Wednesday, July 22, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ডেঙ্গু কাড়ছে শিশুদের প্রাণ

এ বছর ৮ জুন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ৬২ জনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। পাওয়া গেছে ১০,৪৫৫ জন আক্রান্ত হওয়ার তথ্য

আপডেট : ১০ জুলাই ২০২৩, ০৩:১৩ পিএম

ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১১ বছর বয়সী শ্রাবন্তী গত ৪ জুলাই পাড়ি জমায় না ফেরার দেশে। মাত্র ছয় দিন জ্বরে ভুগে নিভে যায় তার জীবন প্রদীপ। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে তার বড় ভাই শৌভিক এখন চিকিৎসাধীন। এক সন্তানের এভাবে চলে যাওয়া কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না মা বিটু সরকার।

একইভাবে, ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ৩ জুলাই রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী ইলমা জাহান, ৬ জুলাই ইউনিভার্সেল হাসপাতালে আহনাফ রাফানের (৮) মৃত্যু হয়। আহনাফকে প্রথমে ঢাকা শিশু হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। তবে সেবার মানে অসন্তুষ্ট স্বজনরা পরে তাকে স্থানান্তর করেন।

এ বছর ৮ জুন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ৬২ জনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। পাওয়া গেছে ১০,৪৫৫ জন আক্রান্ত হওয়ার তথ্য। এর আগে কোনো বছরের জুলাইয়ের শুরুতেই ডেঙ্গুর এমন ভয়াবহ রূপ দেখেনি দেশ। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানিয়েছে, দেশের সবগুলো জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গু।

ডেঙ্গুর সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রাজধানী ঢাকা। হাসপাতালগুলোতে ক্রমবর্ধমান রোগীর সংখ্যা অন্তত সে কথাই বলে।

মুগদা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কয়েকজন রোগীর সঙ্গে কথা হয় ঢাকা ট্রিবিউনের।

তাদেরই একজন ৬ বছর বয়সী সাব্বির। তার হাতে ক্যানোলা। পাশে বসা মায়ের কোলে সাব্বিরের এক মাস বয়সী বোন। গত ১ জুলাই প্রচণ্ড জ্বর এলে তাকে হাসপাতালে আনা হয়। পরীক্ষা করে চিকিৎসকরা জানান সাব্বির ডেঙ্গু আক্রান্ত।

প্রসূতি মর্জিনা এক মাসেরও বেশি সময় ধরে ঢাকায়। এসেছিলেন ঢাকার হাসপাতালে প্রসবকালীন সেবা নিতে। সুস্থভাবে মেয়ের জন্ম দেন তিনি। কিন্তু ফিরে যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে তখনই জ্বরে আক্রান্ত হয় ছেলে। একদিকে ডেঙ্গু আক্রান্ত ছেলের শুশ্রুষা অন্যদিকে নবজাতকের পরিচর্যা, ভীষণ কঠিন সময় যাচ্ছে ময়মনসিংহের এই নারীর।

সাব্বিরের ভাষ্য, “খাওয়া-দাওয়া করতে একদম মন চায় না। জ্বরের কারণে কিছুই ভালো লাগছে না।”

আয়েশা আক্তার (ছদ্মনাম) বলেন, “আমার ছেলের বয়স ১ মাস। অনেক জ্বর আসায় ডেঙ্গু পরীক্ষা করাই। ডেঙ্গু ধরা পড়লে হাসপাতালে ভর্তি করি। বাচ্চা মানুষ কষ্ট হলেও বলতে পারে না।”

বাড়িতে মশা থেকে বাঁচতে সাবধান থাকেন কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমরা মশারি টাঙাই। তবে বেশি গরম পড়লে টাঙানো হয় না। গরমে অনেক কষ্ট হয়ে যায়। আমাদের বাড়িতে বেশ মশা।”

আসমা আহমেদ নামে আরেকজন মা গোপীবাগ থেকে এসেছেন ডেঙ্গু আক্রান্ত মেয়েকে নিয়ে। তিনি বলেন, “আমাদের পাশের বাড়ি থেকে ময়লা পানি ফেলে। সেই পানি জমে থাকে। পরিষ্কার করতে বললেও তারা পরোয়া করে না। এ কারণে আমাদের এলাকায় প্রচুর মানুষের ডেঙ্গু হয়েছে।”

মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ডেঙ্গু ওয়ার্ডের চিকিৎসক নাসিফ আনোয়ার বলেন, “এখন বর্ষাকাল, ডেঙ্গুর মৌসুম। পরিস্থিতি ধীরে ধীরে খারাপের দিকে যাচ্ছে। ঘণ্টায় ঘণ্টায় নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে। মৃতের সংখ্যা তেমন উল্লেখযোগ্য না। তবে সব মৃত্যুই আমাদের কাছে অনাকাঙ্ক্ষিত।”

চিকিৎসক হিসেবে বলতে চাই, “আজকাল ডেঙ্গুর মূল লক্ষণ হঠাৎ রক্তচাপ কমে যাওয়া। সেই সঙ্গে শরীরে বিভিন্ন অংশ যেমন মাড়ি কিংবা প্রস্রাব- পায়খানার সঙ্গে রক্ত যাচ্ছে। আর জ্বরও হচ্ছে।”

তাই এসব লক্ষণ দেখা দিলেই সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার জন্য বলেন ডা. নাসিফ।

শিশুদের বিষয়ে তিনি বলেন, “সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো শিশুরা নিজেদের সমস্যা খুলে বলতে পারে না। তাই তাদের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। এছাড়া ডেঙ্গু হলে স্বাভাবিক খাবার দিতে হবে। গরম বলে মশারি টানানো নিয়ে মোটেই অবহেলা করা যাবে না। এছাড়া বাড়ি ও চারপাশ পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।”

এ বিষয়ে ডক্টরি ডিজিটাল হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. আনোয়ারা খাতুন বলেন, “বর্তমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়ানক। শিশুদের মাঝে এর প্রকটতা অনেক বেশি। ডেঙ্গু হলে শরীরের প্লাটিলেটের (অনুচক্রিকা) পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে নেমে যায়। যা খুবই বিপদজনক হতে পারে। শিশুদের শরীরে দেড় থেকে চার লাখ প্লাটিলেট থাকে। এর নিচে নেমে গেলে তা বিপদজ্জনক।”

তিনি বলেন, “ডেঙ্গুতে শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে রক্ত বের হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। তখন ফ্রেশ ফ্রোজেন প্লাজমা থেকে প্লাটিলেট দেওয়া গেলে ভালো। তবে এটি বেশ ব্যয়বহুল।”

এই চিকিৎসক জানান, ডেঙ্গুতে শিশু মৃত্যুর মূল কারণ প্লাজমা লিকেজের কারণে রক্তের ঘনত্ব কমে যাওয়া।

ডা. আনোয়ারা বলেন, “ডেঙ্গু প্রথমবারের চেয়ে দ্বিতীয়বার হওয়া বেশি ক্ষতিকর। কারণ দ্বিতীয়বারে ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বর কিংবা ডেঙ্গু শক সিনড্রোম এগুলো হয় যা বেশ মারাত্মক।”

ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুরা বাড়ির যত্নে সুস্থ না-ও হতে পারে। এ বিষয়ে এই চিকিৎসকের পরামর্শ, “বাড়িতে সুস্থ না হলে এবং শরীরে ফোঁটা ফোঁটা ব্লিডিং স্পট দেখা দিলে সাথে সাথে শিশুকে হাসপাতালে নিতে হবে।”

তবে প্রতিকার থেকে প্রতিরোধ ভালো উল্লেখ করে ডা. আনোয়ারা বলেন, “এডিস মশা যেন ডিম না পারতে পারে, এর জন্য বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। প্রতিদিন মশারি টাঙাতে হবে এবং সবসময় সচেতন থাকতে হবে।”

   

About

Popular Links

x