নদীমাতৃক বাংলাদেশে জলাশয়ের অভাব নেই। কবে, কোথায় জলের মোকাবিলা হবে সে প্রশ্নের উত্তর মেলা ভার। ইচ্ছা কিংবা অনিচ্ছা যেভাবেই হোক, পানিতে ভেসে থাকার সর্বোত্তম পন্থা সাঁতার।
দুর্ঘটনাক্রমে পানিতে পড়ে গেলে সাঁতার জানা থাকলে জীবনরক্ষার সম্ভাবনা বেড়ে যায় বলে মনে করেনরাজধানীর সুলতানা কামাল মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্সের প্রশিক্ষক সাবিনা ইয়াসমিন।
২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের মে পর্যন্ত তথ্য দেশে পানিতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৩,৫৩৩ জনের। তাদের মধ্যে ৩,০৯৯ জনই (৮৭.৭১%) ছিল শিশু।
নদীমাতৃক দেশের রাজধানীসহ বড় শহরগুলো ইট-পাথরে ঘেরা। চারিদিকে ঘেঁষাঘেঁষি করে উঁচু দালানকোঠা। শহরে বড় জলাধার এখন বিলুপ্তপ্রায়। এ অবস্থায় বেশিরভাগ শহুরে শিশুকে সাঁতার শিখতে হচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে।
এই প্রশিক্ষণ তাদের ব্যবহারিক জীবনে কতটা ফলপ্রসূ কিংবা এর প্রয়োগ কোথায়?
সুলতানা কামাল মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্সের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ফিরোজা করিম নীলির মতে, “সাঁতার জীবনের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা। এটি শিশুদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের প্রতিষ্ঠান সাঁতার শেখানোর প্রতি যথেষ্ট যত্নশীল। অনেক মানুষ এখানে সাঁতার শিখতে আসে। আমাদের প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২০ ধরনের খেলাধুলার মধ্যে সাঁতার বেশি জনপ্রিয়।”
বিশেষজ্ঞরা বলেন, সাঁতার সব বয়সী মানুষের জন্য একটি ভালো বিনোদনও বটে। শরীরের বাড়তি ওজন কমানো, হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুসের সঠিক কার্যকারিতার জন্য সাঁতারের জুড়ি নেই। এছাড়া মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ সাঁতার।
আশার কথা হলো, শহরের অনেক শিশুই এখন অতিরিক্ত পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে সাঁতার শিখছে।
তাদেরই একজন তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ফারজাদ। তার কথায়, “আমি এখানে সপ্তাহে পাঁচ দিন সাঁতার শিখি। স্কুলে এখন গ্রীষ্মকালীন ছুটি চলছে। এখন সাঁতার শিখতে এসে আমার খুব ভালো লাগছে। আমি ভালোভাবে শিখতে চাই।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একই শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থীর ভাষ্য, “আমি এক মাস ধরে এখানে সাঁতার শিখি। আমাদের খুব যত্ন করে সাঁতার শেখানো হয়। ”
পানিতে ভেসে থাকতে ভালোবাসে আনিয়ারও
নওশিন ফারহানা নামে এক অভিভাবক বলেন, “আমার বাচ্চাদের জন্য এটি একটি নিরাপদ জায়গা। খুব যত্নে এবং তুলনামূলক কম খরচে এখানে সাঁতার শেখা যায়। আমি নিজেও একসময় এখানে সাঁতার শিখতাম। জীবনের জন্য এটি একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি দক্ষতা। সাঁতার জানা থাকলে আমার বাচ্চাদের পানির প্রতি ভয়টা থাকবে না। এটি প্রত্যেক শিশুর জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।”
সুলতানা কামাল মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষ প্রতি বছর সাঁতার টুর্নামেন্টের আয়োজন করে থাকে। তবে সামনে এগিয়ে যেতে তারা চান আরও একটু পৃষ্ঠপোষকতা। বাৎসরিক টুর্নামেন্টের জন্য বাজেট বাড়ানো গেলে কার্যক্রম আরও বেগবান হবে বলে মনে করেন প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ফিরোজা করিম নীলি।
রাজধানীর সুলতানা কামাল মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্সে সাঁতার শিখছে শিশুরা// ঢাকা ট্রিবিউনতিনি বলেন, “প্রতিটি খেলোয়াড়ের পেছনে আরও বেশি সময় দিতে হবে আমাদের। বিশেষ করে যারা নিবেদিতপ্রাণ। আর এই বিষয়টি একদম ছোট বয়সে শিশু থেকে শুরু করতে হয়। তাই শিশুদের সাঁতারের প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার যথেষ্ট চেষ্টা করি। আমাদের দুইটি ব্যাচে সাঁতার শেখানো হয়। প্রতি ব্যাচেই বাচ্চারা আগ্রহের সাথে সাঁতার শেখে।”
সুলতানা কামাল ক্রীড়া কমপ্লেক্সের বাৎসরিক টুর্নামেন্টে অংশ নিতে পারেন অন্য প্রতিষ্ঠানে নিবন্ধিত খেলোয়াড়রাও।
প্রতিষ্ঠানটির প্রশিক্ষক সাবিনা বলেন, “আমাদের এখানে ঢাকা এবং ঢাকার বাইরের মানুষও সাঁতার শিখতে আসে। আর এ প্রতিষ্ঠানটি মেয়ে শিশুদের জন্য অত্যন্ত নিরাপদ। একবার শিশুরা এখানে সাঁতার শিখে গেলে তারা বেশ আগ্রহ নিয়ে সাঁতার শেখে।”
সাঁতার শিখতে মাসে চার হাজার টাকার মতো খরচ হয় একজন শিক্ষার্থীর। এ টাকার পরিমাণ কমিয়ে আনার পাশাপাশি স্বল্পকালীন ফ্রি সাঁতার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে চান ফিরোজা করিম নীলি।
তিনি মনে করেন, সাঁতার শেখা সবার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। তাই টাকার পরিমাণ কমিয়ে কিংবা বিনামূল্যের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানুষের মাঝে আগ্রহ এবং সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।



