Wednesday, September 30, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

যুক্তরাষ্ট্রে অনলাইনে বাংলাদেশিসহ দক্ষিণ এশীয়দের বিরুদ্ধে ‘ঘৃণাসূচক বক্তব্য’ বেড়েছে  ২৪০%

মার্কিন প্রতিবেদন ‘দ্য রাইজিং টাইড অফ অ্যান্টি-সাউথ এশিয়ান হেট ইন দ্য ইউনাইটেড স্টেটস’ থেকে এসব তথ্য জানা গেছে

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৪২ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর অভিবাসন নীতি ও বক্তব্য, অর্থনৈতিক উদ্বেগ এবং মার্কিন সমাজে দক্ষিণ এশীয়দের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি ও ভূমিকার কারণে অনলাইনে বাংলাদেশী, ভারতীয় ও পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে ঘৃণাসূচক বক্তব্য বা বিদ্বেষমূলক আচরণ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে ২৪০%, মার্কিন এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।

মঙ্গলবার (২৮ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে এ খবর জানানো হয়েছে।

‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অফ অর্গানাইজড হেট’ (সিএসওএইচ) প্রকাশিত “দ্য রাইজিং টাইড অফ অ্যান্টি-সাউথ এশিয়ান হেট ইন দ্য ইউনাইটেড স্টেটস” শীর্ষক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দক্ষিণ এশীয়দের লক্ষ্য করে করা বিদ্বেষমূলক পোস্ট ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে ২৪০% বেড়েছে। যেখানে মানভেদে পোস্টের সংখ্যা ১২,৯০৪টি থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৩,৮৪৩টিতে।

গবেষকরা দেখেছেন, শুধুমাত্র ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী দক্ষিণ এশীয়দের লক্ষ্য করে ওই প্ল্যাটফর্মে ৫ লাখ ৪২ হাজারেরও বেশি বিদ্বেষমূলক পোস্ট করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পোস্ট হওয়া ছয় মাসের মধ্যে পাঁচটি মাস এই সময়কালের শেষের দিকে।

জাতিসংঘের ‘ঘৃণাসূচক বক্তব্যের’ (হেট স্পিচ) সংজ্ঞাকে ভিত্তি ধরে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। গবেষকরা অনলাইনে দক্ষিণ এশীয়দের উদ্দেশ্যে বারবার ব্যবহার করা আপত্তিকর শব্দ ও বক্তব্য পর্যবেক্ষণ করেন। হেট স্পিচ সংজ্ঞার সঙ্গে মেলে না এমন সাধারণ সমালোচনা বাদ দিয়ে পোস্টগুলো বিবেচনা করা হয়।

গবেষণায় উঠে এসেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) করা ঘৃণাত্মক পোস্টগুলোর প্রায় অর্ধেক জুড়েই দক্ষিণ এশীয়দের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ‘দখল করা’, ‘চাকরি চুরি করা’ কিংবা ‘জনমিতির জন্য হুমকি তৈরি করা’ এমন অভিযোগ আনা হয়েছে।

অপরদিকে, মানহানিকর গালি সমন্বিত বক্তব্য এক্স-এর ৩০% ঘৃণাত্মক পোস্টে এবং অন্যান্য উগ্র বা বিকল্প প্ল্যাটফর্মগুলোর ৪৫% পোস্টে লক্ষ্য করা গেছে।

দক্ষিণ এশীয়দের নোংরা বা অপরিচ্ছন্ন হিসেবে চিত্রায়িত করা পোস্টের সংখ্যা এক্স-এ ১৭১% বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই বিদ্বেষপ্রসূত পোস্টগুলোতে প্রায়শই দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন জাতিগত ও ধর্মীয় গোষ্ঠীকে একসঙ্গে মিলিয়ে একটি একক সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ভারতীয়, পাকিস্তানি ও বাংলাদেশীদের যেমন একে অপরের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা হয়েছে, তেমনি হিন্দু, মুসলিম, শিখ ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদেরও এক করে দেখা হয়েছে।

‘মডেল মাইনোরিটি’ থেকে ‘চাকরি চোর’

গবেষকরা উল্লেখ করেছেন, অর্থনৈতিক ক্ষোভ এই বিদ্বেষের আরেকটি বড় কারণ। কিছু দক্ষিণ এশীয় নাগরিকের সাফল্যকেই এখন তাদের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

একসময় ‘মডেল মাইনোরিটি’ (আদর্শ সংখ্যালঘু) হিসেবে পরিচিত ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিনীরা এখন ‘সুযোগ সন্ধানী ও প্রতারক’ হিসেবে চিত্রায়িত হচ্ছেন। একইসঙ্গে কর্মসংস্থান ও অর্থনীতি নিয়ে তৈরি হওয়া চরম ক্ষোভের শিকার বানানো হচ্ছে দক্ষিণ এশীয়দের।

সম্প্রতি মার্কিন রাজনীতিতে দক্ষিণ এশীয়দের উপস্থিতি ও প্রভাব আগের চেয়ে বহুগুণ দৃশ্যমান। যার উদাহরণ হিসেবে সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস ও নিউ ইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি থেকে শুরু করে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের স্ত্রী উষা ভ্যান্স কিংবা রাজনীতিবিদ বিবেক রামাস্বামীর নাম উঠে আসে।

প্রতিবেদনে রাজনৈতিক দলের মতাদর্শ নির্বিশেষে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের ওপর হওয়া একাধিক বর্ণবাদী আক্রমণের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দেখানো হয়, কীভাবে মামদানির প্রাথমিক ও মেয়র পদের বিজয় অনলাইনে দক্ষিণ এশীয় বিরোধী এবং ইসলামভীতিমূলক বিদ্বেষকে প্রবলভাবে বাড়িয়ে দেয়।

গবেষকরা বলছেন, এই দুটি প্রবণতাই এখন মূলধারার শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর সামাজিক মর্যাদা বা অবস্থান হারানোর মনস্তাত্ত্বিক আশঙ্কার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। এটি তাদের ‘গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট থিওরি’র মতো ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে উসকে দিচ্ছে—যেখানে দাবি করা হয় যে, পশ্চিমা দেশগুলোতে শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীকে একটি পরিকল্পিত চক্রান্তের মাধ্যমে সরিয়ে বহিরাগতদের স্থলাভিষিক্ত করা হচ্ছে।

সোশ্যাল মিডিয়া ও এআই-এর ভূমিকা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই ধরনের বিদ্বেষমূলক বক্তব্যগুলোকে সরাসরি টার্গেটেড হয়রানিতে রূপান্তর করেছে।

গবেষকরা দেখেছেন, এক্স-এর বেশ কিছু অ্যাকাউন্ট থেকে চাকরি কেড়ে নেওয়া বা ভিসা জালিয়াতির অভিযোগ তুলে দক্ষিণ এশীয়দের গোপন ব্যক্তিগত তথ্য ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কিছু সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার সরাসরি মানুষের বাড়ি ও কর্মস্থলে গিয়ে হাজির হচ্ছেন। তাদের হয়রানি করার ভিডিও অনলাইনে পোস্ট করছেন।

এর একটি উদাহরণ হিসেবে ডানপন্থী ইনফ্লুয়েন্সার সারা গঞ্জালেজের কথা তুলে ধরা হয়েছে। তিনি তার ৫ লাখেরও বেশি অনুসারী সম্বলিত অ্যাকাইন্টে একটি ভিডিও পোস্ট করেন, যেখানে তিনি এইচ-১বি’র সুযোগ নেওয়ার অভিযোগে এক দক্ষিণ এশীয় ব্যক্তির সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও হয়রানি করেন।

এদিকে গবেষকরা বলছেন, এআই এ ধরনের বিদ্বেষমূলক কনটেন্ট তৈরি করা আরও সহজ করে দিয়েছে। যেখানে দক্ষিণ এশীয়দের ‘নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন, যৌন নির্যাতনকারী, সামাজিকভাবে অনগ্রসর বা জনমিতিক হুমকি’ হিসেবে চিত্রায়িত করা হচ্ছে।

প্রতিবেদনটি মূলত অনলাইনে ছড়ানো ঘৃণাত্মক পোস্ট পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হলেও গবেষকরা লিখেছেন, অনলাইনের এই বিদ্বেষ বাস্তব জীবনের বৈরী আচরণ থেকে মোটেও বিচ্ছিন্ন নয়।

উদাহরণ হিসেবে এতে ইউটাহ-র গত জুলাইয়ের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়, যেখানে শপিং মলে কর্মরত এক ভারতীয় মুসলিম কর্মীকে বারবার ছুরিকাঘাত করা হয়—যে ঘটনাটিকে ফেডারেল প্রসিকিউটররা হেট ক্রাইম (ঘৃণাসূচক অপরাধ) হিসেবে অভিযুক্ত করেছেন। পরবর্তীতে সেপ্টেম্বরে, ওয়োমিং-এর একটি ট্রাক স্টপে এক শিখ ট্রাক চালককে ১৭ বার ছুরিকাঘাত করা হয়।

এখনই কেন এমনটা ঘটছে?

প্রতিবেদনে ‘এইচ-১বি’ ভিসা কর্মসূচিকে সংঘাতের এক প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মাধ্যমে মার্কিন নিয়োগকর্তারা দক্ষ বিদেশী কর্মীদের চাকরি দেওয়ার সুযোগ পান। এইচ-১বি ভিসাধারীদের ৭০% বেশি ভারতীয়।

এছাড়া, দক্ষিণ এশীয়দের বিরুদ্ধে ঘৃণা বৃদ্ধির বেশ কয়েকটি সুস্পষ্ট সম্পর্কের কথা তুলে ধরেছেন—যেমন ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে যখন ট্রাম্প কিছু নতুন এইচ-১বি আবেদনের ক্ষেত্রে ১ লাখ ডলারের ফি আরোপ করেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের পদক্ষেপের ফলে ট্রাম্পের সমর্থকদের মাঝে দক্ষিণ এশীয়দের প্রতি বিদ্বেষ আরও বেশি জোরালো ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

প্রতিবেদনে প্রশাসনের দেওয়া বক্তব্যের বিষয়েও সমালোচনা করা হয়েছে। এতে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে একটি এআই শীর্ষ সম্মেলনে ট্রাম্পের দেওয়া ভাষণের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়, যেখানে তিনি ভারতীয়দের কাজ দেওয়ার মাধ্যমে চাকরি ‘আউটসোর্সিং’ করার জন্য মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমালোচনা করেছিলেন।

প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই ধরনের ঘৃণাসূচক বক্তব্য বা পদক্ষেপ মূলত এই ধারণাকেই বেশি উসকে দেয় যে, দক্ষিণ এশীয়রা আদতে ‘বহিরাগত’—যারা কখনই এই দেশকে নিজের ভাবতে পারে না বা এই দেশের অঙ্গ হতে পারে না।

   

About

Popular Links

x