বাংলা সাহিত্য ও সংগীত জগতের অন্যতম দেদীপ্যমান জ্যোতিষ্ক জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে আজ পর্যন্ত অসংখ্য জীবনীগ্রন্থ রচিত হলেও, তার একটিও সম্পূর্ণ ‘আদর্শ ও নির্ভরযোগ্য’ জীবনী হয়ে উঠতে পারেনি। নজরুল-জীবনী রচনার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হিসেবে কাজ করছে সঠিক তথ্যের চরম অপ্রতুলতা, কিংবদন্তিনির্ভরতা, পারিবারিক ইতিহাসের অস্পষ্টতা এবং জীবনীকারদের ‘বীরপূজা’ বা মানুষকে অতিমানবে রূপ দেওয়ার একপেশে মানসিকতা।
অন্য যেকোনো বাঙালি কবির চেয়ে নজরুলকে নিয়ে বেশি জীবনী লেখা হলেও সেগুলোর বড় অংশই নির্ভরযোগ্য নয়। এর প্রধান কারণ, কবির জীবনের বহু অধ্যায়, বিশেষ করে সেনাবাহিনী থেকে কলকাতায় ফিরে আসার আগের সময়টা পুরোপুরি অস্পষ্ট। নজরুলের দুই ভাই বা তার সন্তানরা, কেউই কবির শৈশব বা প্রথম জীবনের সঠিক ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রেখে যেতে পারেননি। ফলে জীবনীকাররা অনেকাংশেই শোনা কথা এবং নিজেদের কল্পনার ওপর নির্ভর করে লিখেছেন, যা জীবনীগুলোকে বস্তুনিষ্ঠ করার চেয়ে ‘কিংবদন্তিমূলক’ করে তুলেছে।
এমনকি নজরুলের জন্মদাতা পরিবারে সন্তানদের জন্মতারিখ লিখে রাখার মতো ন্যূনতম প্রাতিষ্ঠানিক ঐতিহ্য ছিল না। তা সত্ত্বেও পরবর্তীকালে কবির অসামান্য কীর্তির ওপর ভিত্তি করে তাঁর দরিদ্র ও সাধারণ পূর্বপুরুষদের ওপর জোরপূর্বক আভিজাত্য ও গৌরব আরোপের একটি কৃত্রিম চেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। অথচ গবেষকদের স্পষ্ট মত, নজরুল যা হয়েছিলেন তা সম্পূর্ণ নিজের অসাধারণ প্রতিভা দিয়ে হয়েছিলেন, কোনো পারিবারিক আভিজাত্যের কারণে নয়। দুখু মিয়া থেকে কাজী নজরুল ইসলাম এবং শেষ পর্যন্ত ‘বিদ্রোহী কবি’ হয়ে ওঠার এই বিবর্তনটিই সবচেয়ে আগ্রহব্যঞ্জক, যা জীবনীকাররা চিরাচরিত ছকে বাঁধতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন।
এর বাইরে আজহারউদ্দীন খান বা আবদুল কাদিরের কাজগুলো গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাদের প্রথমাংশের জীবনী শোনা-কথা-নির্ভর ও অনেক জায়গায় ভ্রান্ত। অন্যদিকে অরুণকুমার বসুর 'নজরুল-জীবনী' তথ্যবহুল হলেও জীবনের ঘটনাবলির ভেতরের মূল ঐক্যসূত্র বা ধারণাগত কাঠামো ফুটিয়ে তুলতে পারেনি।
বাংলা জীবনী সাহিত্যের একটি মস্ত বড় দুর্বলতা হলো, যাঁর জীবনী লেখা হচ্ছে তাকে ত্রুটিহীন ও সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষে পরিণত করার এক অন্ধ প্রয়াস। অথচ মানুষ মাত্রই যে দোষে-গুণে রক্তমাংসের, জীবনীকাররা তা ভুলে যান। মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বা ফরাসি কবি বোদলেয়ারের ব্যক্তিগত জীবনে অনেক অন্ধকার দিক বা সীমাবদ্ধতা থাকলেও তা যেমন তাদের কবিখ্যাতিকে ম্লান করেনি, নজরুলের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একই।
বাংলাদেশে নজরুলের নির্মোহ বিচার করার ক্ষেত্রে আরেকটি বড় বাধা হলো তার ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে তৈরি হওয়া রক্ষণশীল মানসিকতা। নজরুল যখন প্রাতিষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে নিজেকে কেবল ‘মানুষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন, কিংবা জীবনের একটি পর্যায়ে শ্যামাসংগীত ও কালীর সাধনা করেছিলেন, রক্ষণশীল সমাজ আজও তা সহজভাবে গ্রহণ করতে পারে না। সমকালে তাকে 'কাফের' উপাধি দেওয়া সেই রক্ষণশীলেরাই এখন তাকে 'পাক্কা মুসলমান' প্রমাণ করতে মরিয়া, যা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও একপেশে সিদ্ধান্ত।
সাহিত্য সংশ্লিষ্টদের মতে, সমাজ ও জীবনীকারদের এই অতি-আবেগ এবং রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি বজায় থাকলে নজরুলের চরিত্রের আসল প্যাটার্ন বা বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তোলা অসম্ভব। একজন বড় কবিকে অলৌকিক দেবতা না বানিয়ে, তামাক ও পানের অভ্যাসের মতো ক্ষুদ্র বিবরণে আটকে না রেখে, একজন রক্তমাংসের মহান ‘মানুষ’ হিসেবে দেখার উদারতা সমাজ যেদিন দেখাবে, সেদিনই কেবল নজরুলের একটি সার্থক ও আদর্শ জীবনী রচনা করা সম্ভব হবে।



