Saturday, August 15, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

চৌর্যবৃত্তির অভিযোগে পদত্যাগ করা কেমব্রিজের অধ্যাপকের মরদেহ উদ্ধার

গত সপ্তাহে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন 

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২৬, ১২:২৯ পিএম

প্লেজারিজম বা অন্যের লেখা নিজের নামে ব্যবহারের অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিতর্কের মধ্যে থাকা কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক জেসন আরডে মারা গেছেন।

শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বিকেলে দক্ষিণ লন্ডনের ব্যাটারসিতে একটি ঠিকানায় একজন ব্যক্তিকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। লন্ডন অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় মেট্রোপলিটন পুলিশ। সেখানে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।  

শনিবার (১৫ আগস্ট) বিবিসির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্লেজারিজমের অভিযোগ এবং তার কিছু অর্জন নিয়ে ওঠা প্রশ্নের পর গত সপ্তাহে আরডে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপকের পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। কিন্তু তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন।

আরডের পরিবার এক বিবৃতিতে বলেছে, “ভুল তথ্য ছড়ানোর প্রচারণা জেসনের জন্য খুব বেশি হয়ে গিয়েছিল। তিনি ছিলেন একজন কোমল স্বভাবের মানুষ, যিনি সবসময় সবার মধ্যে ভালো দিকটি দেখতে চাইতেন।”

শুক্রবার এর আগে লন্ডন অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের পক্ষ থেকে পুলিশকে ব্যাটারসির ওই ঠিকানায় ডাকা হয়।

মেট্রোপলিটন পুলিশের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে: “এই মুহূর্তে তার মৃত্যুকে অপ্রত্যাশিত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, তবে এতে সন্দেহজনক কিছু আছে বলে মনে করা হচ্ছে না।”

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডেবোরাহ প্রেন্টিস বলেছেন, “এই মর্মান্তিক খবর শুনে আমরা অত্যন্ত শোকাহত।”

শিক্ষামন্ত্রী লুসি পাওয়েল জানান, জেসনের মৃত্যুর খবর শুনে তিনি গভীরভাবে মর্মাহত ও শোকাহত।

প্রসঙ্গত, বিতর্কের সূত্রপাত হয় আরেক শিক্ষাবিদ নাথান কোফনাসের অভিযোগের পর। নিজেকে রেস রিয়ালিস্ট হিসেবে পরিচয় দেওয়া কোফনাসকে ২০২৪ সালে কেমব্রিজের দায়িত্ব থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল।

তিনি দাবি করেন, আরডের একাডেমিক কাজের মধ্যে তিনি প্লেজারিজমের বহু ঘটনা খুঁজে পেয়েছেন।

কিন্তু আরডে জানান, তার প্রাথমিক একাডেমিক কাজের কিছু ভুল তার অটিজমের কারণে হয়েছিলো। তিনি তথ্য বোঝার জন্য অনুকরণ বা মিমিক্রি-র ওপর নির্ভর করতেন বলে এসব ভুল হয়েছে বলে জানান।

তার দাবি ছিল, একইভাবে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করলে অন্য শিক্ষাবিদদের কাজেও এ ধরনের ভুল পাওয়া যেতে পারে।

চলতি মাসের শুরুতে দ্য টাইমস পত্রিকাকে তিনি বলেন, “আমরা এখানে একাডেমিয়া নিয়ে কথা বলছি। আমি তো কাউকে হত্যা করিনি। আমি মনে করি, আমি যে নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছি এবং আমাকে এ ধরনের মিথ্যাবাদী ও কল্পনাবিলাসী ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে তা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।”

২০২৩ সালে ৩৭ বছর বয়সে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কম বয়সী কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যাপক হিসেবে আরডের নিয়োগকে সে সময় একটি প্রগতিশীল ও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে প্রশংসা করা হয়েছিল।

গত সপ্তাহে নিজের পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার সময় আরডে বলেছিলেন, তাকে নিয়ে চলা তদন্ত ও সমালোচনার ব্যক্তিগত মূল্য এখন বেশি হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, “সমালোচনা একাডেমিক জীবনের একটি অনিবার্য অংশ। কিন্তু আমি যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছি, তা একাডেমিক মতবিরোধের সীমা অনেক দূর ছাড়িয়ে গেছে। অবিরাম অভিযোগ, জল্পনা এবং জনসমক্ষে মন্তব্য আমার এবং আমার প্রিয়জনদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে।”

৪১ বছর বয়সী আরডে প্লেজারিজমের অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন, তবে তার কাজের মধ্যে কিছু ভুল হয়েছিল বলে তিনি স্বীকার করেছিলেন।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, “তার পদত্যাগকে যেন তাকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিভিন্ন বক্তব্য বা অভিযোগের স্বীকৃতি হিসেবে ভুল করে মনে করা না হয়।”

কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রথমে জানিয়েছিল, আরডের থিসিস এবং কয়েকটি জার্নালে প্রকাশিত তার গবেষণাকাজে প্লেজারিজমের অভিযোগগুলো লিভারপুল জন মুরস ইউনিভার্সিটি (এলজেএমইউ) এবং সংশ্লিষ্ট জার্নালগুলো তদন্ত করেছে।

২০১৫ সালে আরডেকে পিএইচডি ডিগ্রি দেওয়া এলজেএমইউ-এর তদন্তে সিদ্ধান্তে আসা হয় যে তিনি প্লেজারিজম করেননি।

তবে চলতি সপ্তাহের শুরুতে কেমব্রিজ তার নিয়োগ নিয়ে একটি স্বাধীন তদন্তের ঘোষণা দেয়। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীদের কাছে লেখা এক চিঠিতে অধ্যাপক প্রেন্টিস বলেন, “জেসন আরডের নিয়োগ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে এবং এর বাইরেও যে উদ্বেগগুলো প্রকাশ করা হচ্ছে, আমি তা পুরোপুরি বুঝতে পারছি এবং আমিও সেই উদ্বেগের অংশীদার... তদন্তটি, আপনারা যেমন বলেছেন, অবশ্যই পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ হওয়া উচিত। কেমব্রিজের ভেতর ও বাইরের জ্যেষ্ঠ শিক্ষাবিদদের নিয়ে স্বাধীনভাবে এই তদন্ত পরিচালিত হবে।”

কেমব্রিজ আরডের নিয়োগকে একজন তরুণ কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যাপক হিসেবে উদযাপন করেছিল, যে সময়ে একাডেমিয়ায় কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যাপকের সংখ্যা ছিল অত্যন্ত কম।

যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মাত্র এক শতাংশ অধ্যাপক কৃষ্ণাঙ্গ। যে কারণে এমন প্রতিটি নিয়োগই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হয়।

এখন বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও বড় কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে তার প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব ও যত্নের বিষয়টিও, বিশেষ করে তাকে যখন এতটা গুরুত্বপূর্ণ ও প্রকাশ্য একটি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।

একইসঙ্গে বিভিন্ন পক্ষের ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতেও কেমব্রিজ পরিণত হতে পারে। একদিকে যারা মনে করেন আরডেকে প্রকাশ্যে অন্যায়ভাবে হয়রানি করা হয়েছিল, অন্যদিকে যারা প্রশ্ন তুলছেন তাকে আদৌ ওই পদে নিয়োগ দেওয়া উচিত ছিল কি না।

প্রচারণা সংস্থা গুড ল প্রজেক্ট -এর জোলিয়ন মগাম আরডের মৃত্যুকে একটি মর্মান্তিক ঘটনা বলে অভিহিত করেন।

মগাম আরও বলেন, “অধ্যাপক পদ থেকে পদত্যাগ করার পরও তাকে এভাবে ক্রমাগত হয়রানি করে যাওয়ার মধ্যে জনস্বার্থ কোথায় ছিল, আমি বুঝতে পারছি না। একইভাবে, সংবাদমাধ্যমের প্রতিষ্ঠানগুলো কী ধরনের ঝুঁকি মূল্যায়ন করেছিল, সেটাও আমি বুঝতে পারছি না।”

বিবিসি নিউজনাইটকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ব্ল্যাক স্টাডিজের অধ্যাপক এবং আরডের বন্ধু কেহিন্ডে অ্যান্ড্রুজ জানান, কেমব্রিজ থেকে পদত্যাগের পর আরডে খুবই ভেঙে পড়েছিলেন।  

অ্যান্ড্রুজ বলেন, “তিনি খুবই মর্মাহত ছিলেন। তার মনে হয়েছিল, বেরিয়ে আসার কোনো পথ নেই। কার্যত তিনি আর বাড়ি থেকে বের হতেন না। তিনি অনেক ওজন হারিয়েছিলেন।”

লেবার এমপি বেল রিবেইরো-অ্যাডি ওই অনুষ্ঠানে বলেছেন, “একজন শিক্ষাবিদকে এভাবে এতটা  ব্যাপক সংবাদমাধ্যমের নজরদারি ও সমালোচনার মধ্যে টেনে নেওয়ার ঘটনা নজিরবিহীন।”

আরডে প্রথমে শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক হিসেবে কাজ করতেন। এরপর তিনি লিভারপুল জন মুরস ইউনিভার্সিটি থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সহযোগী অধ্যাপক এবং গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

   

About

Popular Links

x