অবরুদ্ধ গাজায় মানবিক পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটছে। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) জানিয়েছে, উপত্যকায় আর মাত্র চার থেকে পাঁচ দিনের খাবার ও চিকিৎসা সামগ্রী মজুত আছে। ডব্লিউএফপি জানায়, ফিলিস্তিনের অঞ্চলটির খাদ্যগুদামে এরই মধ্যে টান পড়েছে। আর দোকানগুলোতে পরিস্থিতি আরও খারাপ।
সংস্থাটির মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক মুখপাত্র আবির ইতেফা কায়রো থেকে ভিডিও লিংকের মাধ্যমে সাংবাদিকদের বলেন, “গাজার পরিস্থিতি প্রতি মুহূর্তে খারাপ হচ্ছে। বিশেষ করে মানবিক ও খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। পাইকারি বিক্রেতাদের কাছে প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের যে মজুত আছে, তা দিয়ে নাগরিকদের দুই সপ্তাহের চাহিদা মিটবে।”
“কিন্তু দোকানগুলোতে মজুত কমে আসছে। হয়ত চার-পাঁচ দিনের খাবার মজুত বাকি আছে।”
এদিকে, হামাস-নিয়ন্ত্রিত গাজায় টানা বিমান হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। পূর্ণ মাত্রায় স্থল আক্রমণের প্রস্তুতি হিসেবে সীমান্তে কয়েক হাজার সৈন্য মোতায়েন করেছে তেল আবিব।
উত্তর গাজার বাসিন্দাদের দক্ষিণে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ইসরায়েল।
আবির ইতেফা বলেন, “জ্বালানি ও নিরাপত্তা সঙ্কটে গাজা উপত্যকায় পাঁচটি ময়দা মিল বন্ধ হয়েছে। এতে রুটির সরবরাহ কমে গেছে। ফলে নাগরিকরা রুটি পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। গাজায় ডব্লিউএফপি পরিচালিত ২৩টি বেকারির মধ্যে মাত্র চারটি চালু আছে। গাজার মধ্যে আমাদের খাদ্য সরবরাহ সীমিত হয়ে পড়েছে।”
তবে এই সঙ্কটের মধ্যেও ফিলিস্তিনের কোনো নাগরিক বা সংস্থা ডব্লিউএফপি পরিচালিত কোনো বেকারিতে হামলা কিংবা লুটপাট করেননি বলেও জানান জাতিসংঘের এই কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, “আমরা গুদামে খুব বেশি খাবার রাখিনি। আর কোথাও কোনো গুদামে লুটপাট হয়নি।”
গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে আকস্মিক হামলা করে হামাস। একযোগে পাঁচ হাজার রকেট ছোড়ে তারা। এর অল্প সময়ের ব্যবধানে পাল্টা আক্রমণ চালায় ইসরায়েল। পাল্টাপাল্টি হামলায় দুই হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
হামাসের এই হামলার জবাবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজা উপত্যকাকে “জনমানবশূন্য দ্বীপে” পরিণত করার হুঁশিয়ারি দেন।
এর মধ্যে সম্ভাব্য স্থল অভিযানের জন্য গাজা সীমান্তে বিপুল অস্ত্রশস্ত্র ও সৈন্য সমাবেশ করেছে ইসরায়েল। এতে গাজায় দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সেই সঙ্গে গাজার বাসিন্দাদের আবারও ভয়ানক মানবিক সঙ্কটের মুখে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ইসরায়েলি বাহিনী হামলায় “সাদা ফসফরাস” ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ করেছে ফিলিস্তিন। এতে মানবিক সংকট ও ঘরছাড়া মানুষের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। হামাস কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, ৭ থেকে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় ২,৭৫০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
এদিকে, ইসরায়েলের হামলায় অবরুদ্ধ গাজায় অন্তত ৪ লাখ ২৩ হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। গাজার ১,৩০০ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী।
জেনেভায় ওসিএইচএর মুখপাত্র জেনস লার্কে বলেন, “সংঘর্ষ অব্যাহত থাকায় আরও বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটতে পারে।”
জাতিসংঘের এই কর্মকর্তা বলেন, “ইসরায়েলি বিমান হামলা গাজাজুড়ে বাসস্থান, স্কুলে আঘাত করেছে। এমনকি তারা বড় টাওয়ার ব্লক, গাজার স্কুল ও আবাসিক ভবনে হামলা চালাচ্ছেন। এতে বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটছে।”
জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক বলেন, “আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে স্পষ্ট বলা আছে, হামলার ঘটনা ঘটলেও তাতে বেসামরিক জনসংখ্যা এবং বেসামরিক বস্তুকে রক্ষা করতে হবে।”
ইউরো-মেড হিউম্যান রাইটস মনিটরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজায় ইসরায়েলি বাহিনী বেসামরিক নাগরিকদের ওপর গণহত্যা চালাচ্ছে। ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গাজার হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসা সহায়তার প্রবেশ নিশ্চিতের জন্য একটি নিরাপদ করিডোর করার আহ্বান জানিয়েছে।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানায়, ইসরায়েলে ও গাজা উপত্যকার আশেপাশে প্রায় ১,৫০০ হামাস যোদ্ধার মরদেহ পাওয়া গেছে। তারা গাজা উপত্যকায় ২০০টিরও বেশি স্থানে আক্রমণ চালিয়েছে।
ইসরায়েলি বিমান হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে গাজার বেসামরিক নাগরিকদের বাসস্থান, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়। এমনকি হাসপাতাল পর্যন্ত রক্ষা পায়নি। ভয়াবহ খাদ্য, চিকিৎসা ও জ্বালানি সংকটসহ মানবিক বিপর্যয়ে পড়েছে ফিলিস্তিনিরা।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েল আবাসিক ভবনে হামলা চালিয়ে কমপক্ষে দুই ফিলিস্তিনি সাংবাদিককে হত্যা করেছে। এদিকে ইসরায়েল-লেবানন সীমান্তে ইসরায়েল লেবানিজ সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যেও পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছে, লেবানন সীমান্তের সংঘাতে হিজবুল্লাহর ব্যবহৃত অস্ত্র উন্নত মানের হওয়ায় ইসরায়েলের জন্য এটি হুমকির কারণ হবে। হিজবুল্লাহ দীর্ঘ সময় ধরে বহু যুদ্ধে জড়িয়েছে। তাদের কাছেও হাজার হাজার রকেট মজুত রয়েছে।
গাজার পরিস্থিতি খারাপ হলে ওই অঞ্চলে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া আসবে তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন অনেকেই।



