Sunday, May 26, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

টনিক ব্যবহার করা ড্রাগন ফল চেনার উপায়

প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত ড্রাগন ফলের ওজন ২৫০ থেকে সর্বোচ্চ ৩০০ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৯:১৭ পিএম

দেশে ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে ড্রাগন ফলের চাষ। ফলটি চাষে ব্যাপক আগ্রহী হচ্ছেন কৃষকেরা। তবে এর সঙ্গে নতুন একটি আলোচনা তৈরি হয়েছে। ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে ফলটির উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে বলে আলোচনা রয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা হচ্ছে, বেশি লাভের আশায় অসাধু-লোভী কিছু কৃষক ভারতের ক্ষতিকর “ড্রাগন টনিক” ব্যবহার করছেন। এতে করে ফলের ওজন বাড়ছে। উৎপাদন বাড়ছে। কিন্তু স্বাদহীন হয়ে পড়ছে ফলটি।

এই আলোচনায় দুটি দিক হাজির হয়েছে। একটি ক্ষতিকর ড্রাগন টনিক আর অন্যটি “প্ল্যান্ট গ্রোথ রেগুলেটর” বা পিজিআর এর ব্যবহার। টনিক এক ধরনের হরমোন। এটি ব্যবহারের ফলে গাছের দ্রুত বৃদ্ধি হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “প্ল্যান্ট গ্রোথ রেগুলেটর” বা পিজিআর আপেল, নাশপাতি বা মিষ্টি চেরির মতোই ড্রাগন চাষেও ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে ক্ষতিকর কোনো কীটনাশকের উপাদান পাননি তারা।

তবে “টনিক” ব্যবহার স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে পদক্ষেপ নিচ্ছেন।

কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটের ফল বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. উবায়দুল্লাহ কায়ছার বিবিসি বাংলাকে বলেছেনন, “সম্প্রতি ড্রাগন চাষে টনিক ব্যবহারের বিষয়টি জানতে পেরেছেন তারা। সীমান্ত এলাকার কিছু কৃষক এই টনিক ব্যবহার করছে। এরই মধ্যে টনিক ব্যবহার করা ড্রাগন ফলের নমুনা সংগ্রহ করেছেন তারা। এগুলোর রাসায়নিক পরীক্ষা করে দেখবেন তারা।”

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও জার্মপ্লাজম সেন্টারের পরিচালক ড. মোক্তার হোসেন জানান, ড্রাগন ফল উৎপাদনের জন্য যে টনিক ব্যবহার করা হচ্ছে তার নাম হচ্ছে জিএ৩ বা “জিবারেলিক এসিড থ্রি”। এটি মূলত এক ধরনের হরমোন। তবে এটি টনিক নামেই ভারত থেকে বাংলাদেশে আসছে।

তিনি বলেন, “এটি মূলত গ্রোথ হরমোন। তবে টনিক হিসেবে যেটি ব্যবহার করা হয় সেটিতে হরমোন ছাড়াও এর সাথে আরো কিছু উপাদানও মিশ্রিত করা হয়। এগুলো খুব র‍্যাপিড এক্সপ্যানশন করে ফ্রুটসের। অনেকগুলো বাগানেই এগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে।”

বাংলাদেশে শুধু ড্রাগন ফল নয় বরং মূলা উৎপাদনেও এই টনিক ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। এতে মূলার উৎপাদনের সময় অন্তত ২০ দিনের মতো এগিয়ে নিয়ে আসা হচ্ছে। মূলা উৎপাদনে সাধারণত ৬০-৬৫ দিনের মতো সময় লাগে।

টনিক ব্যবহার করে উৎপাদিত ড্রাগন চেনার উপায়

অধ্যাপক ড. মোক্তার হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেন, টনিক ব্যবহার করে উৎপাদিত ড্রাগন ফল দেখে চেনার কিছু উপায় রয়েছে। প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত ড্রাগন ফলের ওজন ২৫০ থেকে সর্বোচ্চ ৩০০ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে। আর টনিক ব্যবহার করে উৎপাদিত ড্রাগন ফলের ওজন ৩০০ গ্রাম থেকে শুরু করে ৯০০ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে।

টনিক ব্যবহার করে উৎপাদিত ফলের বাহ্যিক আকার উদ্ভট হয়ে যায়। এই ড্রাগন ফলের রং এক রঙা থাকে না। পার্পেল বা লাল রঙের সঙ্গে সবুজ রঙের মিশ্রণ থাকে। এক পাশে বা অন্তত এক তৃতীয়াংশ সবুজ থাকে। কারণ পুরো এক রঙের হওয়া পর্যন্ত গাছে রাখা হলে সেটি পঁচে যায়। আর একসঙ্গে চার-পাঁচ দিন রেখে দিলে পুরোটাই হলুদ রঙের হয়ে যায়।

টনিক ব্যবহার করে উৎপাদিত ড্রাগন ফল পানসে স্বাদের হবে। মিষ্টি একেবারেই থাকবে না।

অধ্যাপক মোক্তার হোসেন বলেন, “যখন আপনি টনিক ব্যবহার করছেন, তখন গ্রোথ (ফলের বৃদ্ধি) খুব র‍্যাপিডলি (দ্রুত) হচ্ছে। বাহ্যিক আকারও তখন স্বাভাবিকভাবেই ভিন্ন হবে। বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান তৈরি হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যাচ্ছে না। এর আগেই সেগুলো তুলে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছে কারণ সেগুলো বেশি দিন থাকলে ওজন অনেক বেড়ে যায়।”

স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটা?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিভিন্ন রাসায়নিক নিরাপদ উপায়ে ব্যবহারের মাত্রা ঠিক করে দিয়েছে। তবে বাংলাদেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটা মানা হয় না। বেশি পরিমাণে হরমোন বা রাসায়নিক ব্যবহার করা হলে তা স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ।

অধ্যাপক মোক্তার হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেন, “স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার বাইরে কৃত্রিমভাবে উৎপাদিত যেকোনো পণ্যেরই স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে।”

টনিক ব্যবহার করে উৎপাদিত ফলের স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটরে কর্মকর্তা উবায়দুল্লাহ কায়ছার।

দক্ষিণ আমেরিকার জঙ্গলে ড্রাগন ফলের জন্ম। সেখান থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে ভিয়েতনামে ড্রাগন ফলের বীজ নিয়ে আসা হয়। এরপর ধীরে ধীরে শুরু হয় ড্রাগন ফলের চাষ, বাড়তে থাকে প্রসার। বর্তমানে ভিয়েতনামে এই ফল ব্যাপকভাবে চাষ হচ্ছে। তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা, ভারত, মালয়েশিয়া, চীন, ইসরায়েল, মেক্সিকো, মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলে সফলভাবে ড্রাগন ফলের চাষ হচ্ছে।

ড্রাগন ফলের গাছ এক ধরনের ক্যাকটাস জাতীয়। এই গাছ সাধারণত দেড় থেকে আড়াই মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে।

কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, বাংলাদেশের মাটি ও জলবায়ু ড্রাগন ফল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। বন্যামুক্ত প্রায় সব ধরনের মাটিতেই ড্রাগন ফলের চাষ করা যায়। বর্তমানে ঢাকা, নাটোর, গাজীপুর, পাবনা, বগুড়া, চট্টগ্রাম, নরসিংদী, রাজশাহী, পার্বত্য চট্টগ্রামে বাণিজ্যিকভাবে ড্রাগন ফলের বাগান আছে এবং দেশের অন্যান্য এলাকায়ও এর চাষ সম্প্রসারিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বারি ড্রাগন ফল-১ নামে ড্রাগন ফলের নতুন একটি জাত উদ্ভাবন করেছে। এছাড়া কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগ ও জার্মপ্লাজম সেন্টার মিলিতভাবে ড্রাগন ফলের তিনটি প্রজাতি উদ্ভাবন করেছে। এগুলো হচ্ছে বাউ ড্রাগন-১, বাউ ড্রাগন-২ এবং বাউ ড্রাগন-৩।

প্রায় আট-দশ বছর আগে থেকে বাংলাদেশে ড্রাগন চাষ শুরু হয়। বাংলাদেশে থাইল্যান্ডের জাত ও দেশীয় উদ্ভাবিত জাতের ড্রাগন চাষ বেশি হয়। সারাদেশে ড্রাগন উৎপাদনের পরিমাপ প্রতি হেক্টরে ৩০ থেকে ৩২ টন। ড্রাগন ফল সাধারণত মে মাস থেকে শুরু করে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত উৎপাদিত হয়। বছরে তিনবার ফল সংগ্রহ করা হয়।

About

Popular Links