Monday, May 27, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

মাছ না খেতে পারলেও কাটতে শিখছে তারা

এত মাছ কাটে তারা, তবে খাওয়ার সৌভাগ্য তেমন হয় না

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২৩, ০৪:১০ পিএম

মাঝে মাঝে ঝক ঝক শব্দে চলে যায় ট্রেন। রেললাইনের দুপাশে লম্বা করে সারি করে মাছ কাটতে বসেছেন একদল মানুষ। ক্রেতারা পাশের কাওরান বাজার থেকে রুই, পাবদা, কাতলা, মাগুর, শিং ইত্যাদি মাছ কিনে তাদের কাছে নিয়ে আসছেন কাটার জন্য।

মাছ কাটায় দক্ষ হাতগুলোর মাঝে দেখা মিলল ছোট ছোট কয়েক জোড়া হাতের। কারও বয়স দশ, কারও বা এগার-বারো। তাদের মধ্যে কেউ কেউ স্কুলে কিংবা মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। বাবা-মায়ের সঙ্গে তারাও মাছ কাটায় মহাব্যস্ত, কথা বলার ফুসরৎ নেই।

এমন অনেক ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গল্প খুঁজে পাওয়া গেল ঢাকার কাওরান বাজার সংলগ্ন রেললাইনের দুইপাশে মাছ কাটতে বসা মানুষের ভিড়ে।

হাফপ্যান্ট আর গেঞ্জি পরে মাছের আঁশ তোলার ছোট গ্রেডার নিয়ে চুপচাপ জ্যান্ত কইয়ের আঁশ ছাড়াচ্ছে রিয়া মনি। সারা গা আর মাথায় ভর্তি মাছের আঁশ। পাশে গিয়ে বসতেই জিজ্ঞেস করল, “আপা মাছ কাটাবেন না?”

বড় মাছ এখনও কাটা শেখেনি তার ছোট হাত। তবে আঁশ ছাড়াতে রিয়ার হাত পাকা।

দশ বছর বয়সী রিয়া একসময় স্কুল যেত। ছোট বয়সেই ঢাকায় আসা তার। সে জানায়, মাছ কাটার কাজ সে অনেক আগে থেকেই করে। তার মা'ও এখানেই মাছ কাটার কাজ করেন। তবে এখান থেকে কাজ করছেন একটু দূরে।

কাওরান বাজার সংলগ্ন রেললাইনের পাশে মাছ কাটছে শিশুরা

“অনেক আগে থেকেই এই কাজ করি। পাবদা, কইয়ের মতো মাছগুলোর আঁশ ছাড়াতে পারি। এখানে প্রতিদিন সকাল সকাল চলে আসি আর মাগরিবের আজানের সময় বাসায় যাই। প্রথম প্রথম হাত কেটে যেত কিন্তু এখন তেমন একটা কাটে না।”

একটু পা বাড়াতেই দেখা হয় নারগিস নামে এক নারীর সঙ্গে। রেললাইনের পাশে বসে আছে তার দুই সন্তান ইয়ামিন আর খুকু মনি। রোদের প্রখর তাপে ঘামছে তাদের গা, তবুও কাজ থেমে নেই তাদের। হঠাৎ ট্রেন আসার প্রচণ্ড শব্দে মা নারগিস বলে উঠলেন, “সর সর বাবু ট্রেন আসতেছে।”

মায়ের হুঁশিয়ারি শুনে খুকু আর ইয়ামিন উঠে ক্ষণিকের জন্য দাঁড়ায়। ট্রেন চলে গেলে ফের মাছ কাটায় মগ্ন হয়ে পড়ে ভাই-বোন।

নারগিস ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “ট্রেন এলে একটু ভয় লাগে। বাচ্চা নিয়ে অনেক সাবধানে থাকতে হয়। কী আর করার, পেট চালাতে হলে কাজ তো আর বাদ দেওয়া যাবে না।”

ট্রেন এলে ভয় লাগে কি-না জানতে চাইলে খুকু মনি বলে, “আমার তেমন ভয় করে না ট্রেন দেখে।”

খুকু মনির বয়স দশ আর ইয়ামিনের নয়। তাদের মা নারগিস বলেন, “দেখে মনে হয় আমার ছেলে বড়। তবে না মেয়েটাই বড়। পুষ্টি নাই শরীরে একদম।”

জীর্ণশীর্ণ খুকু মনি বলে, “আমি মাছের আঁশটা ছাড়াতে পারি তবে কাটতে এখনও শিখি নাই। শিখে যাব।”

এত মাছ কাটেন তারা, তবে খাওয়ার সৌভাগ্য তেমন হয় না। মাসে কয়দিন মাছ খাওয়া হয় জানতে চাইলে নারগিস বলেন, “মাছ খাইতেই পারি না, আবার মাসে কয়বার? কপালে থাকলে মাসে একবার হয়ত খাওয়া হয়। সংসার চালানো বেশ কষ্টের। ওদের বাবা কাজ করতে পারে না। তাই আমাকেই সংসার চালাতে হয়। অভাব না থাকলে বাচ্চাদের মাছ কাটাতে বসাই?”

কাওরান বাজার সংলগ্ন রেললাইনের পাশে মাছ কাটছে শিশুরা

নাজমুলের হাতে মস্ত বড় এক রুই মাছ। আঁশ ছাড়াতে ব্যস্ত তার ছোট ছোট হাত দুটি। প্রচণ্ড রোদে মুখ চকচক করছে মাছের আঁশ আর তার মুখ। নাম ধরে ডাকতেই হাসি মুখে তার জবাব, “জি?”

দশ বছরের নাজমুল হাসান সবে শুরু করছে মাদ্রাসায় যাওয়া। তবে তার মাছ কাটার ধরন দেখে মনে হবে, এ তো ভারি সহজ কাজ!

সকাল থেকে সন্ধ্যা হাড়ভাঙ্গা খাটুনি করা শিশুগুলোর দৈনিক আয় কত? প্রশ্ন আসতেই পারে। শৈশবের খেলাধুলা আর আনন্দ ভুলে কর্মজীবনে প্রবেশ করা এসব শিশু দিনে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত আয় করে।

তাদের মধ্যে অনেকেই মাছের আঁশ বিক্রি করে। তবে তা হতে হবে বড় মাছের। রিয়া মনি জানায়, “মাছের আঁশ প্রতি কেজি ৮০ টাকা। আর আঁশ ছাড়ানোর টাকা আলাদা।”

বাবা-মায়ের সঙ্গে মাছ কাটার কাজে নামা এসব শিশুর বেশিরভাগই বোঝে না তাদের মজুরি কিংবা আয়ের হিসেব। অনেকেই জানে না তাদের দৈনিক আয় কত?

খুকু মনি কিংবা নাজমুলের কাছে তাদের আয়ের হিসেব পাওয়া যায়নি।

বাজারে আসা অনেক সামর্থ্যবান মানুষ হয়ত অনেক মাছের নামই জানেন না। তবে সুবিধাবঞ্চিত এসব শিশু দারিদ্র্যের কষাঘাতে মাছ চিনেছে, অভাব তাদের শিখিয়েছে কাটাকাটির কাজ। খেলার মাঠ কিংবা নির্মল আনন্দ নয় তাদের শৈশব হয়ে উঠছে জীবনযু্দ্ধে লড়াইয়ের ইতিহাসে সমৃদ্ধ।

About

Popular Links