Thursday, October 08, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

প্রথম পর্ব: সংখ্যা যা লুকিয়ে রাখে

কাঁটাতারের খরচও জিডিপিতে যোগ হয়

চার দশকের বেশি সময় ধরে গান লিখছি। একজন গীতিকবি জানেন, কথা যতো ভালোই হোক, মানুষের কানে পৌঁছাতে তার একটা পথ লাগে। সেই পথ অল্প কয়েকজনের হাতে চলে গেলে কার কথা শোনা যাবে, সেই সিদ্ধান্তও তাদের হাতেই চলে যায়। গ্রামের একজন নারী কারিগর বা একজন পোশাকশ্রমিকের কথা নীতির টেবিলে পৌঁছানোর পথ তাই আরও সরু হচ্ছে। জিডিপির হিসাবে এই ক্ষতি কোথাও ধরা পড়ছে না

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০৯ পিএম

দু’টি গ্রামের কথা ভাবুন। দুটিরই বছরে মোট উৎপাদন ১০০ টাকা। প্রথম গ্রাম পুরো ১০০ টাকাই খরচ করে খাবার, স্কুল, চিকিৎসা আর উৎসবে। দ্বিতীয় গ্রাম ৫০ টাকা খরচ করে কাঁটাতার, ফটক আর পাহারাদারে, যাতে বাকি ৫০ টাকার সম্পদ কেউ কেড়ে নিতে না পারে। খাতায় দুই গ্রামের জিডিপি সমান। কিন্তু কোনো গ্রামে আপনি থাকতে চাইবেন সে প্রশ্নের উত্তর দিতে অর্থনীতিবিদ লাগে না।

উদাহরণটি দিয়েছিলেন অধ্যাপক কৌশিক বসু, সাজিদা ফাউন্ডেশন আয়োজিত সৈয়দ হুমায়ুন কবির স্মারক গবেষণা সিম্পোজিয়াম ২০২৬-এ। এবারের বিষয় ছিল 'ন্যায্যতা, সামর্থ্য ও কল্যাণ: আরও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশের জন্য মানব উন্নয়নকে নতুন করে ভাবা'। শ্রোতার আসনে বসে সারাদিন মনে হচ্ছিল, শব্দগুলো আমাদের নীতির ভাষায় যতটা আছে, কাজের হিসাবে কি ততোটা আছে?

আয়োজকের গড়ন

আলোচনায় ঢোকার আগে আয়োজক প্রতিষ্ঠানটির গঠন নিয়ে দু'কথা বলা দরকার, কারণ বিষয়ের সঙ্গে সেটির সরাসরি সম্পর্ক আছে। রেনাটা পিএলসি দেশের বড় ওষুধ কোম্পানিগুলোর একটি, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত, কর্মী প্রায় এগারো হাজার। এই কোম্পানির ৫১% শেয়ারের মালিক সাজিদা ফাউন্ডেশন, বাকি ৪৯% স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের হাতে।

সম্পর্কটা তাই উল্টো। কোম্পানি ফাউন্ডেশন চালায় না, ফাউন্ডেশনই কোম্পানির মালিক। লভ্যাংশ ব্যক্তির হাতে জমা না হয়ে ফিরে আসে জনকল্যাণের কাজে, বছরের পর বছর, কারও ব্যক্তিগত ইচ্ছার ওপর নির্ভর না করে।

পৃথিবীতে এই ধরনের কাঠামো বিরল। ডেনমার্কে নভো নরডিস্ক, কার্লসবার্গ আর মার্স্ক এভাবেই চলে, দেশটির শেয়ারবাজারের প্রায় অর্ধেক মূলধনই ফাউন্ডেশন-মালিকানাধীন কোম্পানির। জার্মানিতে বশ, সুইডেনে আইকিয়া, ভারতে টাটা। বাংলাদেশে এমন উদাহরণ আমার চোখে পড়েছে একটিই, আর সেটি চলছে ১৯৯৩ সাল থেকে।

কীভাবে সেটি সম্ভব হলো, সে গল্প দ্বিতীয় পর্বে। আপাতত এটুকু মাথায় রাখলেই হবে যে সারাদিনের আলোচনাটি হচ্ছিল এমন একটি প্রতিষ্ঠানের মঞ্চে, যেটি নিজেই প্রমাণ করে জিডিপির বাইরে গিয়ে ভাবা যায়।

এক অস্বস্তিকর সময়

বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ, এখন কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কৌশিক বসু শুরু করলেন সময়ের চাপ দিয়ে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে, আর মোট আয়ে শ্রমিকের ভাগ ক্রমশ কমছে। বৈষম্যও বাড়ছে। তবে তিনি জোর দিলেন একটি সূক্ষ্ম জায়গায়। এটা গড়পড়তা ধনী-গরিবের ফারাক নয়, জনসংখ্যার শীর্ষ ০.১% এর সঙ্গে বাকি সবার ব্যবধান।

তার মতে, আমরা সম্ভবত শিল্পবিপ্লবের মতোই বড় এক রূপান্তরের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। সেই বিপ্লবের প্রথম পঞ্চাশ-ষাট বছর শিশুশ্রম, বারো ঘণ্টার কাজ আর দূষণকে স্বাভাবিক ধরা হতো। অবস্থা বদলেছিল ধীরে, মূলত সমাজকর্মী ও আন্দোলনকারীদের চাপে। 

বসু মনে করেন, একদিন মানুষ আজকের বৈষম্যের দিকে সেভাবেই তাকাবে, যেভাবে আমরা আজ দাসপ্রথার দিকে তাকাই। তখন প্রশ্ন উঠবে, এটা কী করে মেনে নেওয়া হয়েছিল।
আমাদের কণ্ঠস্বরও কেনা যায়!

বসুর যে কথাটি আমাকে সবচেয়ে ভাবিয়েছে, তা হলো ‘কণ্ঠস্বরের বৈষম্য’। অতি ধনীরা এখন সংবাদপত্র আর সংবাদমাধ্যম কিনছেন, সম্পদকে রূপান্তর করছেন প্রভাবে। টাকার বৈষম্য তখন মতের বৈষম্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সমাজের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে সেখানেই।

চার দশকের বেশি সময় ধরে গান লিখছি। একজন গীতিকবি জানেন, কথা যতো ভালোই হোক, মানুষের কানে পৌঁছাতে তার একটা পথ লাগে। সেই পথ অল্প কয়েকজনের হাতে চলে গেলে কার কথা শোনা যাবে, সেই সিদ্ধান্তও তাদের হাতেই চলে যায়। গ্রামের একজন নারী কারিগর বা একজন পোশাকশ্রমিকের কথা নীতির টেবিলে পৌঁছানোর পথ তাই আরও সরু হচ্ছে। জিডিপির হিসাবে এই ক্ষতি কোথাও ধরা পড়ছে না।

সিম্পোজিয়ামেই এর একটি নিখুঁত উদাহরণ পাওয়া গেল। আইসিডিডিআরবির ইমেরিটাস বিজ্ঞানী ডা. ফেরদৌসী কাদরী জানালেন, দেশে এখন একটি জাতীয় কলেরা নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা আছে, কিন্তু সেটি নিয়ে কেউ কথা বলতে চায় না। কারণ কলেরা দারিদ্র্যের প্রতীক। যে সূচক আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে, সেটিকে আমরা আলোচনার বাইরে রাখি। জিডিপির সমস্যাটাও ঠিক এখানেই। যা মাপা হয় না, তা নিয়ে কথাও হয় না।

আয় দিয়ে সামর্থ্য মাপা যায় না

অধ্যাপক রেহমান সোবহান বসুর বক্তব্যকে জুড়ে দিলেন সামর্থ্য-তত্ত্বের সঙ্গে, যে আবহে অমর্ত্য সেনের ছাত্র বসু বড় হয়েছেন। এই তত্ত্বের মূল কথা, শুধু আয়ের হিসাব দিয়ে মানুষের অক্ষমতা বোঝা যায় না। অধ্যাপক রেহমান সোবহান অবশ্য একটি সতর্কতাও দিলেন। দার্শনিক প্রস্তাব হিসেবে এটি চমৎকার, কিন্তু মাঠে প্রয়োগ করতে গেলেই চ্যালেঞ্জ শুরু হয়। তার চোখে এর কার্যকর উদাহরণ ডেনমার্কসহ কয়েকটি দেশের সামাজিক গণতান্ত্রিক মডেল, যেখানে মানসম্মত শিক্ষা আর স্বাস্থ্যসেবা সবার জন্য প্রযোজ্য।

বাংলাদেশের অগ্রগতির পেছনে বসু নারীর ক্ষমতায়ন আর এনজিওগুলোর সক্রিয়তাকে বড় করে দেখেছেন। মাথাপিছু আয়ে পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে যাওয়ার কথাও মনে করিয়ে দিলেন। 
এসিক্স বাংলাদেশের ((ASIX Bangladesh) মাধ্যমে আমরা এখন চৌদ্দশ'র বেশি নারী কারিগরের সঙ্গে কাজ করি। তাদের একজন বগুড়ার তালোরার শিপু। তার স্বামী মারা গেছেন বছর দুই হলো সড়ক দুর্ঘটনায়।

এসিক্স তার নিয়মিত আয় নিশ্চিত করায় এখন তার বাড়িটি পাকা হয়েছে, বাচ্চারা স্কুলে যাচ্ছে, শাশুড়ির চিকিৎসা খরচ মেটানো যাচ্ছে আর ওর মাধ্যমে আরও প্রান্তিক মহিলার কর্মসংস্থান হচ্ছে, আসছে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, জীবনমানের উন্নতি। কিন্ত এদের প্রত্যেকের যা এখনও বদলায়নি তা হলো তাদের পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থান, স্বীকৃতি এবং পুরুষ শাষিত সমাজে তাদের স্বতন্ত্র কন্ঠস্বর।

মাঠের শিক্ষাটা অধ্যাপক সোবহানের সতর্কতার সঙ্গেই মেলে। আয় একজন নারীকে দরজা পর্যন্ত নিয়ে আসে। দরজাটা খুলবে কি না, তা নির্ভর করে পরিবারে তার সিদ্ধান্তের জায়গা কতটুকু, আর সন্তানের স্কুল বা অসুখের চিকিৎসা হাতের কাছে মিলছে কি না তার ওপর। টাকা আর স্বাধীনতা এক জিনিস নয়।

সংশোধনের প্রস্তাব

বসুর ব্যাখ্যায়, জাতিসংঘের 'বিয়ন্ড জিডিপি' ভাবনা জিডিপিকে বাতিল করতে চায় না, সংশোধন করতে চায়। প্রথমে দেখতে হবে আয় কীভাবে বণ্টন হচ্ছে। তারপর আসে টেকসই এর প্রশ্ন, আর শেষে মানুষের কল্যাণ। এসব শিরোনামের নিচে আছে ৩১টি উপাদান। অধ্যাপক রেহমান সোবহানও একই সুরে বললেন, জিডিপি সর্বোচ্চ করার বদলে মানুষের কল্যাণ বাড়ানোর নানা পথ খুঁজতে হবে।

বাংলাদেশের শিল্পনীতিতে এই ভাবনা কাজে লাগানোর সুযোগ আছে। পাট ও হস্তশিল্পের মতো খাতে আমরা সাধারণত রপ্তানির অঙ্ক দিয়ে সাফল্য মাপি। যে হাতে পণ্যটি তৈরি হলো, আয়ের কতোটা সেই হাতে থাকছে? পাটের মতো পরিবেশবান্ধব পণ্য প্লাস্টিকের যে ক্ষতি ঠেকাচ্ছে, সেটা কি আমাদের হিসাবে আসছে? রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রার পাশে কারিগরের আয় আর পরিবেশগত সুফলের হিসাবও রাখা গেলে নীতি নিজে থেকেই বিয়ন্ড জিডিপির দিকে এগোবে।

প্রতিষ্ঠানের ভেতরেও একই হিসাব খাটে। বিক্রি আর মুনাফার সংখ্যা ধরে রাখতে গিয়ে কর্মীদের ক্লান্তি আর অবিশ্বাস যদি বাড়ে, সেটাও ওই দ্বিতীয় গ্রামের কাঁটাতারের খরচ। খাতায় লাভ দেখা যায়, ভেতরে ক্ষয় চলতে থাকে। অ্যাচিভ কন্সাল্টিং এ পরামর্শক হিসেবে আমরা তাই সক্ষমতা আর কল্যাণকে কৌশলেরই অংশ হিসেবে দেখি, আলাদা কোনো সৌজন্য হিসেবে নয়।

বাজেটের ভেতরের দ্বিতীয় গ্রাম

সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সৈয়দুজ্জামান আলোচনাটিকে নামিয়ে আনলেন রাজস্বের মাটিতে। সংবিধানের ৯ থেকে ২০ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের দায়িত্ব স্পষ্ট করে বলা আছে। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের টাকা আসবে কোথা থেকে? তার পর্যবেক্ষণ, কর-জিডিপি অনুপাত না বাড়ালে জনকল্যাণে খরচের জায়গা তৈরি হয় না, অথচ কোনো রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে এই অনুপাতের কথা কখনো আসেনি। তিনি আরও বললেন, “পরোক্ষ করের বোঝা প্রত্যক্ষ করের চেয়ে বেশি হওয়া উচিত নয়। অগ্রাধিকার হওয়া উচিত জীবনমানের উন্নতি।”

কথাটা শুনতে শুনতে বাজেটের পাতায় চোখ বোলালাম, আর একটু থমকে গেলাম। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ প্রায় ৪০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। গোটা স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ ৪১, ৯০০ কোটি। অর্থাৎ দেশ নিজেকে পাহারা দিতে যা খরচ করে, নাগরিকের চিকিৎসায় খরচ করে প্রায় ততটাই। প্রতিরক্ষা আর স্বরাষ্ট্র একসঙ্গে ধরলে অঙ্কটা স্বাস্থ্যের প্রায় দ্বিগুণ, মোট বাজেটের ৯% এর বেশি।

বসুর দ্বিতীয় গ্রাম তখন আর উপমা থাকে না। কাঁটাতার, ফটক আর পাহারাদার একটি জাতীয় বাজেটের লাইন হয়ে যায়।
এখানে একটা কথা পরিষ্কার করে বলা দরকার। প্রতিরক্ষা অপ্রয়োজনীয় নয়, আর স্বাস্থ্যের বরাদ্দ বাড়ালেই সেবা ভালো হয়ে যাবে তেমনও নয়। প্রশ্নটা অনুপাতের। একটি রাষ্ট্র তার সীমিত টাকায় কোনটাকে আগে রাখছে, সেই পছন্দের ভেতরেই তার ভবিষ্যৎ লেখা থাকে।

প্রমাণ থেকে কাজে

প্রত্যেকে নিজের স্বার্থে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত নিলেও সবাই মিলে খারাপ ফল পেতে পারে। অর্থনীতিতে একে বলে প্রিজনার্স ডিলেমা। অধ্যাপক বসুর শেষ কথা ছিল, এই ফাঁদ থেকে বের হতে শুধু ব্যক্তির সদিচ্ছা যথেষ্ট নয়। দরকার একটি যৌথ নৈতিক এজেন্ডা, আর তার পেছনে গুরুতর বুদ্ধিবৃত্তিক পরিশ্রম।

সাজিদা ফাউন্ডেশন গবেষণা আর মাঠের কাজকে এক টেবিলে আনছে, এটা আশার কথা। তবে প্রমাণ অর্থবহ হয় তখনই, যখন তা কাজে রূপ নেয়। ব্যবসায়ী, নীতিনির্ধারক, উন্নয়নকর্মী, আমাদের প্রত্যেকের হাতে নিজের একটা ছোট জিডিপি আছে। প্রশ্ন হলো, তার কতটা আমরা কাঁটাতারে খরচ করছি।

 

আসিফ ইকবাল, প্রতিষ্ঠাতা, অ্যাচিভ কনসাল্টিং; সহপ্রতিষ্ঠাতা, ASIX বাংলাদেশ; খণ্ডকালীন শিক্ষক, আইবিএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং গীতিকবি

প্রকাশিত মতামতটি লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।
   

About

Popular Links

x