Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

পুতিনের কট্টর সমালোচক কে এই নাভালনি

রাশিয়ায় প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কড়া সমালোচক অ্যালেক্সি নাভালনি কারাগারে বন্দি অবস্থায় মারা গেছেন

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০২:৩৯ পিএম

পত্রিকা ও ব্লগে লেখা থেকে শুরু। নিয়ন্ত্রিত রুশ প্রশাসনের হাঁড়ির খবর বাইরে আনতে আনতে পৌঁছে যান সাধারণ মানুষের মনিকোঠায়। লৌহ কঠিন পুতিনের ভিতেও কড়া নাড়তে থাকেন। জানান দিতে থাকেন, “বিনা যুদ্ধে নাহি দেবো, সূচাগ্র মেদিনী।” প্রকাশ্যেই পুতিনকে গালমন্দ করেছেন। বলেছেন, “জোচ্চোর”, “স্বৈরাচার”। এজন্য মাশুলও গুণতে হয়েছে। নার্ভ গ্যাসে মৃত্যুর দুয়ারে গিয়েও বেঁচে গিয়েছেন। জেল খেটেছেন বহুবার। ফিরে এসে আবার বলেছেন, “জনতার কথা”। তবে শেষ রক্ষা হলো না। প্রাণের বিনিময়ে চোকাতে হলো, প্রতিবাদের ভাষা। শুক্রবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) আকস্মিক জানা গেল, রাশিয়ার কারাগারে মৃত্যু হয়েছে পুতিনের সবচেয়ে বড় সমালোচনা আ্যলেক্সেই নাভালনির।

ব্যক্তিজীবনে আইনজীবী ছিলেন নাভালনি। তরুণ বয়স থেকেই ছিলেন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে। ২০০৭ সালে শুরু করেন দুর্নীতি বিরোধী প্রচারণা। ২০০৮ সালের দিকে সরকারের দুর্নীতি প্রকাশের মধ্য দিয়ে নাভালনির নাম রাজনীতিতে উঠে আসে।  ওই সময়, পুতিনের ইউনাইটেড রাশিয়া দলকে “অসৎ ও চোরদের” দল বলে প্রচারণা চালান তিনি।

অ্যালেক্সেই নাভালনি/এএফপি

২০১১ সালে রাশিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচনে পুতিন কারচুপি করেছেন এমন অভিযোগ তোলায় নাভালনিকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৫ দিন আটক ছিলেন সেবার।

আবার গ্রেপ্তার হন ২০১৩ সালে। তবে জেল জীবন সেবারও ছিল সংক্ষিপ্ত। ওই বছর মস্কোর মেয়র পদে ভোটে দাঁড়িয়ে ২৭% ভোট পান। এসবের মধ্য দিয়ে রুশ জনগণের মধ্যে একটি অবস্থান গড়ে ওঠে নাভালনির। নির্যাতন নিপীড়নের মধ্য দিয়ে হয়ে ওঠেন জনপ্রিয়।

এই জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে ২০১৮ সালে অংশ নেন পার্লামেন্ট নির্বাচনে। তাও একেবারে পুতিনের পদেই। যদিও শেষমেস তার প্রার্থীতা বাতিল হয়। নাভালনি অভিযোগ করেন, “রাজনৈতিক উদ্যেশ্য প্রণোদিতভাবে তার প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে।”

২০১৯ সালে তাকে আবারও কারাগারে পাঠানো হয়। অভিযোগ ছিল, “অনুমতি না নিয়ে প্রতিবাদী বিক্ষোভ করা।”

কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়েন নাভালনি। কারা চিকিৎসকরা সেসময় বলেছিলেন, “কোনো কিছুর স্পর্শ থেকে চামড়ায় প্রদাহ হয়েছে তার।”

তবে নাভালনি ও তার চিকিৎসক বলেছিলেন, কোনো বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শে আসায় এ আঘাত পেয়েছেন তিনি। অভিযোগের তীর ছিল পুতিন প্রশাসনের বিরুদ্ধে।

নাভালনি ইস্যুতে বড় হইচই তৈরি হয় ২০২০ সালে। টোমস্ক থেকে মস্কোয় ফেরার সময় ফ্লাইটে অসুস্থ হয়ে পড়েন নাভালনি। বিমান ওমস্ক শহরে জরুরি অবতরণ করে।

নাভালনির প্রতিষ্ঠিত দুর্নীতি বিরোধী সংস্থার প্রধান কিরা ইয়ারমিশ দাবি করেন, নাভালনির চায়ের সঙ্গে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে।

নাভালনি কোমায় চলে যান সেই ঘটনায়। ভেন্টিলেটরে রাখা হয় তাকে। কিন্তু অবস্থার উন্নতি না হলে নেওয়া হয় জার্মানির বার্লিনে। সেখান ধীরে ধীরে সেরে ওঠেন তিনি।

বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা নিরিক্ষার পর জানান, নাভালনিকে রাশিয়ান নার্ভ এজেন্ট “নোভিচক” প্রয়োগ করা হয়েছিল। রাসায়নিক হামলার জন্য পুতিনকে দায়ী করেন নাভালনি। যদিও পুতিন তা অস্বীকার করেন।

জীবন ফিরে পেলেও নাভালনি রাশিয়ায় ফিরুক, তা চায়নি ক্রেমলিন। এমনকি রুশ কর্তৃপক্ষ বলেছিল, মস্কোয় ফিরলেই জেলে যেতে হবে তাকে।

২০২১ সালের ১৭ জানুয়ারি দেশে ফিরে আসেন নাভালনি। বিমানবন্দরেই গ্রেপ্তার করা হয় তাকে। থানাতেই আদালত বসিয়ে ৩০ দিনের আটকাদেশ দিয়ে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। ২০২৩ সালের আগস্টে সন্ত্রাসবাদ ও জালিয়াতির অভিযোগে তাকে ১৯ বছরের কারাদণ্ড দেয় রাশিয়ার আদালত।

পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার নাভালনি/এএফপি

শুক্রবার কারাগারে হাঁটাহাঁটির পর অসুস্থ হয়ে জ্ঞান হারানোর পর বহু চেষ্টায় জ্ঞান ফেরেনি তার। সাইবেরিয়ার কারাগারেই মৃত্যু হয় তার। মৃত্যুকালে স্ত্রী ইউলিয়া নাভালনায়া ও দুই সন্তান রেখে গেছেন নাভালনি।

দেশজুড়ে দুর্নীতি বিরোধী ও জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে জনপ্রিয়তা ছিল নাভালনির। তবে রুশ প্রশাসন তাকে বর্ণনা করত পশ্চিমা এজেন্ট হিসেবে। অভিযোগ ছিল, মার্কিন গোয়েন্দাদের সঙ্গে নিয়মিত সম্পর্ক রেখে চলেন তিনি।

রাশিয়ার মানবাধিকার আইনজীবী ও কলাম লেখক আমান্ডা টবের মতে, নাভালনি রাশিয়ার অন্য রাজনীতিবিদের মতো নন। তিনি অন্যদের চেয়ে ভিন্ন প্রকৃতির রাজনীতিবিদ। তিনি সত্যিকারের বিরোধী নেতা। যার তৃণমূলে সমর্থন আছে। সবকিছু মিলিয়ে নাভালনি পুতিনের জন্য সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ ছিলেন।

তবে নাভালনির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সেই ভয় থেকে আপাতত কিছুটা বাঁচলেন পুতিন। তবে নাভালনির ওপর সরকারি নির্যাতন-নিপীড়ন নিয়ে বহু আন্দোলন করেছেন তার সমর্থকরা। এখন দেখার বিষয়, নেতার মৃত্যুতে কতটা সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারেন তার উত্তরসূরিরা।

   

About

Popular Links

x