Wednesday, July 22, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

শিশুর দেরিতে কথা বলা: অভিভাবকদের কপালে চিন্তার নতুন ভাঁজ

বিষয়টি বাবা-মায়ের জন্য হতাশার। তবে আশার কথা হলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এ সমস্যার সমাধান সম্ভব

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২৩, ০৪:৫৯ এএম

সন্তানের মুখের প্রথম বোল শুনতে বাবা-মায়ের থাকে অধীর আগ্রহ। তবে আজকাল অভিভাবকদের কপালে যুক্ত হয়েছে নতুন এক চিন্তার ভাঁজ। একদমই কথা বলতে অনাগ্রহী ছোট্ট সন্তান। বাকি সবকিছুই হয়ত ঠিকঠাক, কিন্তু যার আধো আধো বোল শোনার অপেক্ষা, তার মুখে রা নেই!

চিকিৎসকরা জানান, বর্তমানে ৪% শিশু তিন বছরের বেশি বয়সেও কথা বলতে শিখছে না। কেউ কেউ হয়ত দু-একটি শব্দ বলছে, কিন্তু সম্পূর্ণ বাক্য উচ্চারণ করতে পারে না।

বিষয়টি বাবা-মায়ের জন্য হতাশার। তবে আশার কথা হলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এ সমস্যার সমাধান সম্ভব। দেশে এখন শিশুর দেরিতে কথা বলা সমস্যার অনেক আধুনিক সমাধান রয়েছে, স্পিচ থেরাপি তার মধ্যে অন্যতম।

দেরিতে কথা বলা বা স্পিচ ডিলের অভিজ্ঞতা হয়েছে এমন কয়েকজন শিশুর অভিভাবকরা ঢাকা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন তাদের কথা।

এমনই এক শিশু তিন বছর বয়সী প্লাবন। এখন পর্যন্ত সে কথা বলা শেখেনি।  স্বজনদের আশা, শিশুটি শিগগিরই কথা বলা শিখবে। কর্মজীবী মা-বাবা ব্যস্ততার কারণে বিষয়টি প্রথমে ততটা গুরুত্ব দিতে পারেননি। প্লাবনের সময় কাটে মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে। দিন-রাত ভিডিও দেখাই তার বড় বিনোদন।

একটু দেরিতে হলেও বিষয়টি নজরে এলে অভিভাবকরা শিশুটিকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। চিকিৎসকরা স্পিচ থেরাপির পরামর্শ দেন। আনন্দের বিষয় হলো, দুটি সেশনের পরেই প্লাবন কথা বলা শুরু করেছে।

স্বর্ণার বয়স আড়াই বছর। দুরন্ত ছটফটে মেয়ে। অথচ তার দুশ্চিন্তায় এক সময় বাবা-মায়ের ঘুম উবে গিয়েছিল। শিশুটি জন্মের পর থেকেই বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। সামান্য কারণেই অসুস্থ হয়ে পড়ত। স্বর্ণা হাঁটতে শেখে দুই বছর বয়সে। কিন্তু মুখে কথা ফোটেনি তখন পর্যন্ত। স্পিচ থেরাপি নেওয়ার পর এখন পাকা পাকা কথায় সে মাতিয়ে রাখে সারা ঘর।

নির্দিষ্ট সময়ের পরও বাচ্চার মুখে বুলি না ফোটার সমস্যা এখন ঘরে ঘরে। সাধারণত একটি শিশু দু'বছর বয়সে ২৫০–৩০০ শব্দ উচ্চারণে সক্ষম হয়। ব্যতিক্রম অর্থাৎ কথা বলতে দেরি হলে দ্রুত থেরাপিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত বলে অভিমত চিকিৎসকদের।

যা বলছেন চিকিৎসকরা

এ বিষয়ে কথা হয় বিআরবি হাসপাতালের মানসিক রোগ বিভাগের কনসালটেন্ট সাইকোলজিস্ট তন্নিতা ঘোষের সঙ্গে।

তিনি বলেন, “একটি বাচ্চার জন্মের পর আমরা যেমন তার মানসিক বিকাশ নিয়ে চিন্তা করি তেমনি তার কথা বলার বিষয়টিও লক্ষ্য করতে হবে। প্রথমত খেয়াল করতে হবে শিশু জন্মের ৬-৮ মাস বয়সে মুখ দিয়ে বাবলিং করছে কি-না। অর্থাৎ সে তার মুখ নাড়িয়ে ছোট ছোট শব্দ বলার চেষ্টা করছে কি-না। বাচ্চারা সাধারণত ৮-১২ মাস বয়সে কথা বলার চেষ্টা করে। সেটা হতে পারে খুব সামান্য যেমন ‘আ', ‘তা', ‘বা', ‘মা' এমন। লক্ষ্য রাখতে হবে সে এই শব্দগুলো বলতে পারছে বা বলার চেষ্টা করছে কি-না।”

‘‘দুই বছর বয়স থেকেই শিশুর পুরোপুরি কথা বলা বা একটি শব্দের সঙ্গে আরেকটি যোগ করে বলা শুরু হয়। এই বয়সের মধ্যে শিশুর এমন স্পিচ ডেভলপমেন্ট না হলে সতর্ক হতে হবে এবং দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। স্পিচ ডিলে বিষয়টা মূলত তিন বছর বয়স থেকে ধরা হয়।”

এই চিকিৎসক আরও বলেন, “শিশুর দেরিতে কথা বলা নিয়ে অনেক সময় বাবা-মা খেয়াল করেন না বা বুঝতে পারেন না। দেরিতে কথা বলার অন্যতম প্রধান কারণ হলো বায়োলজিক্যাল কিছু ফ্যাক্ট। শিশুর ডেভেলপমেন্টাল মাইলস্টোন ডিলের কারণে এটি হতে পারে। বাচ্চারা দেরিতে কাঁদলে কিংবা হামাগুড়ি দিলেও স্পিচ ডিলে হয়। এছাড়া মস্তিষ্কে জন্মগত কোনো ত্রুটি অথবা প্রসবকালীন জটিলতা থেকেও শিশুর স্পিচ ডিলে হতে পারে।”

এ বিষয়ে কথা হয় সিটি হাসপাতালের স্পিচ থেরাপি স্পেশালিস্ট ডা. হাসিবা হাসান জয়ার সঙ্গে।

তিনি বলেন, ‘‘কোভিডের সময় গর্ভবতী নারীরা চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটিয়েছেন। যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিশুমনে। সাধারণত শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর আত্মীয়-স্বজনরা বাড়িতে আসেন। স্বাভাবিক কথোপকথন হয়ে থাকে, কোভিডের সময় সেই পরিস্থিতি প্রায় ছিল না। শিশুরা ভূমিষ্ঠ হয়েই ঘরে আবদ্ধ হয়ে গেল, আর মা-বাবারা চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে ছিলেন। অনেকক্ষেত্রে কর্পোরেট সংস্থার ওয়ার্ক ফ্রম হোম চালু থাকায় অনেক বাবা-মা'ই সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেননি, এ বিষয়গুলো সরাসরি প্রভাবিত করেছে শিশুদের। ফলে অনেক শিশুই এখন সঠিক সময়ে কথা বলতে পারছে না, সেই সঙ্গে তাদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার ছন্দও ব্যাহত হচ্ছে। তাদের মধ্যে আচরণগত বেশ কিছু সমস্যা দেখা দিচ্ছে।''

তিনি আরও বলেন, ‘‘আড়াই-তিন বছর আমরা কোভিডের সঙ্গে লড়েছি। ফলে যে সকল শিশুর বর্তমান বয়স এখন আড়াই-থেকে তিন বছর তাদের মধ্যেই এই ধরনের সমস্যা বেশি দেখা দিচ্ছে। এর আরও একটা কারণ হলো বাচ্চারা সাধারণভাবে বড় স্কুলে ভর্তির আগে প্রি-স্কুলে খেলার ছলে শিক্ষার একটা পাঠ নিয়ে থাকে। কোভিডের জন্য প্রি-স্কুলগুলো বন্ধ থাকায় বাচ্চাদের মধ্যে খেলার ছলে শেখা, মেশার ক্ষমতা অনেকটাই কমে গিয়েছে।''

এই চিকিৎসক জানান, কানে শোনার অসুবিধা থাকলে শিশুরা দেরিতে কথা বলতে শেখে। এই সমস্যাকে বলা হয় ‘‘হিয়ারিং ইমপ্যাক্ট''। এক্ষেত্রে আগে বাচ্চাদের শব্দ বোঝানো হয়। একে বলা হয় ‘‘অডিটরি ট্রেনিং''। তারপর আস্তে আস্তে শুরু হয় স্পিচ থেরাপি।

এক্ষেত্রে চিকিৎসকদের বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।

স্পিচ থেরাপি কী

স্পিচ থেরাপি হচ্ছে বিশেষ এক ধরনের চিকিৎসা ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে কথা বলতে অক্ষম অথবা স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারে না এমন রোগীদের চিকিৎসা করা হয়। তোতলানো, দেরিতে কথা বলা, কানে কম শোনার কারণে কথা বলার সমস্যা ইত্যাদি নানা কারণে যারা স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারে না, তাদের স্বাভাবিক ছন্দে প্রাণখুলে কথা বলার সুযোগ এনে দিয়েছে স্পিচ থেরাপি।

স্পিচ থেরাপি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ডা. হাসিবা জানান, এটি মূলত বাচ্চাদের সঙ্গে কথা বলা, তাদের সময় দেওয়া, পছন্দের কাজগুলো করা। খেলার ছলে তাদের শব্দ শেখানো হয়, চেনানো হয়। বিভিন্ন অ্যাক্টিভিটি যেমন, যে শব্দটা শুনে বা বলে বাচ্চারা বেশি আনন্দ পাচ্ছে সেটি বারবার বলা এবং তার সঙ্গে অন্য আরেকটি শব্দ কীভাবে যোগ করা যায় তা শেখানো।

“বাবা-মায়ের সঙ্গেও আমরা কথা বলি। বাচ্চা এবং মা দুইজনকে একসঙ্গে কাজ করানো হয়। কিছু বাচ্চারা খুব দ্রুত কথা বলতে শিখে যায়, কারো কারো আবার অনেক সময় পরেও কথা বলতে খুব কষ্ট হয়।”

চিকিৎসকদের মতে, কর্পোরেট কালচার এবং গ্যাজেটের মাত্রাধিক ব্যবহারের কারণেও শিশুদের মধ্যে দেরিতে কথা বলার প্রবণতা বাড়ছে। শিশুদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া, তাদের সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণ বজায় রাখা বাবা-মায়ের কর্তব্য।

আবার যেসব বাড়ির সদস্যরা একাধিক ভাষায় কথা বলেন সেখানে শিশুদের কথা বলতে বা শিখতে দেরি হয়।

ডা. হাসিবার পরামর্শ, “শিশুদের দেরিতে কথা বলার আরেকটি কারণ অটিস্টিক স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার। শিশু যদি এক বছরের মধ্যে নিজের নাম শুনে না তাকায়, মিশতে না পারে, মুখ বা অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করতে না পারে তাহলে সেই শিশুটি অটিস্টিক স্পেক্ট্রামের শিকার কি-না তা জানতে অবিলম্বে বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া উচিত।”

   

About

Popular Links

x