার হয়ে তাদের বসতভিটা হারিয়েছেন। তারা বাড়িঘর অন্যত্র স্থানান্তর করেছেন। তিনি যমুনা নদীর ভাঙনরোধে দ্রুত কাজ শুরু করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এলাকাবাসীর পক্ষে জোর দাবি জানিয়েছেন।
এ ব্যাপারে বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। তারা বলছেন, গ্রামগুলো বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়ি বাঁধের বাহিরে থাকায় বার বার প্রকল্প প্রস্তাব প্রেরণ করেও সুরাহা পাওয়া যাচ্ছে না।
সারিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সুমাইয়া ফেরদৌস জানান, ইতিমধ্যেই ভাঙন কবলিত এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন। ভাঙন কবলিত এলাকার প্রতিবেদন বগুড়া জেলা প্রশাসক এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, দ্রুত ভাঙন মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
বগুড়া-১ (সারিয়াকান্দি-সোনাতলা) আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য কাজী রফিকুল ইসলাম বলেন, “হাটশেরপুর ইউনিয়নের যমুনা নদী ভাঙন মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার দেওয়া হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, খুব দ্রুত সেখানে ভাঙন মোকাবিলায় কাজ শুরু করা হবে। ভাঙনের শিকার এলাকাবাসীর খোঁজখবর এবং তাদের সহায়তা প্রদান অব্যাহত রাখা হয়েছে।”



