Tuesday, June 09, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

জরিপ: বাংলাদেশের অধিকাংশ নারী স্বামী কর্তৃক সহিংসতার শিকার

বাংলাদেশে জীবনসঙ্গীর দ্বারা সহিংসতা এখনও ব্যাপকভাবে বিদ্যমান, যা লাখ লাখ নারীর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলছে

আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৩:২৮ পিএম

জীবনসঙ্গী বা স্বামী কর্তৃক সহিংসতা (আইপিভি) বাংলাদেশে এতটাই প্রকট যে প্রায় ৭০ ভাগ নারী তাদের জীবদ্দশায় অন্তত একবার হলেও শারীরিক, যৌন, মানসিক এবং অর্থনৈতিক সহিংসতার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের  শিকার হয়েছেন।  ৪১% নারীর ক্ষেত্রে গত ১২ মাসে এই সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এই পরিসংখ্যানগুলো জাতিসংঘের মানসম্পন্ন পরিমাপের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা বিশ্বব্যাপী নারীর প্রতি সহিংসতার বিস্তার পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক   এমন সহিংসতামূলক  আচরণগুলো অন্তর্ভুক্ত করলে এই সহিংসতার ব্যাপকতা  আরও বেশি হয় (জীবনে অন্তত একবার: ৭৬% নারী এবং গত ১২ মাসে: ৪৯% নারী)।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) বাংলাদেশ এর সমন্বয়ে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে “নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ ২০২৪- এর মূল তথ্যগুলো প্রকাশিত হয়।  ২০১১ এবং ২০১৫ সালের জরিপের পরে তৃতীয়বারের মত ২০২৪ সালের নারীর প্রতি সহিংসতার এই জরিপটি বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতার প্রকৃতি, মাত্রা এবং প্রভাব সম্পর্কে সবচেয়ে বিস্তৃত এবং সমসাময়িক প্রেক্ষাপটের প্রকৃত চিত্র উপস্থাপনকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন।”

যদিও জীবদ্দশায় স্বামী বা জীবনসঙ্গী কর্তৃক সহিংসতার বিস্তৃতি এখনও ৭০%, অর্থাৎ উচ্চ মাত্রায় রয়েছে, বিগত ১২ মাসে এই হার ৪১%। এই হার ২০১৫ সালে জীবদ্দশায় ছিল ৭৩% এবং গত ১২ মাসে ছিল ৫৫%।  এই জরিপটিতে  নন-পার্টনার সহিংসতার চেয়ে জীবনসঙ্গী বা স্বামী কর্তৃক সহিংসতা (আইপিভি) বিস্তারের মাত্রা অধিক হিসেবে ওঠে এসেছে।

জরিপটিতে, “জীবনসঙ্গী” বলতে বর্তমান বা প্রাক্তন স্বামী এবং “নন-পার্টনার” বলতে বর্তমান বা প্রাক্তন স্বামী ব্যতীত উত্তরদাতার ১৫ বছর বয়সের পর হতে জীবনের যেকোনো সময়ে সংস্পর্শে আসা যেকোনো ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে। 

উত্তরদাতা নারীদের অর্ধেকেরও বেশি (৫৪%) জীবদ্দশায় তাদের স্বামীর দ্বারা শারীরিক অথবা যৌন সহিংসতা বা উভয় সহিসতার সম্মুখীন হলেও  ১৬% নারী গত ১২ মসে এই ধরনের সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছেন।  এছাড়াও নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ এবং মানসিক সহিংসতা সর্বাধিক সংঘটিত সহিংসতার ধরন হিসাবে পাওয়া গেছে। ফলে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয় বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

উপরন্তু, জরিপে দেখা যায় যে নারীদের অন্য কারও তুলনায় তাদের স্বামীর কাছ থেকে শারীরিক সহিংসতার শিকার হওয়ার সম্ভাবনা ৩ গুণ বেশি এবং যৌন সহিংসতার শিকার হওয়ার সম্ভাবনা ১৪ গুণ বেশি। এতে প্রতীয়মান যে, বৈবাহিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে, শারীরিক এবং যৌন সহিংসতার ঝুঁকি অত্যধিক বেশি।

 জরিপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- সহিংসতার ঝুঁকির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য তারতম্য, যেমন- দুর্যোগ-প্রবণ এলাকার নারীরা তাদের জীবদ্দশায় এবং বিগত ১২ মাসের মধ্যে, অ-দুর্যোগ-প্রবণ এলাকার নারীদের তুলনায় জীবনসঙ্গী বা স্বামীর দ্বারা বেশি মাত্রায় সহিংসতার সম্মুখীন হন।

জীবনসঙ্গী বা স্বামী কর্তৃক সহিংসতার মাত্রা বেশি হলেও সহিংসতার শিকার নারীদের প্রায় ৬৪% তাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া সহিংসতার কথা কাউকে কখনো বলেননি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পরিবারের সুনাম রক্ষা করার আকাঙ্ক্ষা, সন্তানদের ভবিষ্যত সম্পর্কে উদ্বেগ এবং এধরনের সহিংসতা স্বাভাবিক বলে মনে করার প্রবণতাসহ বিভিন্ন কারণ থেকে মূলত এই নীরবতা।

অনুষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তা, উন্নয়ন সহযোগী এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশ নেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মমতাজ আহমেদ, এনডিসি এবং পরিসংখ্যান ও তথ্যবিজ্ঞান বিভাগ, পরিকল্পনা মন্ত্রনালয়ের সচিব আলেয়া আক্তার। এছাড়াও সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) এর ভারপ্রাপ্ত  প্রতিনিধি মাসাকি ওয়াতাবে, এবং অস্ট্রেলিয়ান হাই কমিশনের ডেপুটি হাইকমিশনার জনাব ক্লিনটন পবকে। অনুষ্ঠানটির সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মহাপরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। ২০২৪ সালের নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপের মূল ফলাফল উপস্থাপন করেন বিবিএস এর প্রকল্প পরিচালক জনাব ইফতেখাইরুল করিম।

বাংলাদেশ সরকার এবং ইউএনএফপিএ এই তথ্য-প্রমাণের ওপর নারীর প্রতি সহিংসতা মোকাবেলায় কর্যকরী নীতিমালা প্রণয়ন এবং পরিষেবা  ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে তাদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। বিশেষ করে, জরিপের তথ্যগুলোকে আইনি কাঠামো ও নীতিমালার সংস্কার এবং জাতীয় পরিকল্পনা ও কার্যক্রমে প্রতিফলনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, এবং একইসঙ্গে বহুমুখি কর্মসূচি সমন্বয়ের মাধ্যমে, বিশেষ করে সহিংসতা মোকাবিলায় পরিষেবাগুলোকে শক্তিশালী করা এবং সহিংসতা  প্রতিরোধ প্রচেষ্টাকে সম্প্রসারণ করার ওপর জোর দেন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো  কর্তৃক পরিচালিত নারীর প্রতি সহিংসতা বিষয়ক জরিপটি দেশে নারীর প্রতি সহিংসতা বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০১১ এবং ২০১৫ সালের জরিপগুলোর পর, ২০২৪ সালের এই তৃতীয় পর্যায়ের জরিপ করার মাধ্যমে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ পরিচালনায় একটি নেতৃস্থানীয় দেশ হিসেবে তার অবস্থান পুনর্নিশ্চিত করেছে।

এই খানাভিত্তিক জরিপে শহর, গ্রাম, দুর্যোগপ্রবণ এবং বস্তি এলাকাসহ ২৭,৪৭৬ জন নারীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে এবং প্রথমবারের মতো গুণগত গবেষণার মাধ্যমে স্বল্প পরিসরে কিছু তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। ১৫ বছর বা তার ঊর্ধ্ব বয়সী নারীদের জীবনসঙ্গী/স্বামী বা নন-পার্টনার উভয়ের মাধ্যমে সহিংসতার অভিজ্ঞতাগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই জরিপ নারীর প্রতি সহিংসতা নিরসনের জন্য নীতি ও কর্মসূচি নির্ধারণে অমূল্য অবদান রাখবে বলে আশা করি,” বলেন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মহাপরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।

পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ, পরিকল্পনা মন্ত্রনালয়ের সচিব আলেয়া আক্তার বলেন, “২০২৪ সালের নারীর প্রতি সহিংসতা বিষয়ক জরিপ বাংলাদেশের জেন্ডার পরিসংখ্যানকে আরও সর্মৃদ্ধ করেছে এবং তা এসডিজি ৫-এর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করেছে। এ তথ্যগুলো বাংলাদেশের ‘ভলান্টারি ন্যাশনাল রিভিউ’-তে নারীর প্রতি সহিংসতার সূচক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যা ২০২৫ সালের জুলাই মাসে জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ফোরামে উপস্থাপিত করা হবে। এই তথ্যগুলো নারীর প্রতি সহিংসতা নির্মূলের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে ভূমিকা রাখবে।”

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমীন এস. মুরশিদ বলেন, “সহিংসতামুক্ত ও প্রকৃত অর্থে সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য মানসম্পন্ন তথ্য অপরিহার্য। এই তথ্য জাতীয় কর্মপরিকল্পনাকে সঠিকভাবে পরিচালিত করতে সহায়তা করবে। এই জরিপ নারীর প্রতি সহিংসতা নির্মূলের জন্য প্রমাণভিত্তিক কৌশল তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং শেষ পর্যন্ত একটি জেন্ডার-সমতাপূর্ণ ও বৈষম্য-মুক্ত সমাজ গড়তে আমাদের সহায়তা করবে।”

জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) এর ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি মাসাকি ওয়াতাবে বলেন, “বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো  এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মধ্যকার সহযোগিতামূলক অংশীদারিত্ব অত্যন্ত প্রশংসনীয়। সাক্ষাৎকার প্রদানকারী নারীরাসহ সংশ্লিষ্ট  স্টেকহোল্ডারদের নিরলস পরিশ্রম ও অবদান ব্যতীত নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ ২০২৪ পরিচালনা করা সম্ভব হত না। জরিপ পরিচালনা পদ্ধতিকে শক্তিশালী করতে বিষয় ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ, পরিসংখ্যানবিদ এবং তথ্য সংগ্রহকারীদের প্রশিক্ষণসহ বৈশ্বিক মানদন্ড ও বেস্ট প্রাক্টিস অনুসরণ করে  তথ্য-উপাথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের  প্রক্রিয়া শক্তিশালী করতে ইউএনএফপিএ কারিগরি সহায়তায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।”

মাসাকি ওয়াতাবে আরও বলেন, “এই জরিপের প্রতিবেদনটি কেবলমাত্র একটি পরিসংখ্যাগত সংখ্যা নয়, বরং এটি নারীর প্রতি সহিংসতা মোকাবেলায় প্রমাণ-ভিত্তিক কৌশল প্রণয়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে। জরিপের তথ্য অনুসারে, সহিংসতার ব্যাপকতায় কিছুটা অগ্রগতি দেখা গেলেও নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ করতে আমাদের আরও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে এবং বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যেন বাংলাদেশের প্রতিটি নারী ও কিশোরী সহিংসতা থেকে মুক্ত একটি নিরাপদ জীবনযাপন করতে পারে।”

অনুষ্ঠানে আরও জানানো হয় যে বিস্তারিত বিশ্লেষণ ও নীতিগত সুপারিশসহ পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনটি ২০২৫ সালের মে মাসের মধ্যে প্রকাশিত হওয়ার আশা করা যাচ্ছে। এই তথ্য বাংলাদেশের নারীর প্রতি সহিংসতা নির্মূলে কাজ করা নীতিনির্ধারক, গবেষক, উন্নয়নকর্মী ও অধিকারকর্মীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে।

   

About

Popular Links

x