ঈদ দেশের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। গ্রাম-শহরের প্রতিটি পরিবারে ঈদের সময়টুকু থাকে আনন্দময়। উৎসবে সেজে উঠে সারাদেশ। তবে, উৎসবের এই সময়গুলো কারও কাছে হয়ে ওঠে বিষাদময় ও সংকটের। শ্রমজীবী-মেহনতি ও নিম্নআয়ের মানুষের কাছে ঈদের সময় বাড়ি ফেরা মানে ‘জীবনবাজি’রেখে যাত্রা করা।
সবাই পেটের তাগিদে এক শহর থেকে আরেক শহরে ছুটে যায় শ্রম বেচতে। অথচ যারা মাথার ঘাম মাটিতে ফেলে রক্ত পানি করে শ্রম দিচ্ছে, রাষ্ট্রের অর্থনীতির চাকা ঘোরাচ্ছে তাদের জীবনের নিরাপত্তা দিতে রাষ্ট্র সবসময় ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। এরপরেও, প্রতিটি ঈদযাত্রায় যোগাযোগব্যবস্থার নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থতার দায় স্বীকার না করে সরকার ও মন্ত্রীরা বাহাস করছেন।
ঈদের আগে ঢাকঢোল পিটিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে দুর্ঘটনা নির্মূলে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টার মনোভাব দেখানো হয়। কিন্তু স্টেশন, টার্মিনাল আর সদরঘাট পরিদর্শন ছাড়া মন্ত্রী-আমলাদের কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ চোখে পড়ে না। বিত্তবানদের জন্য নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা ও বিশেষ বরাদ্দ থাকলেও শ্রমজীবী মানুষদের জন্য থাকে না কোনো উদ্যোগ বা পরিকল্পনা। প্রতিবারই স্বজনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে গিয়ে ট্র্যাজেডির শিকার হয় এসব মানুষ।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের তথ্যমতে, ঈদের ছুটিতে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখের মতো মানুষ ঢাকা ছাড়েন। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য পর্যাপ্ত পরিবহন আমাদের দেশে নেই। তাই অনেকেই বাধ্য হয়ে লঙ্কড়-ঝঙ্কড় বাস, পণ্যবাহী ট্রাক, ব্যক্তিগত মোটরসাইকেল আর পিকআপভ্যানে বাড়ির পথে রওনা দেয়। এতসংখ্যক মানুষের ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটবে এটা সবারই জানা, তবে কোনটা সড়ক দুর্ঘটনা আর কোনটা কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড তা বোঝা জরুরি।
দেশে দুই ঈদের সময় কোটির মতো মানুষ ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ দেশের বড় বড় শহর থেকে গ্রামের পথে রওনা দেয় নিজ পরিবার আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে। অথচ সড়কে অনিয়ন্ত্রিত যান চলাচল, নৌযাত্রায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকা এবং রেলে চরম অব্যবস্থাপনার কারণে ‘বলি’ হয় এসব মানুষের স্বপ্ন ও সাধ। রাষ্ট্র বা সরকারের জবাবদিহিতা তো দূরে থাক, এসব মানুষের বলি হওয়া স্বপ্নকে ‘নিছক’ দুর্ঘটনা বলে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে।
২১ মে ঈদযাত্রার শুরুর দিন থেকে ৩০ মে পর্যন্ত বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেলের তথ্য অনুযায়ী, ২০০ সড়ক দুর্ঘটনায় ২৩১ জনের প্রাণহানি ও ৫৬১ জন আহত হওয়ার তথ্য মিলেছে। যদিও হাসপাতালের তথ্যে এর সংখ্যা কমপক্ষে ১০ গুণ বেশি। দৈনিক প্রথম আলোর পরিসংখ্যান বলছে, এবারের কোরবানি ঈদে সারাদেশে (সরকারি ছুটির সাত দিন ২৫ মে থেকে ৩১ মে) শুধু সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৭৯ জন, আহত হয়েছেন ১৩৫ জন। সড়কে মৃত্যুর এই মিছিলে শিশু, কিশোর, নারী, তরুণ, বয়স্ক নাগরিক সবাই রয়েছেন।
যাত্রী সমিতির তথ্যমতে, গত ঈদ-উল-ফিতরে দেশের সড়ক, রেল ও নৌপথে ৩৭৭টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন ৩৯৪ জন। আর আহত হয়েছেন ১ হাজার ২৮৮ জন। এর মধ্যে শুধু সড়কেই ৩৪৬টি দুর্ঘটনায় ৩৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এবারের ঈদ-উল-আজহা অর্থাৎ কোরবানি ঈদের আগে টাঙ্গাইল-যমুনা মহাসড়কে একটি দুর্ঘটনা সবাইকে নাড়িয়ে দিয়েছে। একসঙ্গে ১৭ জন শ্রমজীবী মানুষের মৃত্যু যেন প্রমাণ করে দিলো- সরকার ও রাষ্ট্র শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ। কোরবানি ঈদের দুদিন আগে (গত ২৫ মে সোমবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে) টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলায় যমুনা সেতুর পূর্ব প্রান্তের মহাসড়কের সরাতৈল দক্ষিণপাড়া এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। হতাহতদের সবাই নিম্নআয়ের মানুষ। বাসভাড়া বেশি হওয়ায় যাত্রীবাহী পরিবহনের পরিবর্তে রডবোঝাই ট্রাকে চড়েছিলেন তারা। কিন্তু সেই যাত্রাই হয়ে উঠল শেষযাত্রা।
নিহতদের অধিকাংশই নোয়াখালীর চৌমুহনী ও ফেনী অঞ্চলের হাট-বাজারে ফেরি করে পণ্য বিক্রি করতেন এবং ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফিরছিলেন।
এ ঘটনায় আহত যাত্রী আব্দুল রহমান বলেন, “আমরা টাকা বাঁচানোর জন্য ট্রাকে উঠেছিলাম। বাসের ভাড়া ছিল ১ হাজার ৭০০ টাকা, ট্রাকের ভাড়া ৪০০ টাকা। হঠাৎ ট্রাকটি মহাসড়কের পাশে খাদে পড়ে গেলে আমরা ছিটকে পড়ি। অন্যরা রডের নিচে চাপা পড়ে।”
নিহত তারেকের বাবা সুলতান হোসেন বলেন, “ওরা সবাই মিলে নোয়াখালী এলাকায় ফেরি করে মানুষের চুল কেনা, ভাঙারি, পুরনো মোবাইল ও ছোট খেলনা বিক্রি করত। বাসে ১ হাজার ৮০০ টাকা বেশি ভাড়া চাওয়ায় ট্রাকে উঠেছিল। কে জানত, এটাই তাদের শেষযাত্রা হবে।”
স্বামীকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্ত্রী সাবিনা খাতুন। একমাত্র মেয়ে রাহী মনিকে নিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তিনি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে সাবিনা খাতুন বলেন, “বাড়ি ফেরার পথে স্বামীর সঙ্গে কয়েকবার কথা হয়েছে। মেয়ের জন্য নতুন জামা আর মেহেদি কেনার কথাও বলেছিল। রাত ১০টার দিকে শেষ কথা হয়। সকালে তার মৃত্যুর খবর পাই।”
প্রতিবছর এমন দুর্ঘটনা ঘটে, আর পরিবার হারায় তার প্রিয় মানুষটিকে। এসব দুর্ঘটনা একেকটি পরিবারের জন্য সীমাহীন ট্র্যাজেডির জন্ম দিয়ে চলেছে। অনেক পরিবার তার একমাত্র কর্মক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। প্রতিটি দুর্ঘটনা ঘটার পর স্থানীয় প্রতিনিধি শোক জানিয়ে কিছু টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে দায়িত্ব পালন করেন। যৌক্তিক সহায়তা ও কাঙ্ক্ষিত ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার কারণে অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়ে ধ্বংস হয়ে যায় পরিবারগুলো।
একমুখী উন্নয়ন ব্যবস্থা আর শহরকেন্দ্রিকতা এর জন্য দায়ী বলে অভিমত গ্রামীণ জনগণের মজুরদের নিয়ে কাজ কাজ করা সংগঠন বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতির। কারণ, গ্রামের শ্রমজীবী-মেহনতি মানুষ যদি সারাবছর কাজ পেত, নায্য মজুরি পেত তবে তারা রাজধানীমুখী হতো না, বাড়ি ছেড়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অন্য জেলায় গিয়ে কাজ করতে হতো না। বর্তমানে যেসব মানুষ রাজধানী বা বড় বড় শহরে পাড়ি জমায় তার পিছনে বিভিন্ন প্রশ্ন থাকতে পারে তবে এর প্রধান কারণ- নিজের পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো, দু টাকা বাড়তি রোজগার করা, কাজের নিশ্চয়তা পাওয়া, খাদ্যের নিশ্চয়তা পাওয়া।
ঈদের সময়ে সরকার কোরবানির পশু আনার জন্য বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করলেও সাধারণ, নিম্নবিত্ত, গার্মেন্টস শ্রমিক, পরিযায়ী শ্রমজীবী মানুষের নিরাপদ বাড়িতে যাওয়া এবং কর্মস্থলে ফেরার জন্য বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয় না। তবে বড় বড় গার্মেন্টস বা কারখানায় নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থার উদ্যোগ দেখা গেলেও প্রতিষ্ঠান-শ্রমিকের সংখ্যার তুলনায় খুবই কম। বিশ্বের বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশে পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য বিশেষ পরিবহন ব্যবস্থা থাকে। বাংলাদেশেও ঈদের সময়ে বিশেষ পরিবহন ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়ে আসছে শ্রমিকরা। কিন্তু সরকার ব্যস্ত ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষায়। এজন্যই ঈদে মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থা সুনিশ্চিত না করে পশু আনার জন্য বিশেষ পরিবহন ব্যবস্থা বরাদ্দ দেওয়া হয়!
শ্রমজীবী মানুষেরা শুধুমাত্র নাড়ির টানে বাড়ি যেতে চান ব্যাপারটা এরকম না। উৎসবের সময়ে শহরেও কাজ বন্ধ থাকে। এসময় শহরে থাকলে থাকা-খাওয়া কষ্টের হয়ে ওঠে। তাই সবার মতোই তারাও বাধ্য হয়ে ভিড় ঠেলে বাড়ি যাওয়ার চেষ্টা করেন। এর বাইরে আরেকটা বড় কারণ হচ্ছে- গ্রাম ছেড়ে চাকচিক্যের শহরে এসে দিনরাত পরিশ্রম করে আয় যা করেন তা কিভাবে পরিবারের কাছে পৌঁছানো যায় সে চিন্তা থেকেই বাড়ি যাওয়ার আগ্রহ তৈরি হওয়া। আয়ের টাকার সঙ্গে দু টাকা বাড়তি জমিয়ে কিভাবে কম ভাড়ায় বাড়ি পৌঁছা যায় সে চেষ্টারও কমতি থাকে না তাদের। ফলে, রড বোঝাই ট্রাকে বৃষ্টির পানিতে ভিজে বাড়ি ফিরছিলেন নওগাঁ-রাজশাহীর সেই শ্রমিকেরা। আজ যদি সরকারের বিশেষ পরিবহন ব্যবস্থা থাকতো তবে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি যাত্রা করতে হতো না। ঈদযাত্রাও তাদের আর শেষযাত্রা হতো না।
গ্রামের এই মজুররাই শহরে কাজের আশায় আসে। দু টাকা বেশি রোজগারের আশায় পরিবার প্রিয়জন ছেড়ে তারা শহরে পাড়ি দেয়। বছরে একবার ঈদের সময়ে বাড়ি যায়। কিন্তু বাড়তি ভাড়া, গাড়ি-ট্রেনের টিকেট না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে অনেকেই বাসের ছাদে, ট্রেনের ছাদে, ঝুলে, লঞ্চের ডেকে, ট্রাকে বা পণ্যবাহী গাড়িতে যাতায়াত করে। এর ফলে প্রতিবছর অনেক মানুষ মারা যাওয়ার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়। সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থাও দুর্ঘটনার কারণ-প্রতিকার, নিহত-আহতদের তালিকা প্রকাশ করে। অথচ সরকার বা কোনো মন্ত্রণালয় এসব আমলে নেয় না। গত ঈদ-উল-ফিতর অর্থাৎ রোজার ঈদের সময়েও মানুষ দেখতে পেয়েছে শত শত দুর্ঘটনার চিত্র। এরপরেও সরকার কোনো জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। কারণ, সবাই জানে, অর্থবান-বিত্তবানদের কাছে ঈদে বাড়ি ফেরা আনন্দের-উৎসবের। আর শ্রমজীবীদের কাছে বাড়ি ফেরা নিজের ‘জীবনবাজি’ রাখা।
সরকারের ব্যর্থতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ কারণ- আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন, মাঠকর্মী, বিআরটিএ, মন্ত্রণালয়, সড়ক-রেল-নৌ বাহিনীর সদস্যরা মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করার পরেও কেন মানুষ রড ভর্তি ট্রাক, ট্রেনের ছাদে, অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই লঞ্চে, মহাসড়কে মোটরসাইকেলে, বাসের গেটে-ছাদে ঝুলে জীবনবাজি রেখে যাত্রা করছে তার দায়ভার অবশ্যই সংশ্লিষ্টদের। এসব কাঠামোগত হত্যার জন্য সরকারকে অবশ্যই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে, এর দায়ভার স্বীকার করে কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। পরিবহনখাতকে সিন্ডিকেট মুক্ত করতে হবে। ঈদযাত্রায় বিকল্প ছুটি ও যাত্রাসূচি প্রকাশ করতে হবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং দায় ও দায়িত্বে মানসিকতা না বাড়ালে দুর্ঘটনা কমবে না, যাত্রাপথে শৃঙ্খলা ফিরবে না। ফলে লম্বা হবে ‘মৃত্যুর মিছিল’।
আমাদের মনে রাখা উচিত- একজনের মৃত্যু শুধু এক ব্যক্তির জীবনযাত্রার শেষ নয়; একজনের মৃত্যু মানে- একটা পরিবারের স্বপ্ন, চেষ্টা, লড়াই আর গল্পের সমাপ্তি।
শুভ চন্দ্র শীল, সহ-সম্পাদক, ঢাকা ট্রিবিউন



