Saturday, September 12, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

এক টুকরো গ্রাম যাপনের গল্প

গ্রামের সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন দৃশ্যমান। প্রচুর মোটর বাইক দেখেছি। নারীরা পর্দা করেন। মসজিদ সুসজ্জিত

আপডেট : ১০ মে ২০২২, ০৫:১৯ পিএম

গ্রামের গল্প গ্রামই জানে। আমরা শহরগামী হাইওয়ে-ফেরত। আমাদের কাছে তা দূরভাষ্য। ঈদের ছুটিতে কিছু কাছ থেকে কথা শোনা হয়।

পাবনা শহর থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটারের কম দূরত্বে এমন গ্রামের খবর শুনতে পাই। এটি এমন একটি গ্রাম যার ভোটার সংখ্যা প্রায় ২,২০০। লোকসংখ্যা প্রায় ১১ হাজার। মুসলিম প্রধান এলাকা। বেশিরভাগের পেশা কৃষিকাজ। কিন্তু এই শস্যের শিল্পীরা আছেন শঙ্কায়।

বোরো মৌসুমে এখানে ফলে প্রধানত ধান, পাট আর অল্প সরিষা। জিজ্ঞেস করে জেনেছি, এ ধানের ধরন। আছে বিআর থ্রি, তেজ গোল্ড আর বিআর ২৯। আমন মৌসুমে কৃষকরা রোপন করেন গুটি স্বর্ণা আর একান্নো গুটি।  

বাংলার বৃহত্তম দুটি নদী যমুনা ও পদ্মা এ জনপদকে ঘিরে আছে। কাছেই আছে বিস্তৃত বিল। তবু গভীর সেচের পাম্পের আওতায় এ এলাকা। পদ্মাকে ঘিরে সুইচগেট। আর যমুনাকে ঘিরেও তাই। মাটির ওপরের পানি তাই থাকে কৃষকের অধরা। দিনে দিনে পানি নেমে যাচ্ছে তল থেকে অতলে।  

প্রাকৃতিক আবাদের সুযোগ নেই। রাসায়নিক সার যাচ্ছে এন্তার। জমি জুড়ে কৃষকের হাত ছিটায় ইউরিয়া, টিএসপি, এমপি। কৃষকের বচনে যা ‘‘মাইটে সার’’ ও ‘‘লাল সার’’। পুরো কৃষিকাজে কীটনাশকের উপস্থিতি আছে ব্যাপক। জৈব বালাইনাশকে কাজ হচ্ছে না।

এখনও বিঘা প্রতি প্রায় ২৫-৩০ মণ ধান আসছে। তবে ক’দিন তা আসবে তা কেউ জানেন না। যতই আধুনিকায়ন ঘটুক ‘‘আল্লাহ মেঘ দে, পানি দে . . .’’-তেই ধরা এখনও বাংলার কৃষি।

সমস্যা হচ্ছে ফসল কাটা কৃষি শ্রমিক নিয়ে। গ্রামের অনেকেই স্বাধীন পেশাজীবী। কেউ রিকশা চালান। অটোর স্টিয়ারিংয়ে কারও হাত। ফসল শ্রমিক হওয়ার সাধ দেশের বহু এলাকার মতো এ জনপদের অনেকের মিটে গেছে। কৃষকদের মত, এর ইতিবাচকতা-নেতিবাচকতা দুই-ই আছে।

দেশের ভঙ্গুর স্বাস্থ্যখাতের চিত্র ব্যাপকমাত্রায় চিত্রিত গ্রামের পোস্টার, হাইওয়ের ব্যানার আর আঞ্চলিক সংবাদপত্রে। শুধু ডায়াগনস্টিক সেন্টার আর ডাক্তারখানার বিজ্ঞাপন। একটি বিশ্ব মহামারিতেও যে দৃশ্য বারবার উন্মোচিত হয়েছে কেন্দ্রীয় পর্যায়েও। স্বাধীনতার ৫০-এও স্বাস্থ্য খাত পরাধীন হয়ে জরা বাড়াচ্ছে মানুষের। উন্নয়নের ডামাডেলে এ আর্তনাদ পিষে ফেলার নয়।

গ্রামের ঘরে ঘরে ইন্টারনেট পৌঁছেছে। তা নিয়েই মাতোয়ারা কিশোর, তরুণেরা। দেখেছি, ধুমিয়ে চলছে টিকটক আর ফ্রি ফায়ার খেলা। বিস্তীর্ণ মাঠ থাকতেও তারা খেলায় নিরত। তখন প্রশ্ন জেগেছে, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সম্পদ হবে কবে?

গ্রামের সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন দৃশ্যমান। প্রচুর মোটর বাইক দেখেছি। নারীরা পর্দা করেন। মসজিদ সুসজ্জিত। গ্রামের টঙ দোকানে ভারতীয় সিরিয়াল লাগাতার। আর জায়গায় জায়গায় গ্রামীণ অর্থনীতিকে মজবুত করতে ভূমিকা রাখা বিকাশ, নগদের আউটলেট।

আমরা দম ফেলতে গ্রামে আসি। আবার জীবিকা বাঁচাতে শহরে ফিরি। এর মধ্যেই এক টুকরো গ্রাম যাপনের গল্প। তাতে সম্ভাবনা থাকে। হতাশা থাকে। বাদ যায় না বিরক্তিও। কিন্তু আমরা গ্রাম-বিযুক্ত নই। গ্রামের স্মৃতি অনেক স্মৃতির ভেতর জ্বলজ্বল করে। ফেরার সময় আবার প্রত্যাবর্তনের লজ্জাও কাজ করে। সব মিলিয়ে হাইওয়েতে মনে হতে থাকে কবি আল মাহমুদ এর ‘‘স্মৃতির মেঘলা ভোর’’ এর সেই লাইন-

 . . .“ফেলে যাচ্ছি খড়কুটো, পরিধেয়, আহার, মৈথুন–

নিরুপায় কিছু নাম, কিছু স্মৃতি কিংবা কিছু নয়;

অশ্রুভারাক্রান্ত চোখে জমে আছে শোকের লেগুন

কার হাত ভাঙে চুড়ি? কে ফোঁপায়? পৃথিবী নিশ্চয়।” . . .


   

About

Popular Links

x