Tuesday, May 21, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

আমাদের মৃত্যু আসে...

কবি শামসুর রাহমান তার কবিতায় বলেছিলেন, ‘আমাদের মৃত্যু আসে’ কবিতায় কবি লিখেছিলেন, ‘আমাদের মৃত্যু আসে ঝোপে ঝাড়ে নদী নালা খালে, আমাদের মৃত্যু আসে কন্দরে কন্দরে...’

আপডেট : ০৬ জুন ২০২২, ০১:৫২ পিএম

কোভিডে মৃত্যু শূন্যের কোঠায়। বলা যায়, মহামারি এখন স্তিমিত। কিন্তু অপমৃত্যু থেমে নেই দেশে। চন্দ্রনাথ পাহাড়ের জন্য খ্যাত সীতাকুণ্ড হয়েছে মৃত্যু উপত্যকা। কয়েক বছর আগে রাজধানীর নিমতলীও কেঁপে উঠেছিল এমন বিস্ফোরণে। এতে হতাহত হন বহু। দাহ্য বস্তু নিয়ে প্রশাসনের কর্তারা তা থেকে কোনো শিক্ষা নেননি। সীতাকুণ্ডের ঘটনা তারই প্রমাণ। রবিবার বিকেল নাগাদ প্রশাসনের দেওয়া তথ্যে সেখানে নিহত হয়েছেন ৪৯ জন। আহত প্রায় দুই শতাধিক। এইসব সংখ্যাই প্রশ্নবিদ্ধ। বেসরকারি হিসেবে হতাহতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। দুর্ঘটনা ঘটা মাত্র ক্ষতিপূরণ ঘোষণার রেওয়াজ আছে দেশে। মৃত মানুষের পরিচয় তখন শুধু সংখ্যা। এবার সীতাকুণ্ডেও ভিন্ন কিছু ঘটেনি।

বিস্ফোরণস্থল বিএম কনটেইনার ডিপোর একজন মালিক শাসক দলের নেতা। পুরো দেশই যখন যুগের বেশি সময় ধরে তাদের, তখন একটি কন্টেইনার ডিপোর মালিক সে দলের হওয়া বিস্ময়কর কিছু না। প্রতিষ্ঠানের অংশীদার মালিক এই ব্যক্তি সম্পর্কে সংবাদমাধ্যম মাফিক জানা যায়, মুজিবুর রহমান চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ পদে আসীন। তিনি বিগত সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন। তবে দল তাতে সাড়া দেয়নি।

এই বিপুল প্রাণহানি নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। কোনো অপমৃত্যু দায়হীন থেকে যাবে তা কারও কাম্য হতে পারে না। অবশ্য বিএম কন্টেইনার ডিপোর কর্তৃপক্ষ সকল হতাহতের পরিবারের দায়িত্ব নেবে বলে জানিয়েছে। ঘটনার পর এমন ঘোষণা এ দেশে নতুন কিছু নয়।

সীতাকুণ্ডের ঘটনায় দায়িত্বহীন সবাই সুষ্ঠ বিচারের আওতায় এলে বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে একটি ভিন্ন নজির সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে দাহ্য বস্তু হাইড্রোজেন পার অক্সাইড নিয়ে সতর্কতা বাড়বে এটি আশা করা যায়। যদিও দৈনিক প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে এ বাণিজ্যে সরকারের ভূমিকার কথা স্পষ্ট হয়।

জানা যায়, “দেশে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড উৎপাদনকারী অন্তত ৬টি কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় উৎপাদিত পণ্য দেশে ব্যবহৃত হয়। পাশাপাশি রপ্তানিও হয়। সরকার রপ্তানিতে নগদ সহায়তাও দেয়।

বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড রপ্তানি করে আয় হয়েছে ২ কোটি ৩৩ লাখ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ২০৭ কোটি টাকার সমান। রপ্তানি আয় দ্রুত বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে যে পরিমাণ রপ্তানি হয়েছে, তা আগের অর্থবছরের পুরো সময়ের চেয়ে ২৩ শতাংশ বেশি। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের পুরো সময়ের তুলনায় চলতি অর্থবছরের ১০ মাসে রপ্তানি আয় হয়েছে তিনগুণ।

বাংলাদেশের হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড আমদানিতে ভারত ও পাকিস্তান অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করেছে। ২০১৬ সালের মার্চে পাকিস্তান ট্যারিফ কমিশন বাংলাদেশি হাইড্রোজেন পারঅক্সাইডে ১২% অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করে। এরপর ২০১৭ সালে ভারতও বাংলাদেশি হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড আমদানিতে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক বসায়।

কোনো কোম্পানি নিজ দেশে বিক্রি হওয়া দামের চেয়ে কম দামে রপ্তানি করলে তাকে ডাম্পিং হিসেবে গণ্য করতে পারে আমদানিকারক দেশ। এর বিপরীতে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক বসাতে পারে।

হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড রপ্তানিতে সরকার ভর্তুকি দেয় ১০%। মানে হলো, ১০০ টাকা রপ্তানি করলে সরকারের কাছ থেকে সহায়তা পাওয়া যায় ১০ টাকা।”

বিস্ফোরণের বাইরেও গতকাল সড়কে ঘটেছে হৃদয়বিদারক প্রাণহানি। ঘটনাস্থল খুব পরিচিত ঢাকা আরিচা মহাসড়ক। ৫ জুন, রবিবার দুপুরে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাংবাদিকদের বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের টেকনিক্যাল অফিসার আতিকুর রহমান জানান,

নিহত বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পূজা সরকার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ৪১ তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের আইই, এইআরই, সাভারের এই বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার বাড়ি গাজীপুরে। তার স্বামীর নাম তন্ময় মজুমদার।

আতিকুর রহমান বলেন, পূজা এবং আমি একই কক্ষে কাজ করতাম। এক সময় তিনি আমার কাছেই থিসিস করতেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে আমাদের এখানে যোগদান করেন। প্রতিদিন ঢাকা থেকে এসে সাভারের আশুলিয়ায় অফিস করতেন তিনি। পূজা সাড়ে পাঁচ মাসের বেশি অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।

অন্যদিকে, একই ঘটনায় নিহত আরেক ব্যক্তি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের (গনকবাড়ি, সাভার) ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আরিফুজ্জামান। তিনিও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী।

সাভার হাইওয়ে থানার পরিদর্শক (ওসি) আতিকুর রহমান বলেন, এই দুর্ঘটনায় পরমাণু কমিশনের গাড়িটির সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। রবিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সাভারের বলিয়াপুর এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে দুটি বাস ও একটি ট্রাকের ত্রিমুখী

সংঘর্ষে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আরিফুজ্জামান, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পূজা সরকার, প্রকৌশলী কাউসার আহম্মেদ ও পরমাণু শক্তি কমিশন স্টাফ বাসের চালক রাজিব হোসেন মারা যান। এ ঘটনায় বাসে থাকা আরও ৪০ যাত্রী আহত হয়ে চিকিৎসাধীন।

(সূত্র : ঢাকা ট্রিবিউন)

দৈনিক প্রথম আলো'তে এ বছরের ২০ মে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায়, “ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে আবার দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে। গত সাড়ে পাঁচ মাসে এই মহাসড়কের শুধু মানিকগঞ্জ অংশেই ৬৩টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৪ জন। আহত হয়েছেন শতাধিক ব্যক্তি। ...সাধারণ যাত্রী, হাইওয়ে পুলিশ ও যানচালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একটা সময় ঢাকা-আরিচা মহাসড়ককে বলা হতো মৃত্যুর ফাঁদ। ১১টি অপ্রশস্ত বাঁকের কারণে এই সড়কে প্রায় প্রতিদিনই ঘটত দুর্ঘটনা। ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ এবং বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী মিশুক মুনীরের মৃত্যুর পর এই মহাসড়কের ১১টি বাঁক প্রশস্ত করা হয়। এরপর দুর্ঘটনা কমে আসে। তবে চালকের অদক্ষতা, অনিয়ন্ত্রিত গতি, অপ্রশস্ত সড়ক এবং তিন চাকার গাড়ি চলাচলের কারণে সম্প্রতি আবার এই মহাসড়কে দুর্ঘটনার ঘটনা বেড়ে যায়।”

দিকে দিকে এমন মৃত্যু বার্তা মন বিদীর্ণ করে। সাথে কবি শামসুর রাহমানের কবিতাই মনে করায়। “আমাদের মৃত্যু আসে” কবিতায় কবি লিখেছিলেন,

“আমাদের মৃত্যু আসে ঝোপে ঝাড়ে নদী নালা খালে

আমাদের মৃত্যু আসে কন্দরে কন্দরে

আমাদের মৃত্যু আসে পাট ক্ষেতে আলে

গ্রামে গঞ্জে শহরের বন্দরে

আমাদের মৃত্যু আসে মাঠে

পথে ঘাটে ঘরে

আমাদের মৃত্যু আসে হাটে

সুডৌল ট্রাফিক আইল্যান্ডে ধু-ধু চরে

আমাদের মৃত্যু আসে কাদায় মাটিতে

আমাদের মৃত্যু আসে ধুলায় ধুলায় ঘাসে ঘাসে

পরিখায় বিবরে ঘাঁটিতে

আমাদের মৃত্যু আসে বরিশাল, নোয়াখালী, কুষ্টিয়া, ঢাকায়

আমাদের মৃত্যু আসে কুমিল্লা, সিলেট, চাটগাঁয়

আমাদের মৃত্যু আসে প্লেনে চেপে, জাহাজ বোঝাই করে আসে

আমাদের মৃত্যু আসে সুপরিকল্পিত নকশারূপে

আমাদের মৃত্যু আসে ইসলামাবাদ থেকে

আমাদের মৃত্যু আসে কারবাইনে বারুদের স্তূপে

আমাদের মৃত্যু বিউগলে যায় ডেকে।”

- শামসুর রাহমান, আমাদের মৃত্যু আসে, বন্দী শিবির থেকে (১৯৭২)


লেখক, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।

২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।

About

Popular Links