Sunday, May 26, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ তাই, ঈদের আনন্দ নাই

সমাজের গড়ে তোলা প্রাচীরের অন্তরালেই থেকে যায় উপেক্ষিত জীবনের অধ্যায়, চাপা পড়ে গগনবিদারী আর্তনাদ

আপডেট : ২৯ জুন ২০২৩, ০২:১১ পিএম

ঈদ মানেই আনন্দের জোয়ার। চাকরিজীবীরা বোনাস পান, দৈনন্দিন রুটিন থেকে শিক্ষার্থীদের মেলে সাময়িক মুক্তি। ছুটিতে ফিরে পুরোনো বন্ধু, বাড়ির মানুষের সঙ্গে হৈ-চৈ, খিলখিল আনন্দ। ঈদের এই গল্পই তো আমাদের চিরচেনা, তাই না?

ব্যতিক্রম গল্পও থাকে। বাড়ি থাকলেও কারো কারো ফেরা হয় না, স্বজনরা তাদের ঈদের উচ্ছ্বাসে শামিল হতে দেন না। সমাজের অন্য দশজনের মতো কাটে না তাদের ঈদ। মানুষ হিসেবে জন্মেও তারা অধিকার, আনন্দ থেকে বঞ্চিত। সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তাদের মহিমাময় উৎসবের নির্মল আনন্দ সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতে বাধা দেয়।

ঈদ মানে বৈষম্যহীন আনন্দের জোয়ার। জনজীবনে “জীবন” যোগের এক অনন্য প্রয়াস। কিন্তু সমাজের গড়ে তোলা প্রাচীরের অন্তরালেই থেকে যায় উপেক্ষিত জীবনের অধ্যায়, চাপা পড়ে গগনবিদারী আর্তনাদ। কারণ, তারা “তৃতীয় লিঙ্গে”র অন্তর্ভুক্ত। 

তেমনি একজন নূর আলম নীলা। সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে (গবি) কাজ করছেন নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে।

শৈশবে সমাজের বাকি মানুষদের মতোই মহা আনন্দে ঈদগুলো কাটত নীলার। ছিল না গণ্ডি। আদরে-আবদারে আর দশটা শিশুর মতো উৎসবের দিনগুলো। বড়দের থেকে পাওয়া উপহারের কথা ভাবলে এখনো চোখ ছলছল করে ওঠে। মনে পড়ে ঈদের দিন হুট করেই হাজির হতেন ফুপু কিংবা খালার বাড়িতে। সেই ঈদগুলো ছিল রঙিন-প্রফুল্ল।

কিন্তু এই রঙ একদিন ঢেকে যেতে শুরু করে এক অচেনা মেঘের আড়ালে। হঠাৎ করেই তার জীবনে নেমে আসে বিভীষিকা। নিজেকে অন্যভাবে আবিষ্কার করতে শুরু করেন তিনি। শরীরে শুরু হয় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন। সেই পরিবর্তনের ধারায় তার নতুন পরিচয় হয় “তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ”। একদিন তাকে হতে হয় সবার পর, ছাড়তে হয় বাড়িঘর।

এভাবেই মিলিয়ে যায় নীলার জীবনের সব ঈদ। আনন্দগুলো হতে থাকে ধূসর। উৎসব কাটতে থাকে ঘরের কোণে, সঙ্গী হয় টেলিভিশন। মায়ের হাতের খিচুড়ি আর পায়েস ছাড়া ঈদ যার কাছে অভাবনীয় ছিল, সেই মানুষটি এখন স্বজন থাকতেও সর্বহারা। বিশেষ দিনে এখন আর কেউ উপহার দেয় না। আবদার মেটানোর মানুষ নেই, ঈদের দিন তাই নিজেকেই মিষ্টিমুখ করান তিনি।

ঈদে বাজার থেকে শুরু করে রান্না সব একাই করেন নীলা। মায়ের রান্নার কথা ঠিকই মনে পড়ে, স্মৃতিতে ভাসে ভাইয়ের সঙ্গে খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ির মুহূর্তগুলো।

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ হিসেবে পরিবারের বাইরে প্রথম ঈদটির স্মৃতিচারণ করতে করতে কান্নায় ভেঙে পড়েন ২৯ বছর বয়সী নীলা। পরক্ষণেই সামলে নিয়ে বলতে শুরু করলেন, ‍‍‍“১৩ বছর ধরে আমি পরিবার বিচ্ছিন্ন। ঈদেও কেউ ডাকে না। তখন থেকে প্রতিটি ঈদ পরিবার ছাড়া করে আসছি। মা যতদিন ছিলেন, কথা হতো। ভাইদের সঙ্গে মাঝেমধ্যে কথা বলতাম। ঈদে সবার জন্য জামাকাপড় পাঠাতাম। সবাই জানে আমি চাকরি করি। তবুও পরিচয় অস্বীকার করে। যেন আমার অস্তিত্বই তাদের কাছে অনেক বড় বোঝা। আমি যোগাযোগ না করলে, তারা নিজে থেকে খোঁজ নেয় না।”

নীলার আক্ষেপ, “একটা সন্তান পঙ্গু হলেও তো মা বাবা অস্বীকার করে না, বিচ্ছিন্ন করে দেয় না। তবে আমরাই কেন এত নিগৃহীত? বিধাতা আমাকেও তো মানুষ বানিয়েছেন। এই সমাজ কেন আমাকে আলাদা বিশেষণ দিয়ে বিচ্ছিন্ন করে দিলো?”

তাই ঈদ যেন নীলার কাছে একটা শোকের পর্ব। তবে এতগুলো বছরে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন তিনি। এখন ঈদে নিজের জন্য সবকিছু করেন। সহকর্মীদের বাসায় যান, সবাই মিলে বাইরে ঘুরে বেড়ান। আলাদা এক জগতে আলাদা এক ঈদ কাটে তাদের। এই তো উপেক্ষিত জীবনে বৃহন্নলাদের ঈদ!

নূর আলম নীলার জন্ম খুলনার রূপসা উপজেলায়। বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর তিনি বড় ভাইয়ের সঙ্গে চলে এসেছিলেন সাভারের নলাম এলাকায়। তৃতীয় লিঙ্গের পরিচিতি চিরসঙ্গী হলে পরিবার মুখ ঘুরিয়ে নেয় তার থেকে। বোনদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে বড় ভাইয়ের সঙ্গে। 

কিশোর বয়সে পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে শুরু হয় নীলার অন্য জীবন। খুঁজে পান গুরু অনন্যাকে। তার দলে ভিড়ে নীলাকেও করতে হলো তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের চিরচেনা কাজ বাস,লঞ্চ,ট্রেন, দোকানে চাঁদা তোলা। নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে উঠলো শত শত মানুষের ধিক্কার।

এভাবে কেটে যায় দীর্ঘ সময়। অবশ্য মাঝাখানে কিছু সময়ের জন্য পোশাক কারখানা, বিউটি পার্লারেও কাজ করেছিলেন। তবে যৎসামান্য মজুরির কারণে জীবনযাপনই কষ্টকর হয়ে ওঠে।

২০১৮ সালে সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে চাকরি দেয়। নীলার কাছে এই চাকরি স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাওয়া। তার মতো এমন ছয়জন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ কাজ করেন গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে।

নীলা জানান, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আত্মিক। এখানে তারা মানুষের মর্যাদা পান। 

তিনি বলেন, “দেশের সব সরকারি-বেসরকারি অফিসে অন্তত পাঁচজন করে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষকে যোগ্যতার ভিত্তিতে কাজের সুযোগ দিলে আমাদের অন্তত রাস্তায় নেমে মানুষের কথা শোনা লাগবে না।”

About

Popular Links