Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

কোরবানি প্রসঙ্গ

কায়দা করে বাঁচার সময় এখন। কিন্তু এ বাঁচা কি শিরদাঁড়া উঁচু করে? না কি মরি মরি বেঁচে থাকা? খুব সামনেই এর উত্তর মিলবে। তবু অস্তিত্ব রক্ষায় মানুষ লড়বে। ফসলবিহীন মন কাঁদালেও এ প্রজাতি লড়তে জানে

আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২২, ১২:০৯ পিএম

সর্বদা গতিশীল জীবনে ঈদ যেন এক ফুলস্টপ। ছেদ পড়ে শহরের গতিতে। আবার মুখরতার অপেক্ষায় একটু দম নেওয়া।

রোজার ঈদের সাথে কোরবানির ঈদে তফাৎ অনেক। এ সময় প্রাধান্যে থাকে কোরবানির পশু আর হাট। “গরু ছাগলের বিরাট হাট” না-কি “বিরাট গরু ছাগলের হাট” তা অস্পষ্ট হাটের প্রচারণায়। তবু সামর্থ্যবানরা হাটে যান। শিশু কিশোরদের চঞ্চলতা এ ঈদের বেশি। “ভাই, গরু কত?” ডাকের উত্তর দিতে দিতে ক্লান্ত হন না হাটফেরত তারা।

শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মারাত্মক গলদ দৃশ্যমান হয় কোরবানির ঈদে। যদিও এবারও পবিত্র ঈদ-উল-আজহার দিন রাত ১০টার মধ্যে কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণ করা হবে বলে সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী। নগরপিতারাও এ ধরনের কথা বলে থাকেন। যদিও বাস্তবে আমরা তা দেখিনা। বরং জবাইকৃত পশুর বর্জ্যের দুর্গন্ধে অনেক রাস্তায় হাঁটা যায় না। 

কোরবানির সময় অনেক মৌসুমি কসাইয়ের আগমন ঘটে। সারা বছরের অন্য পেশাজীবীরা ধারালো অস্ত্র আর পাটি নিয়ে জন্য কসাই সেজে বসেন। একটু বাড়তি আয়ের আশায় তাদের এমন একদিনের পেশা বেছে নেওয়া।

জনপদের বিরাজমান সংস্কৃতির অনেক কিছু প্রতিফলিত হয় কোরবানিতে। এবার বহুল আলোচিত “পদ্মা সেতু” নামে গরু উঠেছে হাটে। ঢাকাই ছবির সিনেমার বাইরে নানা কিছুতে আলোচিত নায়ক “জায়েদ খান” এর নামেও গরুর নামকরণ হয়েছে। পশু নিয়ে এমন বিনোদনে এখর মুখর চারপাশ।

এবার কিছু পরিসংখ্যানে যাই। 

গণমাধ্যমে খবর পাই, “আসন্ন ঈদ-উল-আজহার জন্য দেশে সম্ভাব্য পশুর চাহিদা ছিল ৯৮ লাখ। তবে চাহিদার বিপরীতে কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে এক কোটি ২২ লাখ পশু। কোরবানির জন্য প্রস্তুত থাকা পশুগুলোর মধ্যে গরুর সংখ্যা ৫৫ লাখ, যা সম্ভাব্য চাহিদার চেয়ে পাঁচ লাখ বেশি। ২০২১ সালে কোরবানির জন্য ৪৬ লাখ গরু থাকলেও তার মধ্যে ৮ লাখ অবিক্রিত থেকে গিয়েছিল। অন্যদিকে, ২০২০ সালে কোরবানির জন্য ৫৫ লাখ গরু ছিল। সেখান থেকে বিক্রি হয়েছিল ৪৬ লাখ।” 

তবে সংবাদমাধ্যমে এই অবিক্রিত পশুর সংখ্যা নিয়ে তেমন আলোচনা হয় না। নিউজ টিভির পর্দায় বড় বড় গরু দেখানো হয়। যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে চাহিদা বেশি ছোট ও মাঝারি গরুর। অবিক্রিতদের বিষয় অনেকটা যেন নেপথ্যেই থাকে।  

মনের পশু জবাইয়ের প্রতীকী উদযাপন এই ঈদ-উল-আজহা। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তা কেবল আমিষভোজের উৎসবে পরিণত হয়। প্রতিযোগিতা চলে কার গরুর কত বড়, কত দামী?- এ নিয়ে। দরিদ্রদের মাংস বিলিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে চলে ডিপফ্রিজে সারা বছর খাওয়ার জন্য মাংস সংরক্ষণ। এগুলো ইবাদতের মূল দর্শন থেকে আমাদের সরে আসাকে উন্মোচন করে।  

ঈদের শুরু আর শহরবাসীর ঢাকা ছাড়ার প্রস্তুতি চলে সমান তালে। উৎসবে এ শহরটি জনশূন্য হয়ে পড়ে। ‍‍‘‍‍‘জ্যাম নেই, জ্যাম নেই’’ আওয়াজে অনেকের উল্লাস। ঢাকা যেন এক বৃহৎ ইপিজেড। মাইনে হলেই এ শহর ছাড়তে হবে। উৎসবে জনশূন্য নগর প্রমাণ করে তো এই। এটি টাকা কামানোর জায়গা। প্রাণ মেলানো এখানে চলে না। রাজধানীর আপনজন নেই। ঈদের শহর ফাঁকা এতিম হয়ে সে দৃষ্টান্ত দেখায়।

যারা ঈদে শহর ছাড়বেন তাদের দোষ কী? এ ফেরা তো দম নেওয়ার জন্যই। মাকে দেখা, বাবাকে দেখা। গতবার লাগানো নিম গাছটা ছোঁয়া। কোভিড স্বাস্থ্যবিধি উড়ে পালাবে মায়ের বুকের কাঠালচাঁপা ঘ্রাণের টানে।

রিকশাচালকেরা ঈদে খুব খুশি। সব রাস্তায় চলা যায়। ভিআইপি, সিআইপি কিছু থাকে না এ টাইমে। তারা ঘাম মোছে আর টাকা গোনে। ঈদে তো তারাও ফিরবে ঘরে। হয়তো মধ্যবিত্তের চেয়ে একটু পরে।  

ঈদে পার্বণে শুধু শহর না, দেশ ছাড়েন এমন লোকও প্রচুর। অজস্র কোটিপতি পয়দা হয়েছে এ দেশে। ছুটি পেলেই তারা এই অবাসযোগ্য শহর ছাড়েন।

কোভিড উত্তর লাইফ সাপোর্ট ছেড়ে এবার জীবনে ফেরা তাড়া। সবখানে গতি আর ক্ষিপ্রতা। এর সাথে মেলাতে পারলে থাকো। নইলে বিদায়। এমন একটা ভাব সব দিকে। কিন্তু গত আকালের মৃত্যুকে মুছে আবার এসেছে বাংলাদেশের প্রাণ- এমন কি বলা যায়? জনসংখ্যার বিরাট একটি গোষ্ঠী মহামারির ছোবলে বহু কিছু হারিয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা স্ট্যাটাস হারিয়েছে। তাদের এখন টিসিবি’র ট্রাকে লাইন দিতে হয়। সুবিধা হচ্ছে মুখ ঢাকা থাকছে মাস্কে। 

কায়দা করে বাঁচার সময় এখন। কিন্তু এ বাঁচা কি শিরদাঁড়া উঁচু করে? না কি মরি মরি বেঁচে থাকা? খুব সামনেই এর উত্তর মিলবে। তবু অস্তিত্ব রক্ষায় মানুষ লড়বে। ফসলবিহীন মন কাঁদালেও এ প্রজাতি লড়তে জানে। মন্দা কাটানো সেই রক্তিম প্রভাতের অপেক্ষায় আমরা।


লেখক, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।

২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।

   

About

Popular Links

x