কাউকে ভালো লাগে, তার সঙ্গে নিয়মিত কথা হয়, একসঙ্গে সময় কাটাতেও ভালো লাগে। কিন্তু সম্পর্কের পরিচয় কী, তা নিয়ে দুজনের কেউই নিশ্চিত নন। একজন মনে মনে সম্পর্কটিকে পরিণতির দিকে নেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন, অথচ অন্যজন এখনও সিদ্ধান্তহীন? ভালো লাগা থাকলেও প্রতিশ্রুতি নেই, আবার সম্পর্কের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এমন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? সম্পর্কের এই অনিশ্চিত অবস্থাকেই বলা হয় ‘মেবিলেশনশিপ
ইংরেজি ‘মেবি’ (Maybe) অর্থাৎ ‘হয়তো’ এবং ‘রিলেশনশিপ’ (Relationship) অর্থাৎ ‘সম্পর্ক’ - এই দুই শব্দের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে নামটি। সহজভাবে বললে, এমন সম্পর্ক যেখানে দুজনের মধ্যে ভালো লাগা বা আবেগ থাকলেও সম্পর্কটি শেষ পর্যন্ত প্রেমের সম্পর্কে রূপ নেবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। তবে মেবিলেশনশিপ কোনো স্বীকৃত ধারণা নয়। সম্পর্কের ধরন ও অভিজ্ঞতা ব্যাখ্যা করতে ব্যবহৃত নতুন একটি শব্দ।
কেন জড়িয়ে পড়েন এমন সম্পর্কে
মেবিলেশনশিপে জড়িয়ে পড়ার পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। পড়াশোনা, ক্যারিয়ার গঠন কিংবা পারিবারিক প্রত্যাশার কারণে কেউ হয়তো এখনই দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কে জড়াতে চান না। অন্যদিকে, কাউকে ভালো লাগলে তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখা বা সময় কাটানোর আগ্রহও তৈরি হতে পারে। এই দুই অবস্থার টানাপোড়েনে সম্পর্কটি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
আগের কোনো সম্পর্কে কষ্ট পাওয়ার অভিজ্ঞতাও নতুন সম্পর্কে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধা তৈরি করতে পারে। কাউকে পছন্দ করলেও আবার আঘাত পাওয়ার ভয় থেকে অনেকে সিদ্ধান্ত নিতে সময় নেন। তারা হয়তো নতুন সম্পর্কের সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করতে চান না, আবার দ্রুত কোনো প্রতিশ্রুতিও দিতে চান না।
কখনো দুজনের চাওয়া-পাওয়ার পার্থক্যও এর কারণ হতে পারে। একজন সম্পর্কটিকে স্পষ্ট পরিচয় দিতে চাইতে পারেন, অন্যজন হয়তো আরও কিছুদিন একে অপরকে বুঝে নিতে চান। একজন ভবিষ্যতের কথা ভেবে অপেক্ষা করেন, আরেকজন সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সময় চান। এভাবে সম্পর্কের সম্ভাবনা থাকলেও তা বাস্তব রূপ পায় না।
কারা জড়াচ্ছেন মেবিলেশনশিপে
মেবিলেশনশিপকে শুধু জেন-জির অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে তরুণদের মধ্যে সম্পর্কের পরিচয়, প্রতিশ্রুতি ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনার সঙ্গে এই ধারণার সম্পর্ক আছে।
বিশেষ করে শিক্ষাজীবনের শেষ পর্যায়ে থাকা তরুণ-তরুণী কিংবা নতুন কর্মজীবনে প্রবেশ করা ব্যক্তিরা জীবনের পরবর্তী ধাপ নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকতে পারেন। পড়াশোনা শেষ করা, ক্যারিয়ার গুছিয়ে নেওয়া কিংবা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ঠিক করার মতো বিষয়গুলো তাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। এ সময় কাউকে পছন্দ করলেও দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কে জড়ানোর জন্য তারা প্রস্তুত না-ও থাকতে পারেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও সম্পর্কের এমন অভিজ্ঞতা প্রকাশ ও ব্যাখ্যা করার একটি জায়গা হয়ে উঠেছে। সম্পর্কের বিভিন্ন ধরন বোঝাতে নতুন নতুন শব্দের ব্যবহার বাড়ছে। তবে মেবিলেশনশিপে থাকা প্রত্যেকেই যে সচেতনভাবে এমন সম্পর্ক বেছে নেন, তা নয়। কেউ সম্পর্কের অনিশ্চয়তা মেনে নিয়ে এগিয়ে যান, আবার কেউ ভবিষ্যৎ নিয়ে স্পষ্ট উত্তর না পেয়েও অপেক্ষা করতে থাকেন।
এ ধরনের সম্পর্কে কোন বয়সী মানুষেরা সবচেয়ে বেশি জড়ান, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই। তাই একে নির্দিষ্ট কোনো প্রজন্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখার সুযোগ নেই।
মেবিলেশনশিপ আর সিচুয়েশনশিপ কি এক?
সম্পর্কের অনিশ্চিয়তা বোঝাতে ‘সিচুয়েশনশিপ’ (Situationship) শব্দটিও বেশ পরিচিত। দুটি ধারণার মধ্যে মিল থাকায় অনেকেই এগুলোকে একই অর্থে ব্যবহার করেন। তবে ধারণাগত কিছু পার্থক্য রয়েছে।
সিচুয়েশনশিপ বলতে সাধারণত এমন সম্পর্ক বোঝায়, যেখানে দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বা টান থাকলেও সম্পর্কটির পরিচয় ও প্রতিশ্রুতি স্পষ্ট নয়। তারা একে অপরের কাছের মানুষ হলেও সম্পর্কের কোনো নাম দিতে পারে না।
অন্যদিকে, মেবিলেশনশিপে সম্পর্কটি ভবিষ্যতে পূর্ণতা পেতে পারে - এমন সম্ভাবনার থাকে। দুজনের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠার আগ্রহ থাকতে পারে, কিন্তু তারা এখনই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না। ‘এখন নয়, পরে’ কিংবা ‘আরও কিছুদিন সময় দাও’ - এমন অবস্থানের মধ্যে সম্পর্কটি আটকে থাকে।
তবে এই দুই ধরনের সম্পর্কের সীমারেখা সব সময় স্পষ্ট নয়। একই সম্পর্কে সিচুয়েশনশিপের অনিশ্চয়তা এবং মেবিলেশনশিপের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা - দুই বৈশিষ্ট্যই থাকতে পারে।
অনিশ্চয়তারও কি সীমা থাকা প্রয়োজন
সম্পর্কের শুরুতে সিদ্ধান্ত নিতে সময় চাওয়া অস্বাভাবিক নয়। একে অপরের স্বভাব, মূল্যবোধ, প্রত্যাশা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বোঝার জন্য সময় প্রয়োজন। কিন্তু সেই অপেক্ষা যখন দীর্ঘ হয় এবং সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো স্পষ্টতা আসে না, তখন তা মানসিক চাপের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে একজন যখন সম্পর্কটিকে স্থায়ী রূপ দিতে চান, অন্যজন বারবার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিলে অপেক্ষায় থাকা ব্যক্তির মনে নানা প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। সম্পর্কটি কি আদৌ পরিণতির দিকে এগোচ্ছে, নাকি একজনের প্রত্যাশার ওপর ভর করেই টিকে আছে - এমন সংশয় দেখা দিতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ। দুজনের প্রত্যাশা কী, কে কতটা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে প্রস্তুত এবং সম্পর্কটি কোন দিকে এগোতে পারে - এসব বিষয়ে স্পষ্টভাবে কথা বলা প্রয়োজন। একজনের সময় চাওয়ার অধিকার যেমন আছে, তেমনি অন্যজনেরও নিজের চাওয়া ও অনুভূতি সম্পর্কে স্পষ্ট উত্তর পাওয়ার প্রত্যাশা থাকতে পারে।
দুজন একই সময়ে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছাবেন, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। তবে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুজনের কি মতামত, তা বোঝার চেষ্টা করা প্রয়োজন।
সবশেষে, অনিশ্চয়তাকে সময় দেওয়া আর নিজের অনুভূতি উপেক্ষা করে অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করা এক বিষয় নয়। সম্পর্কটি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা এখনই নিশ্চিত না-ও হতে পারে। কিন্তু সেই অনিশ্চয়তার মধ্যে দুজনের চাওয়া-পাওয়া, অনুভূতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি।



